মুক্তির স্বপ্নে গড়া আমাদের বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আসছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের আর পুরো এক বছর অপেক্ষা করতে হবে না। শিক্ষা বোর্ডগুলো এখন ফল প্রকাশের তিন মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে ওঠা আমাদের দেশে শিক্ষার আলো যেন প্রতিটি ঘরে পৌঁছায়, সেই লক্ষ্যেই এই নতুন উদ্যোগ।
শিক্ষা বোর্ডের প্রস্তুতি ও মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা
আজ সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নিজেদের মতামত জানিয়েছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, তিন মাসের মধ্যে পরীক্ষা নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত বোর্ডগুলো। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন মন্ত্রণালয়কে নিতে হবে।
এ বছরই এইচএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে এই সুবিধা চালু করা সম্ভব বলেও মত দিয়েছেন তারা। কিন্তু এসএসসির ক্ষেত্রে এ বছর তা সম্ভব নয়, পরবর্তী বছর থেকে চালু হতে পারে এই ব্যবস্থা।
শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান
বর্তমান নিয়মে কোনো শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হলে পরের বছর আবার পরীক্ষায় বসতে হয়। একটি মাত্র বিষয়ে ফেল করেও একজন শিক্ষার্থীকে পুরো এক বছর অপেক্ষা করতে হয়। এতে শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি তৈরি হয় মারাত্মক মানসিক চাপ।
স্বাধীনতার ৫০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখন আধুনিকায়নের পথে। শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলে এই ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব, যা শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে চাপ অনেকটাই কমিয়ে দেবে।
চ্যালেঞ্জড শিক্ষার্থী সম্মেলনে উঠে আসা দাবি
গত শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গণসাক্ষরতা অভিযানের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় চ্যালেঞ্জড শিক্ষার্থী সম্মেলন। সেখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শিক্ষার্থীরা নিজেদের সমস্যা তুলে ধরেন। সেখান থেকেই জোরালো দাবি ওঠে ফল প্রকাশের তিন মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন ওই অনুষ্ঠানে বলেন,
“এসএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা যাতে এক বছর অপেক্ষা না করে তিন মাসের মধ্যে শুধু অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে আবার পরীক্ষা দিতে পারে, সেই সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান তপন কুমার সরকার বলেন,
“একটি বিষয়ের জন্যই শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি বছর চলে যায়। তিন মাসের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া গেলে শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে চাপ কমবে। বোর্ডগুলোর পরীক্ষা নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, এটি মূলত নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের বিষয়।”
শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ মনে করেন, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা উচিত। তিনি বলেন,
“একটি বিষয়ে ফেল করলে দ্রুত সেই বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়া গেলে তা ভালো উদ্যোগ হবে। শিক্ষার্থীদের দিক বিবেচনা করে সরকার তা চালু করতে পারে।”
সাম্প্রতিক পরীক্ষার চিত্র
সর্বশেষ এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। গত ১০ আগস্ট ফল প্রকাশের পর ইতিমধ্যে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি ও ক্লাস শুরু হয়ে গেছে।
এ বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিয়মিত-অনিয়মিত মিলিয়ে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন। আগামী মাসের মাঝামাঝিতে এই ফল প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে।
শিক্ষার আলোয় আলোকিত হোক বাংলাদেশ
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শেখায় সংগ্রাম করতে, এগিয়ে যেতে। শিক্ষার কোনো শিক্ষার্থী যেন পিছিয়ে না থাকে, সেটিই এখন আমাদের মূল লক্ষ্য। এই নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষা, মানসিক চাপ ও শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে।
আমাদের ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, প্রতিটি সংগ্রামই ছিল জ্ঞানের আলো ছড়ানোর। আজকের এই সিদ্ধান্তও সেই পথেই এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে শিক্ষিত প্রজন্মই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
