মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শিখিয়েছে, স্বাধীনতার অর্থ শুধু পতাকার রং নয়, বরং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষমতা। আজকের বিশ্বে সেই শিক্ষাই যেন নতুন করে প্রাসঙ্গিক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি মাত্র তিন সপ্তাহ আগে রুশ জ্বালানি আমদানিকারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের আইনে সই করেছিলেন, তিনি এখন নিজেই রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতির দ্বিমুখী চরিত্রকে যেমন উন্মোচন করে, তেমনি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ১৯৭১-এর সেই সংগ্রামের কথা, যখন আমরা আমাদের ভাগ্য নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলাম।
কেন ট্রাম্প রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি কিনছেন?
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের এক জটিল সমীকরণ। ইরান যুদ্ধের প্রভাব সামলাতে গিয়ে যখন হিমশিম খাচ্ছেন তিনি, তখনই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কয়েক লাখ টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন অর্থনীতি চাপের মুখে। পাম্পে জ্বালানি কিনতে সাধারণ মানুষকে বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করেছে। জনমত জরিপে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থনও কমছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন আর কৃষকদের সংকট
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিনির্ভর অঙ্গরাজ্যগুলোতে যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। আইওয়া, কানসাস, টেক্সাস ও ওহাইওর মতো অঙ্গরাজ্যগুলো কৃষিকাজের যন্ত্রপাতি চালানো এবং পণ্য বাজারে পৌঁছাতে ডিজেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই অঙ্গরাজ্যগুলোই এখন আসন্ন নির্বাচনে অপ্রত্যাশিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে থাকবে কি না, তা নির্ধারণ করবে এই নির্বাচনের ফলাফল।
পুতিনের সঙ্গে চুক্তি: রাজনৈতিক বাঁচার কৌশল
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে ডিজেল আমদানির চুক্তি ট্রাম্পের রাজনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার সর্বশেষ ও সবচেয়ে নাটকীয় উদ্যোগ। এর আগে তিনি তেলের মজুত থেকে আরও তেল বাজারে ছাড়ার জন্য ইউরোপীয় মিত্রদের চাপ দিয়েছেন, জ্বালানির ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের কর স্থগিত করেছেন এবং কৃষিকাজের ডিজেল অন্য অঙ্গরাজ্যে পণ্য পরিবহনে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। এমনকি মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে আর হামলা চালাবেন না বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই ঘোষণাগুলো যেন চলমান যুদ্ধ যে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর প্রভাব ফেলছে, তারই খোলামেলা স্বীকারোক্তি।
সমালোচনা আর জেলেনস্কির প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্পের এই চুক্তি ইউরোপের মিত্রদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে পারে। তাঁদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে তাঁর প্রশাসন কার্যত রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রকে অর্থ জোগাতে সহায়তা করবে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই চুক্তিকে পুতিনের জন্য একটি 'উপহার' বলে অভিহিত করেছেন। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, রাশিয়াকে জ্বালানি পণ্য বিক্রির সুযোগ দেওয়া মানে এমন একটি যুদ্ধে বিনিয়োগ করা, যা দীর্ঘায়িত নয়, বরং শেষ করা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, রাশিয়া এর প্রতিদান দেবে 'সন্ত্রাস ও বিশ্বাসঘাতকতা' দিয়ে।
বাস্তবতা: এই চুক্তি কি কাজে আসবে?
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় ৩৬ লাখ ব্যারেল ডিজেল ব্যবহৃত হয়। রাশিয়া চলতি মাসে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিন লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের এক দিনের মোট ব্যবহারের প্রায় অর্ধেকের সমান হবে। ফলে সাধারণ মার্কিন নাগরিকেরা জ্বালানির দামে তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো পরিবর্তন দেখবেন, এমন সম্ভাবনা কম। ইউরোপের দেশগুলো মজুত থেকে ডিজেল ছাড়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তাতেও জ্বালানির দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। এ ছাড়া ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলায় রাশিয়ার ডিজেল শোধনাগারগুলোর সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নির্বাচনের আগে শেষ মুহূর্তের চেষ্টা
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের এক মাসেরও কম সময় বাকি। অনেক অঙ্গরাজ্যে আগাম ভোটও শুরু হয়ে গেছে। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, কেক তৈরি হয়ে গেলে আর তার উপকরণ বদলানোর সুযোগ থাকে না। অর্থাৎ, নির্বাচনের ফল নির্ধারণে প্রভাব ফেলার মতো সময়ও এখন প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, 'মার্কিন নাগরিকদের, বিশেষ করে আমাদের মহান কৃষক, খামারমালিক ও ট্রাকচালকদের জন্য জ্বালানির দাম কমানোই আমার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।'
কূটনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর দিকগুলো এক পাশে রাখলেও ট্রাম্প এখন আশা করতে পারেন, পুতিনের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ চুক্তি মার্কিন ভোটারদের বোঝাতে সাহায্য করবে যে অর্থনৈতিক স্বস্তি আসার বিষয়ে তাঁর প্রতিশ্রুতি নিছক কথার কথা নয়। তবে গত সাত মাসে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও ভোগ্যপণ্যের দাম কেবল বেড়েছেই। যুদ্ধের সফল সমাপ্তি এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব কমে আসার বিষয়ে ট্রাম্প ও তাঁর কর্মকর্তারা বারবার আশ্বাস দিলেও উদ্বিগ্ন মানুষের সেই আশ্বাসে পুরোপুরি ভরসা করার কারণ তৈরি হয়নি।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেয়ে বড় শক্তি আর নেই। আজকের এই ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতির সেই শিক্ষাকেই যেন নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। ক্ষমতার দালালি, মিত্রতার নাটক আর স্বার্থের হিসাব, সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমাদের নিজেদের স্বাধীন সিদ্ধান্তই আমাদের প্রকৃত শক্তি।
পুতিনকে থামানোর ট্রাম্পের নতুন মিশন কি সফল হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। তবে এটা স্পষ্ট যে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কতটা সুবিধা দেবে, তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। রাশিয়ার জ্বালানি কত দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে, সে সম্পর্কেও কোনো তথ্য নেই। সময়ই বলবে, এই কৌশলগত চাল ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভাগ্য বদলাতে পারবে কি না।
