শরীয়তপুরের তরুণ অনুপ কুমার রায় টিউশনির সঞ্চয়ে কেনা একটি কম্পিউটার থেকে শুরু করে আজ আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস আপওয়ার্কের 'টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার'। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মাসে প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনে জানা যায়, ফ্রিল্যান্সিং থেকে তিনি এ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ মার্কিন ডলার বা কোটি টাকার বেশি আয় করেছেন এবং নিজ জেলায় সাতজন কর্মী নিয়ে ছোট একটি অফিস চালু করেছেন।
এই সাফল্যের পথটা কখনোই সহজ ছিল না। অভাব-অনটনের সংসারে বেড়ে ওঠা এই তরুণের গল্পটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রতিটি বাঙালির জন্য এক গভীর অনুপ্রেরণা। ১৯৭১ সালে আমাদের পূর্বসূরিরা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা কিনেছিলেন; আজ এই প্রজন্ম ঘাম দিয়ে, মেধা দিয়ে সেই স্বাধীনতার অর্থকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করছে। কোনো বিদেশি অনুদান নয়, কোনো পরনির্ভরতা নয়; নিজের শ্রম, নিজের ভাষা আর নিজের দক্ষতাই অনুপের মুদ্রা।
অভাবের সংসারে শৈশব ও পড়াশোনা
বাবা অসিত বরণ রায় ও মা পদ্মা রাণী রায়ের একমাত্র সন্তান অনুপ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাবার চাকরির সুবাদে জীবনের বড় একটা সময় কেটেছে বান্দরবান জেলায়। ২০১৫ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পাসের পর শরীয়তপুরের জাজিরা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে অনার্স এবং পরে নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন তিনি।
পড়াশোনার খরচ চালানো এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ২০১৬ সাল থেকে টিউশনি শুরু করেন অনুপ। পাশাপাশি একটি কোচিং সেন্টারেও দীর্ঘদিন পড়িয়েছেন। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত টিউশনি করে সংসার ও পড়াশোনা চালাতে হতো তাঁকে; প্রতিটি টাকা হিসাব করে খরচ করতে হতো। শিক্ষার্থীদের পড়ানো শুধু আয়ের মাধ্যম ছিল না, সেটি তাঁকে দায়িত্ব নিতে ও সময়ের মূল্য বুঝতে শিখিয়েছে।
টিউশনির টাকায় কেনা সেই কম্পিউটার
ডিজিটাল মার্কেটিং শেখার জন্য কম্পিউটার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু একসঙ্গে প্রায় ৭০ হাজার টাকা জোগাড় অনুপের পক্ষে অসম্ভব ছিল। তিনি হাল ছাড়েননি। টিউশনির আয় থেকে ধীরে ধীরে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা জমানোর পর বাকি ৩৫ হাজার মা ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে কম্পিউটার কেনেন। কম্পিউটারটি হাতে পাওয়ার মুহূর্তে খুশিতে তাঁর চোখে পানি চলে এসেছিল। সেটি ছিল শুধু একটি যন্ত্র নয়; জীবনের গতিপথ বদলে দেওয়ার চাবিকাঠি। কেনার পর আবার টিউশনি করেই ধারের সব টাকা পরিশোধ করে দেন তিনি।
প্রথম আয় ২০ ডলার, তারপর কোটি টাকা
প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অনুপ বলেন, 'সফলতার পথটা এত মসৃণ ছিল না। শুরুতে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ নিলেও ছয়-সাত মাস কেটে যাওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়া যায়নি।'
তিনি আরও বলেন, 'সময় ও টাকা নষ্ট হওয়ার পরও আমি থেমে থাকিনি। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, শুধু কোর্স করলেই দক্ষ হওয়া যায় না, নিয়মিত অনুশীলন ও সমস্যা বুঝে সমাধান খোঁজাও জরুরি। এরপর শামীম হুসাইনের আইটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্কিলআপার থেকে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পাশাপাশি গুগলের বিভিন্ন অনলাইন কোর্স, ইউটিউব ও অনলাইন শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করে রাত জেগে নিজে নিজে শেখা চালিয়ে যাই।'
প্রায় এক বছর চেষ্টার পর ২০২২ সালের জুনে ফাইভারে প্রথম পেইড মিডিয়ার কাজ করে ২০ ডলার আয় করেন অনুপ। অঙ্কটা ছোট হলেও তাঁর কাছে সেটি ছিল বিশাল অর্জন। এরপর আপওয়ার্কে পেশাগত পরিচিতি গড়ে তোলেন এবং লিংকডইনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক বাড়ান। নিয়মিত মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় শুরু হলে নিজের জন্য কিছু না কিনে আয়ের বড় অংশই মায়ের হাতে তুলে দিতেন তিনি। টাকা পাওয়ার আনন্দের চেয়ে মায়ের মুখের স্বস্তি ও হাসিই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
বর্তমানে কী কাজ করছেন অনুপ
বর্তমানে ফাইভার ও আপওয়ার্ক, উভয় প্ল্যাটফর্মেই ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে কাজ করছেন অনুপ। তিনি মূলত পেইড মিডিয়া, গুগলের বিজ্ঞাপন পরিচালনা এবং কনভার্সন ট্র্যাকিং নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যবসা ও ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সির সঙ্গে কাজ করছেন। পাশাপাশি ইউরোপের একটি ফ্যাশন হাউসের মার্কেটিং ও বিজনেস ডেভেলপমেন্টের দায়িত্বে আছেন।
একা কাজের দিন পেরিয়ে এখন নিজ জেলা শরীয়তপুরে নিজের ছোট অফিস চালু করেছেন তিনি। সেখানে পেইড মিডিয়া পরিচালনা, সেলস ও মার্কেটিং, ক্লায়েন্ট ম্যানেজমেন্ট এবং প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ চলছে। বর্তমানে তাঁর মাসিক আয় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা, আর এক মাসে সর্বোচ্চ ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করেছেন তিনি।
একা নন, অনেকের গল্প একই পথে
অনুপের মতো নিজের শ্রমে স্বনির্ভর হওয়ার গল্প এই দেশে কম নয়। ঢাকা মেইলের প্রতিবেদনে জানা যায়, কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থী মাহমুদ একটি মোবাইল ফোন দিয়ে শুরু করে আজ সফল উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সার। আবার রাইজিংবিডির খবর অনুযায়ী, বন্ধুর ল্যাপটপে কাজ শুরু করা আরেক মাহমুদ এখন মাসে ২ থেকে ৩ হাজার ডলার আয় করেন এবং ২২-২৫ জন তরুণ-তরুণীকে নিয়মিত বেতনে কাজ দিচ্ছেন। এই তরুণেরা কারও ঋণ শোধ করছে না; তারা বিশ্বকে দেখাচ্ছে, বাঙালির মেধা যেকোনো দেশের তরুণের চেয়ে এগিয়ে।
এটাই আসলে আমাদের জাতীয় শক্তির প্রমাণ। ১৯৭১-এ আমরা যুদ্ধে জিতেছিলাম রাজনৈতিক স্বাধীনতা; আজ এই প্রজন্ম অর্জন করছে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। যে জাতি নিজের ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে, সেই জাতির সন্তানেরা নিজের মেধা দিয়েই বিশ্ববাজারে জায়গা করে নেবে, এটাই স্বাভাবিক।
নতুনদের পরামর্শ
নতুনদের উদ্দেশে অনুপ বলেন, ফ্রিল্যান্সিং রাতারাতি ধনী হওয়ার কোনো শর্টকাট নয়; একে দীর্ঘমেয়াদি পেশা হিসেবে নিতে হবে। ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে অন্তত এক থেকে দেড় বছর নিয়মিত শেখা ও অনুশীলনের প্রস্তুতি রাখতে হবে। বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যুগে কাজের পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক এআই টুল ও প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার শেখার ওপরও জোর দিতে হবে। তাঁর ভাষায়, সততা আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকেও অসাধারণ সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
অনুপ কুমার রায়ের প্রথম ফ্রিল্যান্সিং আয় কত ছিল?
২০২২ সালের জুনে ফাইভারে প্রথম পেইড মিডিয়ার কাজ করে অনুপ ২০ ডলার আয় করেছিলেন।
অনুপ বর্তমানে মাসে কত আয় করেন?
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী তাঁর বর্তমান মাসিক আয় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা, আর এক মাসে সর্বোচ্চ ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করেছেন।
অনুপের কম্পিউটার কেনার টাকা কোথা থেকে এসেছিল?
টিউশনির আয় থেকে জমানো প্রায় ৩৫ হাজার টাকা এবং মা ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার নেওয়া বাকি ৩৫ হাজার টাকা মিলিয়ে প্রায় ৭০ হাজার টাকায় কম্পিউটারটি কেনেন তিনি।
ফ্রিল্যান্সিংয়ে সফল হতে কত সময় লাগে?
অনুপের পরামর্শ অনুযায়ী, ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে অন্তত এক থেকে দেড় বছর নিয়মিত শেখা ও অনুশীলনের প্রস্তুতি রাখতে হবে।
