টানা নয় মাস বন্ধ থাকার পর আগামী ১ নভেম্বর থেকে কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন দ্বীপ পর্যটকদের জন্য পুনরায় খুলে দেওয়া হচ্ছে, তবে দ্বীপে রাতযাপনের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় পর্যটক, হোটেলমালিক ও জাহাজমালিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে দেশের এই একমাত্র প্রবাল দ্বীপে যেতে পারবেন, আর ভ্রমণের সুযোগ থাকবে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ-২ শাখা গত রোববার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সাবরীনা রহমানের সই করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে অনুমোদিত পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করবে এবং প্রত্যেক পর্যটককে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি হিসেবে ১০০ টাকা দিতে হবে। তবে নতুন এই নির্দেশনায় রাতযাপনের বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, এই নীরবতাই সৃষ্টি করেছে সব বিভ্রান্তি।
রাতযাপন নিয়ে কী বলছে প্রশাসন ও ব্যবসায়ীরা
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, রাতযাপনের বিষয়ে নতুন কোনো নির্দেশনা আসেনি, আগের প্রজ্ঞাপনের শর্তগুলোই বহাল রয়েছে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বুধবার কক্সবাজারে একটি বৈঠক ডাকা হয়েছে, যেখানে পর্যটন করপোরেশন, ট্যুরিজম বোর্ড, জাহাজমালিক, হোটেল-রেস্তোরাঁমালিক ও ট্যুর অপারেটরদের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার অঞ্চলের পরিচালক মো. জমির উদ্দিনও স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেননি। তিনি বলেন, নতুন প্রজ্ঞাপনে রাতযাপনের কথা নেই, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করা হবে। তবে আজকের পত্রিকা জানিয়েছে, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যায় রাতযাপনের ক্ষেত্রে মাসভিত্তিক কোনো বিধিনিষেধ থাকছে না। এদিকে যুগান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যটক সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি রাতযাপনের নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা অবশ্য একটাই। কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, রোববারের প্রজ্ঞাপনে রাতযাপনের কথা উল্লেখ না থাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। পুরো পর্যটন মৌসুমেই দ্বীপে রাতযাপনের সুযোগ রাখার প্রত্যাশা তাঁদের।
জাহাজমালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম জানান, পুরো সময় রাতযাপনের সুযোগ পাবেন বলে তাঁরা আশা করছেন, সে অনুযায়ী জাহাজ চলাচল ও টিকিট বিক্রির প্রস্তুতি চলছে। গত বছর কক্সবাজার-সেন্ট মার্টিন সমুদ্রপথে নয়টি জাহাজ চলাচল করেছিল, এবার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
আগের শর্ত বহাল থাকলে কী হবে
পরিবেশবাদী সংগঠন ও সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আগের সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে নভেম্বর মাসে সকালে দ্বীপে গিয়ে বিকেলেই ফিরে আসতে হবে। ১ ডিসেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত রাতযাপনের সুযোগ থাকবে। কিন্তু হোটেলমালিকেরা বলছেন, আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে রমজান শুরু হতে পারে, তখন কক্সবাজারে পর্যটক আসা কমে যায়। রমজানে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকলে পর্যটকেরা আগের বছরের তুলনায় মাত্র ১৫ দিন বেশি দ্বীপ ভ্রমণের সুযোগ পাবেন।
আমাদের দ্বীপ, আমাদের দায়িত্ব
১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ দেশের নদী, সাগর ও ভূখণ্ডের প্রতিটি ইঞ্চি। বঙ্গোপসাগরের বুকে ভাসমান সেন্ট মার্টিন সেই সার্বভৌমত্বেরই একটি প্রতীক। দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটি রক্ষা করা কেবল পরিবেশের প্রশ্ন নয়, জাতীয় সম্পদ রক্ষার প্রশ্নও।
পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে। ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী দ্বীপসংলগ্ন ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ সতর্ক করে বলেন, প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার পর্যটক গেলে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি ছেঁড়াদিয়ায় পর্যটক যাতায়াত বন্ধ রাখা, সৈকতে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চলাচল বন্ধ করা এবং নভেম্বরে রাতযাপন না দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
পর্যটকদের জন্য ১২টি বিধিনিষেধ
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, নয় মাস বন্ধ থাকায় দ্বীপের পরিবেশের উন্নতি হয়েছে। ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের সরকার নির্ধারিত ১২টি বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে।
- বিআইডব্লিউটিএ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো নৌযান সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশে চলাচল করতে পারবে না।
- টিকিট কিতে হবে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে, প্রতিটি টিকিটে থাকবে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড। কিউআর কোড ছাড়া টিকিট নকল গণ্য হবে।
- রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি, বারবিকিউ পার্টি, কেয়াবনে প্রবেশ এবং কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচা নিষিদ্ধ।
- সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকসহ জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না।
- সৈকতে মোটরসাইকেল ও সি-বাইকসহ মোটরচালিত যান চলাচল নিষিদ্ধ; পলিথিন ও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক নিরুৎসাহিত।
জেলা প্রশাসক মান্নান বলেন, বিধিনিষেধ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। পর্যটকরা নিয়ম মানছেন কি না, তদারক করতে কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিনে পৃথক দুটি তদারকি দল কাজ করবে। সোমবার দুপুর পর্যন্ত জাহাজ চলাচলের কোনো আবেদন জমা পড়েনি; নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো জাহাজকেই পর্যটক নিয়ে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়া হবে না।
সেন্ট মার্টিনের ইতিহাস ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
চার বছর আগে টেকনাফ থেকে প্রতিদিন ৯ থেকে ১১টি জাহাজে পাঁচ থেকে ছয় হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতেন। কিন্তু মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, নাফ নদীতে বাংলাদেশি ট্রলারে গুলিবর্ষণ এবং নৌকাসহ বাংলাদেশিদের অপহরণের ঘটনায় টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন পথে জাহাজ চলাচল বন্ধ করা হয়। দুই বছর ধরে কক্সবাজার থেকেই জাহাজ চলছে। গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত টানা নয় মাস দ্বীপে পর্যটক যাতায়াত বন্ধ ছিল।
পর্যটক যাতায়তের খবরে স্থানীয় বাসিন্দারা উচ্ছ্বসিত। সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, দ্বীপের ২৩০টির বেশি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ পর্যটকদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার পর্যটক এলে দ্বীপের ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা হবে।
তবে আশঙ্কার কথাও আছে। কেয়াবন ও নারকেলগাছ কেটে দ্বীপে একের পর এক রিসোর্ট উঠছে। বাণিজ্যিক স্বার্থে যদি এই অতিথেয় প্রকৃতি নষ্ট হয়, তবে আগামী প্রজন্ম কী দেখে বড় হবে বলে জানাল bdnews24.com, ব্যবসায়ীদের স্বস্তির পাশাপাশি নজরদারিরও তাগিদ দিয়ে। বুধবারের বৈঠকেই এখন সব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
সেন্ট মার্টিন কবে থেকে খুলছে?
আগামী ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক যেতে পারবেন।
পর্যটকদের কি রাতযাপনের সুযোগ থাকবে?
নতুন নির্দেশনায় এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। আগের শর্ত বহাল থাকলে নভেম্বরে রাতযাপন হবে না, ১ ডিসেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত সুযোগ পাওয়া যাবে। বুধবারের বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
প্রতিজনকে কত ফি দিতে হবে?
পরিবেশ সংরক্ষণ ফি হিসেবে প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা দিতে হবে।
জাহাজ কোথা থেকে ছাড়বে?
নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে অনুমোদিত পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করবে। টিকিট কিতে হবে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে।
