যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে সহায়তার অভিযোগে অভিযুক্ত এক ব্যবসায়ীর মেয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। গত শুক্রবার মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের ওয়েবসাইটে এ তথ্য প্রকাশিত হয়। নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার দাবিতে ওই নারী আদালতে মামলা করার পরই যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপ নিল।
১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শেখায়, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য আপসহীন থাকতে হয়। কিন্তু আজকের এই ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক বিপজ্জনক ইঙ্গিত বহন করে। ট্রাম্প প্রশাসন মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে, যা ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী নীতি থেকে একটি স্পষ্ট সরে আসা।
কে এই থেইন্ট উইন থেট?
মিয়ানমারের নাগরিক থেইন্ট উইন থেটকে স্পেশালি ডিজিগনেটেড ন্যাশনালস অ্যান্ড ব্লকড পারসনস লিস্ট (এসডিএন তালিকা) থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর বাবা থেইন উইন জাও শ্বে বায়াইন ফিউ গ্রুপ অব কোম্পানিজের প্রতিষ্ঠাতা। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় এই প্রতিষ্ঠান ও তাঁর পরিবারকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে। মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ ছিল, প্রতিষ্ঠানটি সামরিক বাহিনীর পক্ষে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিতরণ করত।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র জানান, এই সিদ্ধান্ত 'প্রশাসনের এই মূল্যায়নেরই প্রতিফলন যে বার্মা-সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত লক্ষ্য অর্জনে এই তালিকাভুক্তি আর কার্যকর ভূমিকা রাখছে না।' লক্ষণীয়, মুখপাত্র মিয়ানমারের আগের নাম 'বার্মা' ব্যবহার করেছেন, যা সামরিক জান্তার পছন্দের একটি নাম।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কেন এই পরিবর্তন?
মুখপাত্র আরও বলেন, 'বার্মার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারগুলো এগিয়ে নিতে প্রশাসন নানা উপায় কাজে লাগাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতারণাকেন্দ্র (স্ক্যাম সেন্টার) দমন, মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বার্মার অভ্যন্তরীণ পরিবেশের উন্নয়ন এবং চলমান সহিংসতা ও মানবিক সংকট মোকাবিলায় শান্তিপ্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করা।'
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন মিয়ানমারের জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। সেই অভ্যুত্থানের জেরে মিয়ানমারজুড়ে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এতে আনুমানিক ১ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৩৫ লাখের বেশি মানুষ।
আদালতে মামলা ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
থেইন্ট উইন থেট প্রথমে বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন, কিন্তু ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত তাঁর মামলা খারিজ করে দেন। চলতি বছরের জুলাইয়ে তিনি নতুন করে আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন। সেখানে তিনি যুক্তি দেন, বাবার ব্যবসায় তাঁর সক্রিয় কোনো ভূমিকা নেই। তিনি আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে।
তাঁর অভিযোগে বলা হয়, 'বাদীর মার্কিন ক্রেডিট কার্ডগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিদেশি ব্যাংক হিসাব সীমিত বা বন্ধ করা হয়েছে, কিংবা হিসাব খুলতে দেওয়া হয়নি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনাও শেষ করতে পারেননি।' এখন তিনি মায়ের সঙ্গে ব্যাংককে থাকেন। গত বছর তাঁর মাকে নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া
জাস্টিস ফর মিয়ানমার নামের একটি সংগঠন যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনটির ভাষ্য, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী যখন বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা বৃদ্ধি করছে, তখনই যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপ নিল। সংগঠনটি বলেছে, 'জান্তার সন্ত্রাসে অর্থ জোগানো মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠ সুবিধাভোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মার্কিন সরকার তালিকা থেকে বাদ দিয়েই চলেছে। এটা নিন্দনীয়।'
থেইন্ট উইন থেটের আইনজীবী এরিক ফেরারি ওয়াশিংটনভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা-বিশেষজ্ঞ। তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর গত শুক্রবার তিনি ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ার মার্কিন জেলা আদালতে একটি নোটিশ দেন। এতে তিনি স্বেচ্ছায় মামলাটি প্রত্যাহারের কথা জানান।
বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা?
১৯৭১ সালে আমরা রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শেখায়, যে শক্তি জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে দমন করে, তাদের সঙ্গে আপস করা মানবতার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি ভুল বার্তা পাঠাচ্ছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর যে নিপীড়ন চলছে, তা আমাদের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের উচিত এই ধরনের আন্তর্জাতিক নীতির পরিবর্তন সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সচেষ্ট থাকা।
স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে থাকা প্রতিটি শক্তির উচিত মিয়ানমারের জনগণের পাশে দাঁড়ানো, জান্তার পাশে নয়। ইতিহাস আমাদের সাক্ষী থাকবে, কে কোন পক্ষে ছিল।
