ময়মনসিংহের এক তরুণী টিউশনির মাত্র ১ হাজার ৯০০ টাকা দিয়ে শুরু করা হস্তশিল্পের কাজ এখন মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন উদ্যানে বসে নিজের তৈরি কৃত্রিম ফুলের তোড়া বিক্রি করেছেন সুমাইয়া আক্তার ইলমা (২৪)। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, ক্রেতাদের সাড়া পেয়ে আশাবাদী হয়েছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।
এই গল্পটি কেবল একজন তরুণীর ব্যক্তিগত সাফল্যের কথা নয়। এটি আমাদের জাতীয় চরিত্রেরই প্রতিচ্ছবি। ১৯৭১ সালে যে জাতি রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা কিনেছিল, সেই জাতির কন্যারা আজ নিজের হাতে, নিজের মেধায় নিজের অর্থনীতি গড়ছে। কারও দয়ার জন্য অপেক্ষা নয়, দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে স্বনির্ভরতার পথে হাঁটছে তরুণ প্রজন্ম।
১ হাজার ৯০০ টাকা থেকে উদ্যোগের যাত্রা
ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ভালুকা এলাকার বাসিন্দা সুমাইয়া। এ বছর গৌরীপুর সরকারি কলেজ থেকে সমাজকর্মে স্নাতক শেষ করেছেন। ২০২৪ সালে তাঁর বিয়ে হয়। স্বামী বাহার উদ্দিন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সংসারের কাজ, পড়াশোনা ও টিউশনি সামলে অবসরে তৈরি করেন ফুলের তোড়া।
উদ্যোগের শুরু ২০২১ সালের শেষ দিকে। টিউশনির ১ হাজার ৯০০ টাকা দিয়ে শুরু করেন হস্তশিল্পের কাজ। প্রথমে ছবি আঁকতেন, করতেন ক্যানভাস পেইন্টিং। পরে হাতে নকশা করা পাঞ্জাবি, শাড়ি, ফটোফ্রেম ও শুভেচ্ছা কার্ড তৈরি করে অনলাইনে বিক্রি শুরু করেন। তাঁর ফেসবুক পেজের নাম 'ইলমা রাফটস'।
সুমাইয়া বলেন, 'ছোটবেলা থেকেই আর্ট ও ক্রাফটের প্রতি আগ্রহ ছিল। পরিবারের চাওয়া ছিল, পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করি। তবে এসব কাজের প্রতি আমার টান রয়েছে। তাই পড়াশোনা ও অন্যান্য কাজের পাশাপাশি উদ্যোগটি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।'
পাইপ ক্লিনারে তৈরি ফুল, দাম শুরু ৮০ টাকা
আট-নয় মাস ধরে সুমাইয়া পাইপ ক্লিনার দিয়ে নানা নকশার ফুল বানাচ্ছেন। পাইপ ক্লিনার হলো মখমল বা তুলার মতো ফাইবারে জড়ানো নমনীয় ও চিকন ধাতব তার। ফেসবুকে এসব ফুল তৈরির ভিডিও দেখে তাঁর আগ্রহ জন্মে। ছোট, মাঝারি, বড় নানা আকারের তোড়া বানান তিনি। ক্রেতার পছন্দমতো রং ও নকশাও করে দেন।
তাজা ফুল কয়েক দিনেই শুকিয়ে যায়, কিন্তু পাইপ ক্লিনারে তৈরি কৃত্রিম ফুল যত্নে রাখলে দীর্ঘদিন ভালো থাকে। ময়লা হলে পানি ও সাবান দিয়ে পরিষ্কার করা যায়। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৮ ইঞ্চি লম্বা ও ৯ মিলিমিটার পুরু একটি পাইপ ক্লিনারের দাম দুই থেকে তিন টাকা। চীন ও জাপান থেকে অনলাইনে এসব উপকরণ দেশে আনেন বিক্রেতারা, তাঁদের কাছ থেকেই সংগ্রহ করেন সুমাইয়া। সঙ্গে লাগে ফ্লোরাল টেপ, ফিতা ও মোড়ানোর কাগজ।
একটি বড় তোড়া বানাতে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার উপকরণ লাগে। সময় লাগে দুই থেকে তিন ঘণ্টা, নকশাভেদে কখনো আরও বেশি। এমন একটি তোড়া বিক্রি হয় প্রায় এক হাজার টাকায়। সুমাইয়ার তৈরি তোড়ার দাম শুরু ৮০ টাকা থেকে। কয়েক দিন আগে তিনি তিন হাজার টাকার একটি তোড়াও বিক্রি করেছেন। সব খরচ বাদে তোড়া বিক্রি করেই মাসে আয় করছেন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা।
চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
এই কাজে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মানসম্মত উপকরণের পাইকারি বাজার খুঁজে পাওয়া। সুমাইয়া বলেন, 'অনেকে খুচরা বিক্রি করেন। কিন্তু ভালো মানের উপকরণ কম দামে কোথায় পাওয়া যায়, তা খুঁজে বের করতে বেশ কষ্ট হয়েছে। এখনো পড়াশোনা, টিউশনি ও সংসারের কাজের পর বিকেলে বা রাতে সময় বের করে কাজ করি।'
ফুলের তোড়া তৈরির কাজ শুরুর পর অন্যান্য হস্তশিল্পের কাজ আর করেন না সুমাইয়া। তাঁর ভাষ্য, অনলাইনে সেসব পণ্য বিক্রির কাজ অনেকেই করেন, একসময় তাঁর হস্তশিল্পের পণ্য বিক্রিও কমতে থাকে। তাই অন্য রকম কিছু তৈরির চিন্তা করেন তিনি।
স্বামীর সহযোগিতা, ক্রেতাদের সাড়া
স্বামী বাহার উদ্দিনও সুমাইয়ার পাশে আছেন। উপকরণ সংগ্রহ থেকে প্যাকেজিং, নানা কাজে সহযোগিতা করেন তিনি। বাহার বলেন, 'আগে ও হাতে নকশা করা পাঞ্জাবি তৈরি করে অনলাইনে বিক্রি করত। পরে ভিডিও দেখে নতুন কাজ শিখেছে। কাজটা ভালো। অবসর সময় কাজে লাগিয়ে নিজের একটা উদ্যোগ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। লেগে থাকলে সামনে আরও ভালো করা সম্ভব।'
উদ্যানে ঘুরতে আসা সাবিহা বিনতে জামান ও নীলা নৌরিন ফুলগুলো হাতে নিয়ে দেখছিলেন। তাঁদের ভাষ্য, ফুলগুলো খুবই সুন্দর। তাজা ফুল কদিনেই নষ্ট হয়ে যায়, অথচ কাছাকাছি দামে এই ফুল ঘরে সাজিয়ে রাখা যাবে দীর্ঘদিন।
কেন এই গল্প আমাদের সবার জানা দরকার
আমাদের দেশে কর্মসংস্থানের চাপ দিন দিন বাড়ছে। ১৫ বছরে ১২০ কোটি তরুণের জন্য কাজ মাত্র ৪০ কোটি তথ্যটি বলে দিচ্ছে, সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ওপর ভরসা করে বসে থাকা আর সম্ভব নয়। সুমাইয়ার মতো তরুণেরা নিজের উদ্যোগে নিজের ভাগ্য গড়ছে, এটাই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রত্যাশিত চেহারা।
সুমাইয়া বলেন, 'পড়াশোনা ও পরিবারের দায়িত্ব সামলে এই কাজটাও চালিয়ে যেতে চাই। অনেক নারী ও তরুণ এ ধরনের কাজ করছেন। তাঁদের দেখে উৎসাহ পাই। নিয়মিত কাজ করতে পারলে একদিন উদ্যোগটি আরও বড় করতে পারব বলে আশা করি।'
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা শিখেছি, অধিকার কারও দান করে না, অর্জন করতে হয়। সেই অর্জনের লড়াই আজ অর্থনীতির মাঠেও। সুমাইয়ার ১ হাজার ৯০০ টাকার সেই শুরু আমাদের প্রত্যেক তরুণের জন্য পথ দেখায়। নিয়মিত কাজ করতে না পারায় তাঁর বিক্রি এখনো সীমিত, তবে অনলাইনে পণ্য বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
সুমাইয়া কীভাবে তাঁর উদ্যোগ শুরু করেছিলেন?
২০২১ সালের শেষ দিকে টিউশনির ১ হাজার ৯০০ টাকা দিয়ে সুমাইয়া হস্তশিল্পের কাজ শুরু করেন। প্রথমে ক্যানভাস পেইন্টিং ও হাতে নকশা করা পাঞ্জাবি, শাড়ি, ফটোফ্রেম ও শুভেচ্ছা কার্ড বিক্রি করতেন, পরে পাইপ ক্লিনারের ফুলের দিকে ঝোঁকেন।
সুমাইয়ার কৃত্রিম ফুলের দাম কত?
সুমাইয়ার তৈরি তোড়ার দাম শুরু ৮০ টাকা থেকে। একটি বড় তোড়া বিক্রি হয় প্রায় এক হাজার টাকায়, কয়েক দিন আগে তিনি তিন হাজার টাকার একটি তোড়াও বিক্রি করেছেন।
পাইপ ক্লিনারের ফুল কত দিন ভালো থাকে?
তাজা ফুল কয়েক দিনেই শুকিয়ে যায়, কিন্তু পাইপ ক্লিনারে তৈরি কৃত্রিম ফুল যত্নে রাখলে দীর্ঘদিন ভালো থাকে। ময়লা হলে পানি ও সাবান দিয়ে পরিষ্কার করা যায়।
সুমাইয়ার মাসিক আয় কত?
সব খরচ বাদে তোড়া বিক্রি করে সুমাইয়া মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয় করছেন, যদিও নিয়মিত কাজ করতে না পারায় বিক্রি এখনো সীমিত।
