রাঙামাটির কুতুকছড়ি এলাকার দীপ্তি চাকমা ২০১৭ সালে ক্রেতাদের আগাম টাকা দিয়েই শুরু করেছিলেন পাহাড়ি গয়নার ব্যবসা; আজ তাঁর দুটি বিক্রয়কেন্দ্র এবং মাসে প্রায় অর্ধলক্ষ টাকা আয়। কোনো বিদেশি ঋণ নয়, কোনো পৃষ্ঠপোষকতা নয়; নিজের বিশ্বাস আর পাহাড়ের ঐতিহ্যকে পুঁজি করেই দাঁড়িয়ে আছেন এই উদ্যোক্তা। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনলাইন থেকে শুরু করা এই ব্যবসা এখন রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ এমন এক মাটি, যেখানে ১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে কেনা স্বাধীনতার পর আমরা শিখেছি, মাথা নত করে কারও দয়া নেওয়া নয়, নিজের শ্রমে দাঁড়ানোই সম্মান। দীপ্তি চাকমার গল্প সেই শিক্ষারই জীবন্ত প্রমাণ। স্নাতকের ছাত্রী থাকা অবস্থায়, হাতে এক টাকা পুঁজি ছাড়াই তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের প্রতিষ্ঠান, যার নাম ‘অর্নামেন্টস অব ধনপুদি’।
শূন্য পুঁজিতে ব্যবসার শুরু
দীপ্তি চাকমা জানান, শুরুতে তাঁর হাতে বিনিয়োগের মতো টাকা ছিল না। ফেসবুকে একটি পেজ খুলে তিনি বাজার থেকে পাহাড়ি গয়নার ছবি তুলে আনতেন এবং সেগুলো পেজে দিতেন। ক্রেতারা অগ্রিম ৫০ শতাংশ টাকা পরিশোধ করলে সেই টাকাই দিয়ে গয়না কিনে পাঠানো হতো ক্রেতার কাছে।
দীপ্তি চাকমা বলেন, ‘শুরুতে আমার হাতে কোনো পুঁজি ছিল না। তাই নিজের টাকা বিনিয়োগ করে ব্যবসা করা সম্ভব ছিল না। ক্রেতারা পেজ থেকে কিছু কিনতে চাইলে তাঁদের আগেই ৫০ শতাংশ টাকা পরিশোধ করতে হতো। এই টাকাই ছিল মূলত আমার পুঁজি।’
আগাম টাকা পাওয়ার জন্য ক্রেতাদের বিশ্বাস অর্জন করতে হয়েছিল তাঁকে। ব্যবসার শুরুর দিকে এক বান্ধবীর বিয়ের সব অলংকার সরবরাহের অর্ডার তাঁর জন্য বড় সুযোগ হয়ে আসে। কনের আত্মীয়স্বজনেরা অলংকার দেখে মুগ্ধ হন এবং সেই সূত্র ধরেই নতুন ক্রেতা বাড়তে থাকে।
দীপ্তি চাকমা বলেন, ‘ব্যবসা শুরুর কিছুদিন পরই এক বান্ধবীর বিয়ের সব অলংকার সরবরাহের অর্ডার পেয়েছিলাম। এটি ছিল আমার জন্য বড় একটি সুযোগ। কনের অলংকার দেখে তাঁর আত্মীয়স্বজনেরা বেশ পছন্দ করেন। এর সূত্র ধরে অনেক নতুন ক্রেতা বাড়তে শুরু করে। আমার আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যায়।’
দুই বিক্রয়কেন্দ্র ও মাসে অর্ধলক্ষ আয়
অনলাইনে ব্যবসা চাঙা হওয়ার পর ২০২২ সালে রাঙামাটি শহরে প্রথম বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলেন দীপ্তি। ক্রেতাদের চাহিদা বাড়তে থাকায় ২০২৪ সালে খাগড়াছড়ি শহরের জামতলা এলাকায় খোলেন দ্বিতীয় বিক্রয়কেন্দ্র। কর্মীদের বেতন ও দোকান ভাড়া বাদ দিয়েও দুই প্রতিষ্ঠান থেকে মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাভ করেন তিনি।
দীপ্তি চাকমা বলেন, ‘ব্যবসার কারণে পড়ালেখা শেষ করে আর চাকরির পেছনে ছুটতে হয়নি। নিজের প্রতিষ্ঠান নিয়েই থাকি। দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মীদের বেতন-ভাতা এবং দোকান ভাড়া বাদ দিয়েও মাসে প্রা্য ৫০ হাজার মতো লাভ হয়। ব্যবসাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে চলছি।’
পাহাড়ের ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়
‘আলজরা’, ‘আজুলি’, ‘হুজি হারু’, ‘থেং হারু’, বাজু, কয়েন মালা, নেকলেস, টিকলি, আংটি ও চুড়িসহ নানা ধরনের পাহাড়ি অলংকার বিক্রি করেন দীপ্তি। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিয়ে ছাড়াও সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এসব অলংকার ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের সংস্কৃতি কত বৈচিত্র্যময়, পাহাড়ি গয়নার প্রতিটি নকশা তা-ই বহন করে। ভাষার মতোই এই শিল্পকলাও আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ, যা রক্ষা করা প্রতিটি দেশপ্রেমিকের দায়।
দীপ্তি চাকমা বলেন, ‘পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী গয়না-অলংকারের আলাদা সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আমি চাই, এসব অলংকার আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাক। অনলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকার ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি শোরুমে এসে ক্রেতারা সরাসরি অলংকার দেখতে পারছেন।’
পড়ালেখা আর ব্যবসা পাশাপাশি
ব্যবসার কারণে পড়ালেখায় ব্যাঘাত ঘটেনি। ২০১৩ সালে রাঙামাটি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও ২০১৫ সালে রাঙামাটি সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন দীপ্তি। ব্যবসা শুরুর পর ২০২০ সালে আশা ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক এবং ২০২২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। ব্যবসা পরিচালনায় তাঁকে সহযোগিতা করেন স্বামী প্রমোতোষ চাকমা। খাগড়াছড়ির বিক্রয়কেন্দ্রে দুজন কর্মী রয়েছেন, যাঁদের একজন খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের স্নাতক (সম্মান) শিক্ষার্থী।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণের দাবি
পাহাড়ে নারীদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ থাকলেও পুঁজির অভাবে অনেকে শুরু করতে পারেন না, বলে জানান দীপ্তি। সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা হলে নারী উদ্যোক্তা আরও বাড়বে বলে তাঁর বিশ্বাস। এই দাবি শুধু পাহাড়ের নয়, গোটা বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের। দেশের ব্যাংকখাতের খেলাপি ঋণের সংকট চলাকালে সৎ ও ছোট উদ্যোক্তারা সহজ ঋণ পাওয়ার সুযোগ আরও সংকুচিত হচ্ছে, সিটিজেনস ভয়েসের খবর অনুযায়ী। যেখানে বড় খেলাপিরা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করেন না, সেখানে দীপ্তিদের মতো সৎ পরিশ্রমীরা কোনো ঋণ ছাড়াই নিজের পরিশ্রমে প্রতিষ্ঠা খুঁজছেন; এই বৈপরীত্য নিয়ে রাষ্ট্রকে ভাবতেই হবে।
দীপ্তি চাকমা বলেন, ‘অনেক নারী নিজের উদ্যোগে কিছু করতে চান। প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাবে ব্যবসা শুরু করতে পারেন না। তাঁদের জন্য যদি সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে নারী উদ্যোক্তা আরও বাড়ত।’
খাগড়াছড়ি জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা সুস্মিতা খীসা বলেন, ‘দীপ্তি দক্ষতার সঙ্গে পাহাড়ি নারীদের ঐতিহ্যবাহী অলংকার বাজারজাত করছেন। প্রতিটি অলংকারের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা দীপ্তি সুন্দরভাবে উপস্থাপন করছেন। তাঁর এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়।’
স্বনির্ভরতার পাঠ, ১৯৭১-এর চেতনার আলোয়
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শেখায়, দেশ গড়ার শক্তি বাইরে থেকে আসে না, জনগণের ভেতরেই থাকে। প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি পাহাড়ি পাড়ায় সেই শক্তি আজও জেগে আছে। দীপ্তি চাকমার মতো উদ্যোক্তারা কোনো পতাকাবাহী সুযোগ পাননি; তবু তাঁরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। দেশি পুঁজি ও দেশি প্রযুক্তি দিয়ে দেশের ঐতিহ্য বিক্রি করে বিদেশেও পৌঁছে দেওয়া, এটাই আসল স্বাধীন অর্থনীতির ভিত্তি। বিপরীতে বিভিন্ন বিদেশি সংস্থা ও এনজিওর আশ্রয় না নিয়ে যাঁরা নিজের বুদ্ধি আর ঘামে ব্যবসা গড়েন, জাতি তাঁদের কাছেই ঋণী।
পাহাড়ি গয়নার ব্যবসাটি কীভাবে শুরু হয়েছিল?
দীপ্তি চাকমা ২০১৭ সালে, স্নাতক (সম্মান) ছাত্রী থাকা অবস্থায় ফেসবুক পেজের মাধ্যমে ব্যবসাটি শুরু করেন। ক্রেতাদের ৫০ শতাংশ আগাম টাকাই ছিল তাঁর প্রাথমিক পুঁজি।
দীপ্তি চাকমার বর্তমান আয় কত?
সব খরচ বাদ দিয়ে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির দুটি বিক্রয়কেন্দ্র থেকে তাঁর মাসে গড়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় হয়।
দীপ্তি কোন কোন পাহাড়ি অলংকার বিক্রি করেন?
‘আলজরা’, ‘আজুলি’, ‘হুজি হারু’, ‘থেং হারু’, বাজু, কয়েন মালা, নেকলেস, টিকলি, আংটি ও চুড়িসহ নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি অলংকার বিক্রি করেন তিনি।
