২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, আর তার পেছন পেছন রয়েছে রাশিয়া ও চীন। জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এই লক্ষ্য ঘোষণা করে, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন মিলে ২০৩৬ সালের মধ্যে একই অভিযান সম্পন্ন করতে চায়। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রতিযোগিতার মূলে রয়েছে ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, যা মহাকাশে সামরিক শক্তির নতুন বিভাজন তৈরি করতে পারে।
এই দৌড় কেবল বিজ্ঞানের নয়, ক্ষমতার। ১৯৭১ সালে আমরা যেমন দেখেছি একটি জাতি নিজের ভাগ্য নিজের হাতে তুলে নিতে কী অসম্ভব সাধনা করে, তেমনি আজ পৃথিবীর পরাশক্তিগুলো দেখাচ্ছে, স্বার্থের লড়াই কোথায় গিয়ে থামে না। চাঁদের মাটিতে যার পারমাণবিক চুল্লি আগে পৌঁছাবে, তারই হাতে চাঁদের বরফ আর খনিজের চাবিকাঠি।
কেন এই তাড়া
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি পাঠানোর নির্দেশ দেন। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও একই ধরনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। যুগান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজ্ঞানীরা চাঁদে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের একমাত্র বাস্তব উপায় হিসেবে পারমাণবিক চুল্লিকেই দেখছেন।
কারণটা সরল। চাঁদের কোনো একটি স্থানে সূর্যের আলো থাকে প্রায় অর্ধেক সময়। ফলে সৌর প্যানেল মাসে প্রায় দুই সপ্তাহ বিদ্যুৎ দিতে পারে না। ব্যাটারি ও ডিজেল ব্যয়বহুল, কারণ সবকিছু পৃথিবী থেকে পাঠাতে হবে।
যুক্তরাজ্যের ব্যাঙ্গোর ইউনিভার্সিটির নিউক্লিয়ার ফিউচারস ইনস্টিটিউটের পরিচালক সাইমন মিডলবার্গ বলেন, চাঁদের ঘাঁটিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সৌরশক্তি যথেষ্ট নয়, পারমাণবিক শক্তিই সবচেয়ে যৌক্তিক সমাধান। তবে তা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে।
নাসার লুনার রিঅ্যাক্টর ১ ও রাশিয়ার সেলেনা
নাসার 'লুনার রিঅ্যাক্টর ১' ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই পাঁচ বছর চলতে পারবে। এর ওজন ৬ হাজার কেজির কম, যা ৩ দশমিক ৭ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৫ দশমিক ৫ মিটার প্রস্থের একটি রকেটের ভেতরে রাখা যাবে।
রাশিয়া তৈরি করছে 'সেলেনা' নামের একটি চুল্লি। এটি ১০ কিলোও়াট বিদ্যুৎ দেবে, রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই চলবে ১০ বছর। ওজন হবে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ কেজি, ফলে চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ তুলনামূলক সহজ হবে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩৬ সালের দিকে চীনের নেতৃত্বাধীন চাঁদের ঘাঁটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সেলেনা প্রস্তুত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইতিহাসের পুরনো অধ্যায়
মহাকাশে পারমাণবিক চুল্লি পাঠানোর ঘটনা নতুন নয়। ষাটের দশকের শেষ থেকে আশির দশক পর্যন্ত তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর কক্ষপথে ৩০টির বেশি পারমাণবিক চুল্লি পাঠিয়েছিল, স্নায়ুযুদ্ধের সময় গোয়েন্দা উপগ্রহে বিদ্যুৎ দিতে। প্রায় ১ হাজার কেজি ওজনের এসব চুল্লি ইউরেনিয়াম ভেঙে ৩ থেকে ৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি করত। এগুলো এখন আর সচল নেই।
যুক্তরাষ্ট্র গত ৭০ বছরে মহাকাশে পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচিতে ২ হাজার কোটি ডলার খরচ করেছে। তবু ১৯৬৫ সালের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প ছাড়া দেশটি কখনো সফলভাবে মহাকাশে চুল্লি পাঠাতে পারেনি। ওই চুল্লিটি ৪৩ দিন চলে উপগ্রহের একটি অ-পারমাণবিক যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ায় বন্ধ হয়ে যায়, আর সেটি আজও মহাকাশে ভাসছে।
তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি কতটা
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, চালু অবস্থায় কোনো চুল্লি পৃথিবীতে ফিরে এলে বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে। ১৯৭৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের 'কসমস ৯৫৪' নামের উপগ্রহ ভেঙে পড়ে কানাডার উত্তরাঞ্চলের প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে দেয়। পরিষ্কার করতে ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান চালাতে হয়েছিল।
মিডলবার্গের ব্যাখ্যা, উৎক্ষেপণের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি কম, কারণ ব্যবহারের আগে ইউরেনিয়াম খুব বেশি তেজস্ক্রিয় নয়। চুল্লি চালু হওয়ার পরই ঝুঁকি বাড়ে। তবে চাঁদে দুর্ঘটনা ঘটলে দূষিত এলাকা খুব সীমিত থাকবে।
তিনি বলেন, 'সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পারমাণবিক প্রযুক্তি নয়। বরং উৎক্ষেপণের অনুমোদন, উৎক্ষেপণযানের প্রাপ্যতা এবং চাঁদের পৃষ্ঠে নিরাপদে অবতরণ ও ব্যবস্থা স্থাপন।'
চাঁদের বরফ ও খনিজ: আসল দাব
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে ঘাঁটি বানাতে চায়, যেখানকার কিছু গর্তে লাখ লাখ বছর ধরে সূর্যের আলো পৌঁছায়নি এবং বরফের সন্ধান মেলে। চুল্লির বিদ্যুতে সেই বরফ উত্তোলন করে পানীয় জল, বাতাস ও রকেটের জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক চাঁদ থেকে অ্যালুমিনিয়াম, টাইটানিয়াম ও সিলিকন উত্তোলনের কথাও বলেছেন।
খবর সংযোগের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে তারা কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েন করেছে, যা মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করছে। এ বছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি বলেন, 'আমরা চাঁদে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় আছি, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আছি।'
আইন কী বলে
১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তি অনুযায়ী কোনো দেশ চাঁদ বা এর কোনো অংশের মালিকানা দাবি করতে পারে না, যদিও নিজেদের যন্ত্রপাতির মালিক হতে পারে। চুক্তিতে মহাকাশে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা নেই।
লুনার পলিসি প্ল্যাটফর্মের পরিচালক আন্তোনিনো সালমেরি বলেন, শান্তিপূর্ণ ব্যবহার ও ক্ষতিকর দূষণ এড়ানোর নীতি মানলে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসানো আইনসম্মত হতে পারে। তবে যে দেশ আগে ভালো মানের বরফের সন্ধান পাবে, সে ওই এলাকায় 'নিরাপত্তা অঞ্চল' ঘোষণা করতে পারে, যা কার্যত অন্যদের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত করবে।
লুনার পলিসি প্ল্যাটফর্মের গত মাসের এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, চাঁদে বিপজ্জনক যন্ত্রপাতির দুর্ঘটনায় দায় কার, কারণ বর্তমান আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার নিয়ম এই পরিস্থিতি সামলানোর জন্য তৈরি হয়নি।
প্রশ্নোত্তর
চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি কেন পাঠানো হচ্ছে?
চাঁদের ঘাঁটিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য, কারণ সৌরশক্তি চাঁদে অর্ধেক সময়ই পাওয়া যায় না এবং ডিজেল ও ব্যাটারি পৃথিবী থেকে পাঠাতে হয় বলে ব্যয়বহুল।
কোন দেশ কখন চুল্লি বসাতে চায়?
যুক্তরাষ্ট্র ২০৩০ সালের মধ্যে এবং রাশিয়া ও চীন মিলে ২০৩৬ সালের মধ্যে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের লক্ষ্য রেখেছে।
চাঁদে কি কোনো দেশের মালিকানা প্রতিষ্ঠা হবে?
১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তি অনুযায়ী কোনো দেশ চাঁদের মালিকানা দাবি করতে পারে না, তবে নিরাপত্তা অঞ্চল ঘোষণার মাধ্যমে অন্যদের প্রবেশ সীমিত করা সম্ভব।
