মাঠের আনন্দ ফিরিয়ে আনতে ডর্টমুন্ডের 'ফ্যান মোড'
জার্মান ক্লাব বরুসিয়া ডর্টমুন্ড ঘরের মাঠের ম্যাচে দর্শকদের মুঠোফোন ব্যবহার কমাতে উৎসাহিত করছে। নিষেধ নয়, পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে। শনিবার আইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্টের বিপক্ষে বুন্দেসলিগার ম্যাচ দিয়ে শুরু হয়েছে কার্যক্রম, যেখানে ডর্টমুন্ড ১-০ গোলে জয় পেয়েছে। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ক্লাবের নিজস্ব অ্যাপে চালু হওয়া এই সুবিধার নাম 'ফ্যান মোড'।
নিয়ম সহজ। ম্যাচ চলাকালে ফোন যত কম আনলক করবেন, পয়েন্ট তত বেশি থাকবে। ম্যাচ শেষে সর্বোচ্চ পয়েন্টধারী দর্শকরা পাবেন প্রিয় খেলোয়াড়দের সই করা জার্সি কিংবা ক্লাবের পণ্য কেনার ভাউচার। বিরতির সময় ফোন ব্যবহারে কোনো 'জরিমানা' নেই। পুরো কার্যক্রমই স্বেচ্ছামূলক; অংশ না নিলে আগের মতোই ছবি তুলতে বা ভিডিও করতে পারবেন।
কেন এই উদ্যোগ
ডর্টমুন্ডের যুক্তি, গ্যালারিতে সেলফি, সরাসরি ভিডিও সম্প্রচার কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট তৈরিতে এতটাই ব্যস্ত থাকেন কিছু দর্শক যে মাঠের ফুটবল উপভোগের আসল আনন্দটাই হারিয়ে যায়। আশপাশের দর্শকরাও বিরক্ত হন।
ডর্টমুন্ডের প্রধান নির্বাহী কার্স্টেন ক্রেমার বলেন, 'স্টেডিয়ামে ৮১ হাজারের বেশি মানুষ একসঙ্গে গান গাইছেন, উল্লাস করছেন, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করছেন। এই মুহূর্ত, এই অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই।'
সিগন্যাল ইদুনা পার্কের দক্ষিণ গ্যালারির বিখ্যাত 'ইয়েলো ওয়াল' ফুটবল দুনিয়ার এক বিস্ময়। হলুদ জার্সি পরা হাজার হাজার সমর্থকের সম্মিলিত গর্জনে তৈরি হয় এমন এক পরিবেশ, যা প্রতিপক্ষের কাছে আতঙ্কের, ফুটবলপ্রেমীদের কাছে অপার মুগ্ধতার। ক্লাব চায়, দর্শকেরা যেন সেই অভিজ্ঞতা ফোনের পর্দায় ধারণ করার চেয়ে নিজেরাই অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠেন।
জার্মান ফুটবলে চলছে বিস্তৃত আলোচনা
শুধু ডর্টমুন্ড নয়; জার্মান ফুটবলে গ্যালারিতে মুঠোফোন ও ক্যামেরার অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে আলোচনা চলছে বেশ কিছুদিন ধরেই। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আপত্তি বাড়ছে। অনেকে পেশাদার ক্যামেরা নিয়ে মাঠে আসেন, ভিডিও তৈরি করে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রকাশ করেন। এতে অন্য দর্শকদের অভিজ্ঞতা বাধাগ্রস্ত হয়, প্রশ্ন ওঠে ক্লাবের সম্প্রচারস্বত্ব নিয়েও।
জার্মানির দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব হার্থা বার্লিন এ মাসেই জানিয়েছে, স্টেডিয়ামে পেশাদার সরঞ্জামে বাণিজ্যিক ভ্লগ তৈরি ও তা থেকে অর্থ উপার্জনের অনুমতি আর দেওয়া হবে না। আগস্টে একই ধরনের পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছিল আরেক জার্মান ক্লাব দিনামো ড্রেসডেন। ডর্টমুন্ড অবশ্য নিষেধাজ্ঞার পথে হাঁটেনি; বরং ঝুলিয়ে দিয়েছে পুরস্কারের হাতছানি।
প্রযুক্তির দখল থেকে মুক্তি: আমাদের কী শেখা উচিত
এই খবরটি কেবল ইউরোপের ফুটবল মাঠের গল্প নয়। আমাদের জন্যও এর শিক্ষা আছে। দেশরূপান্তরের এক লেখায় যেমন বলা হয়েছে, মোবাইল ফোন জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু অনর্থক ব্যবহারে সময়ের আমানত নষ্ট হচ্ছে। আমরা, বাঙালিরা, ইতিহাস সাক্ষী; আমাদের মুক্তির লড়াই ছিল নিজের ভাষায়, নিজের মাটিতে, নিজের অভিজ্ঞতায় বাঁচার লড়াই। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা রাইফেল হাতে স্বাধীনতা এনেছিলেন; আজ আমাদের সন্তানদের মুক্তির লড়াই হলো মুঠোফোনের পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে বাস্তবতাকে অনুভব করা।
স্টেডিয়ামের গ্যালারি, মাঠের উল্লাস, একসঙ্গে হাজারো মানুষের গান; এসব অভিজ্ঞতা পর্দার ভেতরে আটকে রাখার জিনিস নয়, জীবন্তভাবে উপভোগ করার জিনিস। ডর্টমুন্ড তা বুঝেছে, তাই পুরস্কার দিয়ে মানুষকে ফিরিয়ে আনছে বাস্তব আনন্দে। আমাদের সমাজও ভাবতে শিখুক; প্রযুক্তি থাকুক হাতের মুঠোয়, কিন্তু জীবন যেন পর্দার কাছে বন্দি না হয়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
'ফ্যান মোড' কীভাবে কাজ করে?
ডর্টমুন্ডের অ্যাপে ফ্যান মোড চালু করলে ম্যাচ চলাকালে কতবার ফোন আনলক করা হচ্ছে, তার হিসাব রাখে অ্যাপটি। ফোন যত কম আনলক, পয়েন্ট তত বেশি; শেষে সর্বোচ্চ পয়েন্টধারীরা পান প্রিয় খেলোয়াড়ের সই করা জার্সি বা ক্লাবের ভাউচার।
দর্শকরা কি নিষেধ ছাড়াই ফোন ব্যবহার করতে পারেন?
হ্যাঁ। পুরো কার্যক্রমই স্বেচ্ছামূলক। বিরতির সময় ফোন ব্যবহারে কোনো জরিমানা নেই, আর অংশ না নিলে আগের মতোই ছবি তোলা ও ভিডিও করার সুযোগ থাকছে।
