বিশ্ব শহর দিবস উপলক্ষে ২০২৬ সালের ৩০ অক্টোবর শুক্রবার এক ভার্চ্যুয়াল আলোচনা সভায় নগর-পরিকল্পনাবিদেরা বলেছেন, বাংলাদেশের শহরগুলো এখন কেবল ঘুমানোর জায়গায় পরিণত হচ্ছে; হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর, উঠান ও খেলার মাঠ। ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) এই আয়োজনে তাঁরা সিঙ্গাপুর বা লন্ডনের অন্ধ অনুকরণ ছেড়ে দেশের নিজস্ব মাটি, পানি ও সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে নগরায়ণ পরিকল্পনার আহ্বান জানিয়েছেন।
আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, দেশের ঐতিহ্যবাহী পাড়া-মহল্লা, পুকুর, উঠান ও খেলার মাঠ একসময় দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। এগুলো শুধু বসবাসের স্থান ছিল না; ছিল পারস্পরিক পরিচয়, সহযোগিতা ও শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার ক্ষেত্র। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয় ভরাট ও বিচ্ছিন্ন আবাসনব্যবস্থার বিস্তারে সেই সুযোগ দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।
নিজস্ব বাস্তবতায় পরিকল্পনার ডাক
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, 'আমাদের নগরায়ণ দর্শন হতে হবে বাংলাদেশের মাটি, পানি, মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত।' উন্নয়ন মানে শুধু বহুতল ভবন নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের জন্য একটি সুস্থ, মানবিক জীবন নিশ্চিত করা। বিদেশি মডেলের অন্ধ অনুকরণ নয়, দেশীয় সংস্কৃতিতে জনবান্ধব নগরায়ণ গড়ার এই আহ্বান যেন এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান, যা আজকের পত্রিকায়ও স্থান পেয়েছে; আজকের পত্রিকা জানিয়েছে, বিদেশি মডেলের অনুকরণ ছেড়ে নিজস্ব দর্শনে ফেরার এই বার্তাই সভার মূল সুর ছিল।
আমাদের শহরগুলো যেন এক অদ্ভুত পরিচয় সংকটে ভুগছে। বহুতল ভবন উঠছে, সড়ক প্রশস্ত হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে ফ্লাইওভার। কিন্তু একই ভবনে পাশাপাশি বসবাস করেও প্রতিবেশীর সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে না। আইপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সীমানাঘেরা আবাসন ও আবাসিক কমপ্লেক্সে শ্রেণিভিত্তিক বিচ্ছিন্নতা ও বাইরের সমাজের সঙ্গে কম যোগাযোগের প্রবণতা দেখা যেতে পারে। এই বিচ্ছিন্নতা একটি জাতির সামাজিক সংহতিকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়।
১৯৭১-উত্তর স্বাধীন দেশের স্মৃতি ও শহর
আমরা একাত্তরে রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি এই মাটির জন্য, এই ভাষার জন্য, এই সংস্কৃতির জন্য। সেই সংস্কৃতির শিকড় ছিল আমাদের পাড়া-মহল্লায়, উঠানে, পুকুরপাড়ে, খেলার মাঠে। শিশু-কিশোরদের জীবন যখন ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোচিং ও ডিজিটাল পর্দায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন দলগত কাজ, নেতৃত্ব, সহযোগিতা ও বিরোধ মীমাংসার মতো সামাজিক দক্ষতা বিকাশের সুযোগ কমে যায়, বলে মনে করে আইপিডি। নিরাপদ মাঠ ও স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শিশুদের সুস্থ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পুকুর-উঠান-পাড়াভিত্তিক নগরায়ণ প্রস্তাব
আইপিডি 'পুকুর-উঠান-পাড়াভিত্তিক নগরায়ণ' ধারণাকে আধুনিক পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। পুকুর ও জলাশয় হবে পরিবেশের ভারসাম্য ও পানি ব্যবস্থাপনার অংশ; উঠান ও উন্মুক্ত স্থান হবে মানুষের মেলামেশার ক্ষেত্র; পাড়া-মহল্লাভিত্তিক পরিকল্পনা স্থানীয় পরিচয়, নাগরিক অংশগ্রহণ ও প্রতিবেশী সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে। সংস্থাটি স্পষ্ট করেছে, এটি অতীতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান নয়; ঐতিহ্যের ইতিবাচক উপাদানগুলো আধুনিক পরিকল্পনায় ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব।
আইপিডির উপদেষ্টা অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, শুধু জিডিপি বৃদ্ধি বা বড় অবকাঠামো নির্মাণকে নগরায়ণ বলা চলে না। প্রতিটি নাগরিকের ন্যায়বিচার, জনস্বাস্থ্য ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণে অর্থনৈতিক করিডরভিত্তিক উন্নয়নের পরামর্শ দেন।
ব্যবসায়িক স্বার্থ বনাম জনগণের শহর
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, উন্নয়ন দর্শনের বদলে ব্যবসায়িক ও গোষ্ঠী স্বার্থ নগরের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ময়মনসিংহের মতো মাঝারি শহরেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আবাসিক এলাকা এখন কেবল ঘুমানোর জায়গা, অথচ এসব এলাকা মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগে প্রাণবন্ত থাকার কথা ছিল।
এই সংকট থেকে মুক্তির পথ হিসেবে খাল, পুকুর ও জলাভূমির কঠোর আইনি হেফাজত নিশ্চিত করার সুপারিশ জানিয়েছে আইপিডি। আমার সকাল ২৪ জানিয়েছে, এই সম্পদগুলো রক্ষায় স্থানীয় পাড়া-মহল্লার সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করারও আহ্বান জানানো হয়েছে। নতুন আবাসনে খেলার জায়গা, হাঁটার পথ ও সামাজিক যোগাযোগের স্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুরোনো এলাকায় এসব সুবিধা পুনরুদ্ধারের ডাক দেওয়া হয়েছে।
আইপিডি প্রতিটি ওয়ার্ডে মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের ঘাটতি নিরূপণ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সহাবস্থানের সুযোগ রাখার সুপারিশ করেছে। শিশু-কিশোরদের নিয়মিত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও স্থানীয় সংগঠনগুলোর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আলোচনায় আরও অংশ নেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষক মুহাম্মদ উল্লাহ, প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ, আইপিডির রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল, পরিকল্পনাবিদ জিনিয়াস জান্নাত ও কাজী তাসনিয়া তাবাসসুম। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সভার প্রতিপাদ্য ছিল 'বাংলাদেশের নগরায়ণের উন্নয়ন দর্শন'।
সাধারণ প্রশ্নের জবাব
বিশ্ব শহর দিবস কী এবং কবে পালিত হয়?
বিশ্ব শহর দিবস উপলক্ষে ২০২৬ সালের ৩০ অক্টোবর শুক্রবার আইপিডি ভার্চ্যুয়াল এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
আইপিডির প্রধান প্রস্তাব কী?
আইপিডি পুকুর-উঠান-পাড়াভিত্তিক নগরায়ণ ধারণাকে আধুনিক পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে জলাশয় সুরক্ষা ও পাড়া-মহল্লার সামাজিক সংযোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
শহর কেন কেবল ঘুমানোর জায়গা হয়ে যাচ্ছে?
অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয় ভরাট, উন্মুক্ত স্থান দখল ও বিচ্ছিন্ন আবাসনব্যবস্থার বিস্তারে মানুষের মেলামেশা ও খেলাধুলার সুযোগ কমে যাচ্ছে, বলে জানিয়েছে আইপিডি।
