খাদ্যে ভেজাল: ‘দ্য ইন্ডিয়া স্টোরি’র পর্দায় সত্যের সন্ধান
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে সত্যের জন্য লড়তে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। আজ সেই লড়াইয়ের ময়দান বদলেছে। এখন প্রশ্ন খাদ্যে ভেজাল আর কৃষিজাত ফসলে কীটনাশকের আধিক্য নিয়ে। এই সংবেদনশীল প্রসঙ্গই উঠে এসেছে ‘দ্য ইন্ডিয়া স্টোরি’ ছবিতে। পরিচালনা করেছেন চেতন ডি কে, আর মুখ্য ভূমিকায় বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা শ্রেয়স তলপড়ে।
কমেডি চরিত্রে দর্শকদের হাসিয়েছেন যিনি, এই ছবিতে তাঁকে দেখা যাবে গম্ভীর ও আবেগঘন এক বাবার ভূমিকায়। মুম্বইয়ের রেহেজা ক্লাবে প্রথম আলোর প্রতিনিধি দেবারতি ভট্টাচার্যের সঙ্গে আলাপে শ্রেয়স জানিয়েছেন, ছবিটির অভিনয়ের পর খাবারের ব্যাপারে তিনি অনেক বেশি সচেতন।
‘খেতে বসলেই ভাবি, আসলে কী খাচ্ছি’
শ্রেয়স বলেন, ‘খাবার খেতে বসলেই ভাবি, আসলে আমি কী খাচ্ছি। দুধ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি, পনিরও অনেক কমিয়ে দিয়েছি। কোনটা আসল আর কোনটা ভেজাল, বোঝা কঠিন। তাই যতটা সম্ভব নির্ভরযোগ্য জায়গা থেকে খাবার কেনার চেষ্টা করি।’
ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়ে তাঁর মনে হয়েছিল, এমন একটি বিষয়ে আরও আগেই সিনেমা হওয়া উচিত ছিল। তাঁর মতে, অভিনয়শিল্পীর জন্য এমন গল্পে কাজ করা জরুরি, যা তাঁকে নতুনভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। ছবির প্রস্তুতির জন্য অনেক গবেষণাও করতে হয়েছে তাঁকে।
সচেতনতা তৈরিতে দর্শকেরও ভূমিকা
খাদ্যে ভেজাল নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির প্রসঙ্গে শ্রেয়স মনে করেন, শুধু সিনেমা বানালেই পরিবর্তন আসবে না; দর্শককেও প্রশ্ন তুলতে হবে। তিনি বলেন, ‘অভিনয়শিল্পীরা কাজের মাধ্যমে একটি বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু দর্শক সেটি কীভাবে গ্রহণ করবেন, সেই সিদ্ধান্ত তাঁদেরই। সচেতনতা তৈরির জন্য মানুষের নিজের আগ্রহও প্রয়োজন।’
ডাবিংয়েও চোখে জল
কিছু চরিত্র অভিনয় শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন মনে থেকে যায়। ‘দ্য ইন্ডিয়া স্টোরি’র চরিত্রটিও শ্রেয়সের কাছে তেমন। ছবিতে এক কন্যাসন্তানের বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। বাস্তব জীবনেও বাবা হওয়ায় চরিত্রটি তাঁর কাছে ব্যক্তিগত হয়ে উঠেছিল। ছবির অনেক দৃশ্যকে নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন তিনি। কয়েকটি দৃশ্য এতটাই আবেগপ্রবণ ছিল যে ডাবিংয়ের সময়ও নিজেকে সামলাতে পারেননি।
অভিনেতা বলেন, ‘ডাবিংয়ের সময় কয়েকটি দৃশ্যে চোখে জল চলে এসেছিল। এমনও হয়েছে, আবেগ সামলাতে না পেরে সেদিন আর ডাবিং করতে পারিনি। কাজটি পরের দিনের জন্য রেখে দিতে হয়েছে।’
নিজেকে এক ঘরানায় আটকে রাখতে চান না শ্রেয়স
কমেডি ছবির জন্য দর্শকের কাছে বেশি জনপ্রিয় হলেও শ্রেয়স নিজেকে শুধু একটি ঘরানায় আটকে রাখতে চান না। প্রতিদিন একই ধরনের চরিত্রে অভিনয় করলে একসময় একঘেয়েমি চলে আসে বলে মনে করেন তিনি। ‘আমি এই ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছি নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে। নতুন চরিত্রের মধ্য দিয়ে নিজেকে আবিষ্কার করতেই সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই,’ বলেন শ্রেয়স।
পরিবারের সঙ্গে দেখার মতো কাজ
ওটিটির কারণে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক কমছে, এমন ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন শ্রেয়স। তাঁর মতে, পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে বড় পর্দায় সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা আলাদা। কোনো ছবিকে ঘিরে দর্শকের মধ্যে ‘ফোমো’ তৈরি হলেও অন্যদের উৎসাহে অনেকে প্রেক্ষাগৃহে ছোটেন। ভারতের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে মঙ্গলবার কম দামে টিকিট পাওয়ার সুবিধাও দর্শক ফেরাতে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন তিনি।
ওটিটির প্রসারকে নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীদের জন্য বড় সুযোগ হিসেবেই দেখছেন শ্রেয়স। তিনি বলেন, ‘প্রেক্ষাগৃহ ও টেলিভিশনের পাশাপাশি মুঠোফোনের মাধ্যমেও এখন দর্শকের কাছে গল্প পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। নতুন বিষয় ও ভিন্নধর্মী গল্প নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ ওটিটিতে বেশি।’
তবে এই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতাও জরুরি বলে মনে করেন অভিনেতা। গল্পের প্রয়োজন না থাকলে অকারণে গালিগালাজ কিংবা অস্বস্তিকর দৃশ্য রাখা উচিত নয়। শ্রেয়স বলেন, ‘মা-বাবা ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের নিয়ে নিজের ছবি দেখতে পছন্দ করি। চাই না, ছবি দেখতে গিয়ে তাঁরা অস্বস্তিতে পড়ুন। মেয়েকে নিয়ে ওটিটিতে কিছু দেখার সময়ও ভয় হয়, কখন গালিগালাজ বা অস্বস্তিকর দৃশ্য চলে আসে। সত্যি বলতে, পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে দেখতে পারেন, এমন কাজের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।’
আবার পরিচালনায়?
অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনাও উপভোগ করেন শ্রেয়স। তাঁর মতে, অভিনয়শিল্পী হিসেবে একটি চরিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়। প্রযোজক হিসেবে গল্প নির্বাচন, অভিনয়শিল্পী বাছাই, শুটিং ও পোস্ট-প্রোডাকশন থেকে মুক্তি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকা যায়। নতুন করে পরিচালনায় ফেরার পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে শ্রেয়স বলেন, ‘হতে পারে, আগামী বছর।’
নতুন পরিচালক চেতন ডি কে-র সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাও ভালো বলে জানান শ্রেয়স। তাঁর কাছে পরিচালকের অভিজ্ঞতার চেয়ে দৃষ্টিভঙ্গি ও আন্তরিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষ্যে, ‘গল্প বলার সময়ই বোঝা যায়, পরিচালক বিষয়টি কতটা বিশ্বাস করেন। “দ্য ইন্ডিয়া স্টোরি”র গল্প ও চরিত্র আমাকে টেনেছিল। প্রথম ছবি হওয়ায় চেতন শক্তিশালী একটি দল গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছিলেন। সবাই নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।’
প্রযোজক হিসেবে ভবিষ্যতে সামাজিক বিষয় নিয়ে ছবি করতে চান শ্রেয়স। তবে তাঁর মতে, শুধু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকলেই হবে না, প্রয়োজন শক্তিশালী গল্পও। ‘বিষয় ও গল্পের সুন্দর সমন্বয় ঘটলে অবশ্যই এমন ছবি প্রযোজনা করতে চাই,’ বলেন তিনি।
‘দ্য ইন্ডিয়া স্টোরি’ নিয়ে শ্রেয়সের প্রত্যাশা, দর্শক ছবিটি শুধু দেখবেন না; নিজেদের খাবার ও জীবনযাপন নিয়েও নতুন করে ভাববেন।