পুত্র হারানোর যন্ত্রণা কোনো প্রলেপ দেয় না। কিন্তু যখন দেখি, আমার ছেলের নামটি নানা কাজে বেঁচে আছে, তখনই আমরা বাঁচার রসদ পাই। এই তৃপ্তিই আমাদের শক্তি। শুক্রবার কলকাতার এক পুরনো বাড়ির নীচের ঘরে বসে এ কথাই বলছিলেন বছর সাতাত্তরের এক বাবা। তিনি তাঁর ছেলে রাজর্ষি ভট্টাচার্যের নামে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে তিন কাঠারও বেশি জমি দান করেছেন। এই জমিতে তৈরি হবে একটি ছাত্রীনিবাস। রাজর্ষি ছিলেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ছাত্র। প্রয়াত হলেও তাঁর নাম বেঁচে থাকুক, এটাই চান বাবা-মা।
ছেলের স্বপ্ন ছিল গবেষক হওয়া
রাজর্ষির বাবা, আয়কর বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অফিসার, জানান, ছোট থেকেই পড়াশোনায় আগ্রহী রাজর্ষির স্বপ্ন ছিল গবেষক হওয়া। তিনি বলেন, ''আমরাও চাইতাম, অর্থের পিছনে না দৌড়ে মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা তৈরি হোক। সেটা তৈরিও হয়েছিল।'' রাজর্ষি দ্বাদশ পাশ করার পরে সর্বভারতীয় পরীক্ষায় ২৩ র্যাঙ্ক করে যাদবপুর, দিল্লিতে সুযোগ পেলেও ২০১৩ সালে ভর্তি হন তাঁর প্রিয় প্রেসিডেন্সি কলেজে। কারণ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রেসিডেন্সি ছিল তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান।
স্বল্প মূল্যে ওষুধ তৈরির লক্ষ্য
স্নাতক স্তরে পড়ার সময় থেকেই রাজর্ষি ঠিক করেন, তাঁর গবেষণার প্রধান লক্ষ্য হবে কীভাবে স্বল্প মূল্যে ওষুধ তৈরি করা যায়। দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তাই রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে গবেষক পড়ুয়াদের সঙ্গে কাজ শুরু করেন তিনি। স্নাতকোত্তরেও দেশের সেরা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েও থেকে যান এই রাজ্যেই। অরগ্যানিক রসায়নের প্রতি ঝোঁক নিয়ে গবেষণার জন্য ভর্তি হন বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (আইআইএসসি)-এ। শুরু হয় দিন রাত জেগে গবেষণা।
হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত রাজর্ষি
রাজর্ষির মা বলেন, ''আমি বার বার বলতাম, নিজের শরীরের খেয়াল রাখিস। কিন্তু সেখানেই ঘাটতি হয়ে গেল। ওর রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছিল। ২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর গবেষণা করে ঘরে ফিরতেই কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হল, আর সব শেষ।''
প্রশ্ন করার জন্য পরিচিত ছিলেন রাজর্ষি
বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকেরা পরামর্শ দেন, প্রশ্ন করতে। কারণ প্রশ্ন করার মাধ্যমেই বোঝা যায় যে, সেই পড়ুয়া বিষয়ের কতটা গভীরে গিয়েছে। সেই দিক থেকে রাজর্ষি ছিলেন অনেকটাই এগিয়ে। শিক্ষক থেকে সহপাঠী মহলে প্রশ্ন করার জন্য পরিচিত ছিলেন তিনি। তাই তাঁর হৃৎস্পন্দন স্তব্ধ হলেও নানা কাজের মাধ্যমে তাঁর একমাত্র সন্তানকে বাঁচিয়ে রেখে শান্তির খোঁজ শুরু করেছেন ওই দম্পতি।
হাতিয়ারায় জমি দান
হাতিয়ারায় প্রায় ৩০ ফুট চওড়া এবং ৭৮ ফুট লম্বা জমি দান করলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে। এর আগেও প্রেসিডেন্সি এবং আইআইএসসি-তে ছেলের নামে 'জিম' এবং 'লেকচার হল' করে দিয়েছেন তাঁরা। রাজর্ষির বাবা জানান, জমিটি মূলত তাঁর অবিবাহিত ভাই দীপক ভট্টাচার্যের। তাঁর ইচ্ছা ছিল ভাইপো সোনাই (রাজর্ষির ডাকনাম) ওই জমিতেই গবেষণা করবেন। কিন্তু ২০১৯ সালে মারা যান তিনি। তাই ওই দম্পতি ঠিক করেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে ওই জমি দান করবেন। সেই মতো গত এপ্রিল মাস থেকে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয় এবং বৃহস্পতিবার রেজিস্ট্রেশন করে বিশ্ববিদ্যালয়কে হস্তান্তরিত করেন ওই জমি।
ছাত্রীনিবাসের নাম হবে দীপক ভট্টাচার্য ও রাজর্ষি ভট্টাচার্যের নামে
দীপক ভট্টাচার্য এবং রাজর্ষি ভট্টাচার্যের নামে ওই ছাত্রীনিবাস করার অনুরোধ করেন তাঁরা। রাজর্ষির বাবা বলেন, ''উপাচার্য আশুতোষ ঘোষ, রেজিস্ট্রার দেবাশিস দাস, ডেপুটি রেজিস্ট্রার (বিসিডব্লিউ) জ্যোতির্ময় রায় সহ অনেকের সাহায্য না পেলে এই কাজ করা সম্ভব হত না। আমি তার জন্য কৃতজ্ঞ।'' রেজিস্ট্রার দেবাশিস দাস বলেন, ''বৃহস্পতিবারই রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। ওই জমিতে গার্লস হস্টেল করা হবে।''
উপাচার্যের বক্তব্য
উপাচার্য আশুতোষ ঘোষ বলেন, ''সন্তানশোকের কোনও সান্ত্বনা হয় না। ওঁদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা নিয়ে কিছু বলার ভাষা আমার নেই। আমি ওঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ। ওঁরা এই মানসিক অবস্থার মধ্যেও মানুষের জন্য যে চিন্তা করছেন, এটাই গোটা সমাজের কাছে এক ইতিবাচক বার্তা।''
বাবা-মায়ের শেষ কথা
রাজর্ষির বাবা এ দিন বলেন, ''আমরা তো ওর জন্য কিছুই করলাম না। কিন্তু ছেলে না থেকেও তো আমাদের কত সম্মান দিয়ে যাচ্ছে। যা হচ্ছে সব তো ওর জন্যই।'' শেষে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে অশক্ত শরীরে জঙ্গল সরিয়ে সেই জমিতে নিয়ে গিয়ে দেখালেন, ''এখানেই গার্লস হস্টেল হবে। এখানেই বেঁচে থাকবে আমাদের রাজর্ষি।''