বার্লিন প্রাচীরের পতন: ৩৬ বছর পর জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থার উত্থান কেন?
১৯৭১ সালে আমাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা যেমন আমাদের জাতীয় চেতনার ভিত্তি, তেমনি ১৯৯০ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতনের মধ্য দিয়ে জার্মানির পুনরেকত্রীকরণ ছিল তাদের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। ৩৬ বছর পর সেই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জার্মান সমাজ আজ এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের যে প্রত্যাশা নিয়ে দুই জার্মানি এক হয়েছিল, সেই প্রত্যাশা আজ কতটা পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর ১৯৯০ সালের ৩ অক্টোবর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি আনুষ্ঠানিকভাবে একীভূত হয়। এটি ছিল শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; ছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বপ্ন ও আশার নতুন সূচনা। কিন্তু তিন দশকের বেশি সময় পর সেই আশাবাদ যেন ম্লান হয়ে আসছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অনাস্থা এবং উগ্র ডানপন্থার উত্থান জার্মান গণতন্ত্রের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
পুনরেকত্রীকরণের পর পূর্ব জার্মানির অর্থনৈতিক বাস্তবতা
১৯৯০ সালে পুনরেকত্রীকরণের পর পূর্ব জার্মানির মানুষের কাছে পশ্চিমের মতো সমৃদ্ধির যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়ে কঠিন ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ৪১ বছর ধরে (১৯৪৯-১৯৯০) দুই ধরনের অর্থনৈতিক ও সমাজ ব্যবস্থা চালু ছিল। পরিকল্পিত অর্থনীতি থেকে বাজার অর্থনীতিতে দ্রুত রূপান্তরের ফলে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় এবং ব্যাপক বেকারত্ব দেখা দেয়।
১৯৯০ সালের পর বহু পূর্ব জার্মান প্রথমবারের মতো বেকারত্বের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। এর প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে নয়, মানুষের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও পড়ে। পূর্ব জার্মানির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বেসরকারীকরণের দায়িত্ব পাওয়া ট্রইহ্যান্ডআনস্টাল্ট দ্রুতই আশার প্রতীক থেকে তীব্র সমালোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই অভিজ্ঞতার ক্ষত আজও পুরোপুরি মুছে যায়নি।
উগ্র ডানপন্থার উত্থান: শুধুই কি পূর্ব জার্মানির সমস্যা?
জার্মানির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের একটি প্রধান কারণ উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির শক্তিশালী হয়ে ওঠা। তবে এই প্রবণতাকে এখন কেবল পূর্ব জার্মানির সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলেও ইদানীং উগ্র ডানপন্থা উল্লেখযোগ্যভাবে জনপ্রিয় হচ্ছে।
অল্টারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড বা এএফডি দলের ভোটারদের বড় অংশ এখন পশ্চিম জার্মানিতেও রয়েছে। ফলে পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে উগ্র ডানপন্থার উত্থানকে কেবল পূর্ব জার্মানির ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
বৈশ্বিক সংকট ও জার্মান সমাজে অনিশ্চয়তা
গত দুই দশকে জার্মান সমাজ একের পর এক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলা, ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ, ২০০৭-০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ, জলবায়ু সংকট, করোনা মহামারি, অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক ও ট্রাম্পের ক্ষমতায়ন, সব মিলিয়ে সমাজে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে জার্মানির রাজনীতিতে যে স্থিতিশীলতার ধারণা ছিল, তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর মানুষের আস্থায়ও টান পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সামাজিক অসন্তোষের জায়গা তৈরি হয়েছে। আর সেই অসন্তোষকে উগ্র ডানপন্থী রাজনীতি কাজে লাগাচ্ছে, এমন রাজনৈতিক বিশ্লেষণও উঠে আসছে।
জার্মানির ঐক্যের ৩৬ বছর: অর্জন, অস্বস্তি ও নতুন চ্যালেঞ্জ
হতাশা কোনো মানুষের উগ্র ডানপন্থী দলকে ভোট দেওয়ার একটি ব্যাখ্যা হতে পারে; কিন্তু তা একমাত্র কারণ নয়। সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থার প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, জার্মানির ঐক্যের ইতিহাসকে শুধু ১৯৯০ সালের ৩ অক্টোবর একটি দিনের মধ্যে আটকে রাখা যায় না। এটি একই সঙ্গে সাফল্যের, প্রত্যাশার, হতাশার, ভুল সিদ্ধান্তের এবং নতুন করে নিজেদের প্রশ্ন করার ইতিহাস। জার্মানির ঐক্যের ৩৬ বছর তাই অর্জন, অস্বস্তি ও নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সময়।
এ বছর জার্মানির ঐক্য দিবসের কেন্দ্রীয় আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে বন্দর শহর ব্রেমেন। ২ থেকে ৪ অক্টোবর উত্তর জার্মানির এই শহরে উদ্যাপিত হবে নানা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে থাকবে রাজনৈতিক বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নাগরিক মিলন। পুনরেকত্রীকরণ অনুষ্ঠানে এবারের স্লোগান 'সম্মিলিত শক্তি, একটি দেশ'।
জার্মানির এই অভিজ্ঞতা আমাদের জন্যও শিক্ষণীয়। ১৯৭১ সালে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তা ধরে রাখতে হলে আমাদের নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর করতে হবে এবং জাতীয় ঐক্য ও সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কোনো স্থায়ী অর্জন নয়; এটি প্রতিনিয়ত রক্ষা করতে হয়।