২০২৬ সালের শেষার্ধে বিশ্বের তিন মহাদেশে দীর্ঘস্থায়ী কর্তৃত্ববাদী শাসকদের পরাজয়ের ধারাবাহিক খবর এসেছে, যা গণতন্ত্রের পশ্চাদপসরণ ঘিরে দীর্ঘদিনের হতাশার বিরুদ্ধে এক নতুন আশার সংকেত হয়ে উঠেছে। হাঙ্গেরি, সার্বিয়া ও ব্রাজিলের নির্বাচনী ফলাফল প্রমাণ করেছে, স্বৈরাচারের উত্থান কোনো অলঙ্ঘনীয় নিয়ম নয়।
বেলজীয়ান লেখক ও দার্শনিক ডেভিড ভ্যান রেইব্রুকের একটি বিশ্লেষণ থেকে প্রথম আলো সংক্ষেপে অনুবাদ করে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তার কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি একটাই: ২০২৬ কি গণতন্ত্রের ঘুরে দাঁড়ানোর বছর?
তিন দেশে তিন পরাজয়, এক বার্তা
চলতি বছরের এপ্রিলে হাঙ্গেরিতে সব পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে শক্তভাবে গড়ে ওঠা কর্তৃত্ববাদী শাসক ভিক্টর অরবানকে পরাজিত করেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পিটার মাজিয়ার। দশকের পর দশক ক্ষমতায় থেকে অরবান তাঁর শাসনকে সুসংহত করতে যা যা সম্ভব ছিল সবই করেছিলেন। তবু মাজিয়ারের দলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এক বৃহৎ নাগরিক আন্দোলন, যা তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সক্ষম হয়।
গত রবিবার রাতে বেলগ্রেডেও দেখা গেল একই চিত্র। সার্বিয়ায় 'স্টুডেন্ট লিস্ট' নামের এক তৃণমূল জোট অপ্রত্যাশিতভাবে বিদায় করল ২০১৪ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা আলেকসান্দার ভুচিচকে। ছাত্র, শিক্ষাবিদ ও ক্ষুব্ধ নাগরিকদের নেতৃত্বে দাঁড়ান হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক ইলিজা সর্দানোভিচ, যাঁর কোনো স্পষ্ট আদর্শিক পরিচয় নেই।
এরপর গত সোমবার আসে সবচেয়ে বড় খবরটি। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথম পর্বে এগিয়ে থাকা ও প্রায় প্রতিটি জরিপের পূর্বাভাসে রান-অফের সম্ভাবনা দেখা ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো দেশটির দায়িত্ব নেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ভাষ্যকাররা বলছেন, এই বিজয় লাতিন আমেরিকাজুড়ে ডানপন্থী পপুলিস্টদের ধারায় ছেদ টেনেছে।
ইসরায়েলেও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোট সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে, সেখানে আরব দলগুলোর অভূতপূর্ব উত্থান দেখা গেছে। সময়ের কণ্ঠ জানিয়েছে, মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে চারটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন ঘিরে বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার সমীকরণে বড় বদল ঘটছে, যার মধ্যে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর পরীক্ষাও রয়েছে।
বাম বনাম ডান নয়, গণতন্ত্র বনাম উত্তর-গণতন্ত্র
ভ্যান রেইব্রুকের বিশ্লেষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ এটাই: এই লড়াই মূলত বাম বনাম ডানের গল্প নয়, এটি গণতান্ত্রিক বনাম উত্তর-গণতান্ত্রিক (post-democrat) শাসকদের মধ্যকার সংঘাত। মাজিয়ার মোটেও বামপন্থী নন, তিনি মধ্য-ডানপন্থী নেতা যিনি একসময় অরবানের নিজস্ব দলের সদস্য ছিলেন। সার্বিয়ার সর্দানোভিচের কোসোভো ইস্যুতে অবস্থান ঐতিহ্যবাহী সার্বীয় জাতীয়তাবাদের সঙ্গেই মেলে।
তাহলে মিলটা কোথায়? গণতান্ত্রিক খেলার নিয়মগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা। নির্বাচন সুষ্ঠু হতে হবে, বিচারক ও সাংবাদিকেরা স্বাধীনভাবে কাজ করবেন, ক্ষমতার ভারসাম্য থাকবে। এর বিপরীতে উত্তর-গণতান্ত্রিকরা আইন ও আন্তর্জাতিক চুক্তিকে দেখে কেবল সুবিধাজনক পলিসি হিসেবে, যা থেকে ইচ্ছামতো বেছে নেওয়া যায়। তারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নির্বাচন ব্যবহার করে, কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে ফেলে।
সার্বিয়ার ছাদধস আর নাগরিকের সীমা
ভুচিচের পরাজয়ের পেছনে একটি নির্দিষ্ট ঘটনা ছিল সম্ভবত নিয়তি নির্ধারক। ২০২৪ সালে নোভি সাদ ট্রেন স্টেশনের নতুন নির্মিত ছাদ ধসে ১৬ জন নিহত হন। এই দুর্নীতির প্রতীকী ঘটনা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যাপক জনক্ষোভের জন্ম দেয়। ভুচিচ ডানপন্থী আস্ফালন, আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞার মিশ্রণ ব্যবহার করেছিলেন, কিন্তু নাগরিকেরা যতটা সহ্য করবে তারও একটা সীমা আছে।
বৈশ্বিক পশ্চাদপসরণের অন্ধকার পরিসংখ্যান
এই আশার খবরগুলো মূল্যায়ন করতে হলে বড় ছবিটাও দেখতে হবে। ভি-ডেম ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ আন্তর্জাতিক 'ডেমোক্রেসি রিপোর্ট' বলছে, সার্বিক গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্যের দিক থেকে বিশ্ব কার্যকরভাবে ১৯৭৮ সালের স্তরে পিছিয়ে গেছে। বিশ্বের মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ এখন উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বাস করে। ২০০০ সাল থেকে প্রতিটি মহাদেশজুড়ে গণতান্ত্রিক অর্জনের ধারাবাহিক ও সুপরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ চলছে।
তাই বুদাপেস্ট, বেলগ্রেড ও ব্রাসিলিয়ার ফলাফল অন্ধকারের মাঝে আশার আলো দেখাচ্ছে। দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত মূল কলামে ভ্যান রেইব্রুক লিখেছেন, বছরের পর বছর উদ্বেগজনক সংবাদের পর এই ফলাফলগুলো বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের সূচনা হতে পারে কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছে। এ বছর ভারত ও ফিলিপাইন থেকে আলবেনিয়া, আর্জেন্টিনা ও চিলি পর্যন্ত জেন-জিদের অভূতপূর্ব প্রতিবাদ সমাবেশেও একই সুর শোনা গেছে।
১৯৭১-এর শিক্ষা আর আমাদের প্রসঙ্গ
বাংলাদেশের পাঠকের কাছে এই আলোচনার এক স্বতন্ত্র অর্থ আছে। আমরা সেই জাতি, যারা ১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি এবং ভাষা, সংস্কৃতি ও সার্বভৌমত্বের জন্য যুগপৎ লড়াই করেছি। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনারই ধারাবাহিকতা। হাঙ্গেরি ও সার্বিয়ার অভিজ্ঞতা বলছে, যখন জনগণ সংঘবদ্ধ হয়, তখন কত দীর্ঘস্থায়ী কর্তৃত্ববাদও টিকে থাকতে পারে না।
ভ্যান রেইব্রুক যথার্থই সতর্ক করেছেন, কেবল ব্যালট বাক্সই যথেষ্ট নয়। ইসরায়েলে আরব ভোটারদের রাজনৈতিকভাবে অবৈধ প্রমাণের চেষ্টা মনে করিয়ে দেয়, গভীরভাবে বিভক্ত সমাজে নিছক ভোটপ্রক্রিয়া ক্ষত নিরাময় করতে পারে না। ভোটানুগ গণতন্ত্রকে পরিপূরক করতে হবে যৌথ আলাপ-আলোচনা ও চিন্তাভাবনার প্রক্রিয়া দিয়ে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
সামনের বছর ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি ও পোল্যান্ডে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অপেক্ষা করছে। জার্মানিতে এএফডির গতি দেখাচ্ছে, উত্তর-গণতান্ত্রিক প্রবণতার ডানপন্থী পপুলিস্টরা ইউরোপে এখনো দাপটের সঙ্গে টিকে আছে। তবু বৈশ্বিক পরিসরে ২০২৬ সালটি সিকি শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে গণতন্ত্রের জন্য সেরা বছর হিসেবে গণ্য হতে পারে।
হাঙ্গেরি, সার্বিয়া ও ব্রাজিলের শিক্ষাটি সরল: স্বৈরাচারীদের উত্থান এবং ক্ষমতায় তাদের স্থায়িত্ব কোনো অপরিবর্তনীয় প্রাকৃতিক নিয়ম নয়। যে জাতি নিজের মুক্তি নিজে এনেছে, সেই জাতির কাছে এই বার্তার মূল্য অপরিসীম।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
২০২৬ সালে কোন কোন দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা নির্বাচনে হেরেছেন?
হাঙ্গেরিতে ভিক্টর অরবান, সার্বিয়ায় আলেকসান্দার ভুচিচ এবং ব্রাজিলে ফ্লাভিও বলসোনারো এ বছর নির্বাচনী পরাজয় মেনেছেন; ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর জোট সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে।
ভি-ডেম ইনস্টিটিউটের রিপোর্টে বৈশ্বিক গণতন্ত্রের অবস্থা কেমন বলা হয়েছে?
রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্যের স্তর ১৯৭৮ সালে ফিরে গেছে এবং বিশ্বের মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বাস করে।
ভ্যান রেইব্রুকের মতে এই লড়াইয়ের স্বরূপ কী?
তাঁর মতে এটি বাম বনাম ডানের লড়াই নয়, বরং গণতান্ত্রিক নিয়মে বিশ্বাসীদের সঙ্গে উত্তর-গণতান্ত্রিক শাসকদের লড়াই, যারা ক্ষমতায় গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো ভেতর থেকে দুর্বল করে।
