বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি গভীর পরিবর্তন ঘটছে। মার্কিন ডলারের সাত দশকের একচ্ছত্র আধিপত্য ভাঙার প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন, আর এবার তার হাতিয়ার শুধু বাণিজ্য নয়, সবুজ শক্তির খনিজ সামগ্রী ও রেনমিনবি নির্ভর আর্থিক অবকাঠামো। Prothomalo সম্প্রতি ফরেন অ্যাফেয়ার্সের এক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে জানিয়েছে, বেইজিং ডলারকে উৎখাত করার চক্রান্ত করছে না, বরং ওয়াশিংটনের হুমকি মোকাবিলার জন্য নিজস্ব টেকসই বিকল্প গড়ছে।
এই লড়াইয়ের সূচনা বহু পুরনো। ১৯৭১ সালে ব্রেটন উডস ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মুখে মার্কিন অর্থমন্ত্রী জন কনেলি ইউরোপীয় অর্থমন্ত্রীদের বলেছিলেন, ডলার আমাদের মুদ্রা, কিন্তু সমস্যাটা আপনাদের। সেই ধারণা আজও বহাল। ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে ডলার আন্তর্জাতিক রিজার্ভ মুদ্রা হয়ে ওঠে, আর ব্যবস্থাটির পতনের পরও তার আধিপত্য অটুট থাকে।
সি চিন পিংয়ের ঘোষণা ও চীনের কৌশল
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে চীনা নেতা সি চিন পিং চীনকে শীর্ষস্থানীয় আর্থিক শক্তিতে রূপান্তরের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, শক্তিশালী মুদ্রা সেই শক্তির অন্যতম ভিত্তি। RealClearWorld-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ হয়েছে, ইউরোপ বা জাপানের মতো নয়, চীনের হাতে এমন অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক ইচ্ছা আছে, যা মার্কিন ভূরাজনৈতিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণ মাত্রার আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর যেভাবে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, বেইজিং ভয় পায় একদিন সেই অস্ত্র তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হবে। ওয়াশিংটন চাইলে চীনকে ডলারের তরলতা থেকে বঞ্চিত করতে পারে, যা চীনা অর্থনীতিতে ধস নামাবে। চীনের রপ্তানি খাত দেশটির জিডিপির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
রেনমিনবির আন্তর্জাতিকীকরণ তাই বেইজিংয়ের কাছে এক ধরনের আর্থিক সুরক্ষা বীমা। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো জোংইউয়ান জোই লিউ তাঁর ফরেন অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষণে বলেছেন, সি চিন পিং আধিপত্যের কথা বলেননি, মুদ্রার শক্তির কথা বলেছেন। ডলারের একচ্ছত্র রাজত্ব ভাঙতে সম্মানজনক দ্বিতীয় বা প্রভাবশালী তৃতীয় স্থানই চীনের জন্য যথেষ্ট।
রেনমিনবির অবকাঠামো গড়ার ইতিহাস
বেইজিং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ধাপে ধাপে ভিত্তি তৈরি করেছে। ২০০৫ সালে পিপলস ব্যাংক অব চায়নার তৎকালীন গভর্নর জৌ জিয়াওচুয়ান বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার উৎসাহিত করেন। ২০০৯ সালে রেনমিনবিতে সীমান্ত পেরোনো লেনদেনের পাইলট প্রকল্প চালু হয়, আর ২০১৫ সালে গড়ে ওঠে ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম, যা আন্তর্জাতিক রেনমিনবি নেটওয়ার্কের মূল ভিত্তি।
তবু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব বলছে, ২০২৩ সালে চীনের মাত্র ৬.৫ শতাংশ রপ্তানি পণ্যের ইনভয়েস রেনমিনবিতে হয়েছিল। চীনা সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় ৩০ শতাংশ পণ্য বাণিজ্য রেনমিনবিতে নিষ্পত্তি হয়। এই চিত্র বদলাতে বেইজিং এখন প্রচার করছে তথাকথিত চায়না প্রাইসেস, অর্থাৎ স্থানীয় এক্সচেঞ্জে রেনমিনবিতে কাঁচামালের মূল্যের বেঞ্চমার্ক।
সবুজ শক্তিই কি নতুন পেট্রোডলার?
ডলারের শক্তির নোঙর ছিল বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাণিজ্য, যা থেকে জন্ম নিয়েছে পেট্রোডলার শব্দটি। রেনমিনবির সমতুল্য নোঙর হতে পারে সংকটপূর্ণ খনিজ, ক্লিন এনার্জি সরঞ্জাম ও বৈদ্যুতিক অবকাঠামো। চীন বিশ্বের ৮০ শতাংশের বেশি ব্যাটারি তৈরি করে এবং ৭৫ শতাংশের বেশি লিথিয়াম, ৭০ শতাংশ কোবাল্ট ও প্রায় ৬০ শতাংশ নিকেল ব্যবহার করে। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী প্রস্তুতকৃত পণ্য রপ্তানির ২০ শতাংশই ছিল চীনের।
বিশ্বের একটি বড় অংশ জীবাশ্ম জ্বালানি প্রতিস্থাপনের যে সময়সীমা ঠিক করেছে, তা চীনের সবুজ অর্থনীতি ছাড়া পূরণ সম্ভব নয়। ফলে সবুজ পণ্য ও সবুজ অর্থায়নের একটি নিজস্ব চক্র তৈরি হতে পারে, যার সিংহভাগই হবে রেনমিনবিতে। রূপালী বাংলাদেশের প্রতিবেদনও দেখাচ্ছে, ব্রিকসের উত্থানের পাশাপাশি ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যে ফাটল ধরছে, আর ইউয়ানের বিনিময় হার ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য অর্থ কী
একটি সার্বভৌম জাতির কাছে এই পরিবর্তনের তাৎপর্য ঐতিহাসিক। ১৯৭১ সালে আমরা রক্ত দিয়ে রাজনৈতিক মুক্তি অর্জন করেছি, কিন্তু অর্থনৈতিক স্বাধীনতার লড়াই এখনো চলছে। একটি মুদ্রার ওপর গোটা বাণিজ্য, ঋণ ও রিজার্ভ নির্ভর রাখা মানে নিজের ভাগ্য অন্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া। রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেখিয়েছে, ডলার যেকোনো মুহূর্তে অস্ত্রে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো উঠতি অর্থনীতির জন্য সময় এসেছে বাণিজ্যে মুদ্রার বৈচিত্র্য আনার। রেনমিনবি নির্ভর পেমেন্ট নেটওয়ার্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক মুদ্রায় লেনদেনের পথ খোলা রাখা জরুরি। বিদেশি শক্তির একতরফা সিদ্ধান্তে যেন আমাদের অর্থনীতি জিম্মি না হয়, সেটাই স্বাধীনতার চেতনার পূর্ণতা।
সাধারণ প্রশ্ন
ডলারের আধিপত্য কীভাবে তৈরি হয়েছিল?
১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে ডলার আন্তর্জাতিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি পায়, এবং ব্যবস্থাটির পতনের পরও বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থায়নে তার আধিপত্য থেকে যায়।
চীন কি ডলারকে সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন করতে চায়?
না। বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং আধিপত্য নয়, মুদ্রার শক্তি চায়; ডলারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ভেঙে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ক্ষমতা সীমিত করাই তাদের লক্ষ্য।
সবুজ শক্তি কেন এই লড়াইয়ের কেন্দ্রে?
চীন বিশ্বের ৮০ শতাংশের বেশি ব্যাটারি তৈরি করে এবং লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেলের বিশাল ভোক্তা; এসব খনিজ রেনমিনবিকে পেট্রোডলারের সমতুল্য নোঙর দিতে পারে।
