কক্সবাজারের উখিয়ায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের প্রাণহানির পরও মেরিন ড্রাইভ ঘিরে অনুমোদন ছাড়া হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণ থামছে না। গত ১৯ অক্টোবর প্রথম আলোর সংবাদ অনুযায়ী, প্রাণহানির পরদিনও পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় নতুন রিসোর্ট নির্মাণ চলছে।
টুপটুপের মৃত্যুঞ্জয়ী শিকারদের স্মৃতি এখনো তাজা, অথচ প্রশাসনের উদাসীনতায় একই বিপদের বীজ বুনে চলেছে একের পর এক উদ্যোক্তা। আমাদের জাতীয় সম্পদ, পৃথিবীর দীর্ঘতম সৈকত, আজ অবাধ ব্যবসার হাতে জিম্মি।
সোনালি সৈকতে কীভাবে গড়ে উঠছে মৃত্যুফাঁদ
প্রথম আলোর তদন্তী প্রতিবেদন জানাচ্ছে, উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতের পাশেই প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) গড়ে উঠছে কোরাল বিচ রিসোর্ট। পুড়ে যাওয়া টুপটুপ রিসোর্ট থেকে হাঁটা দূরত্ব মাত্র এক মিনিট। সেখানেও নেই অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, নেই কোনো সনদ। প্রায় ১০ বিঘা জমিতে দোতলা ভবন তৈরি হয়ে গেছে। রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, ধাপে ধাপে সব সনদ সংগ্রহ করা হবে।
অর্থাৎ নির্মাণের আগে অনুমোদন নেওয়ার নিয়ম না মেনে আগে স্থাপনা, পরে কাগজপত্র, এটাই যেন কক্সবাজারের অলিখিত নীতি। মাঠপর্যায়ে বাধা না পাওয়ায় উদ্যোক্তারা নির্ভয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছেন।
টুপটুপ রিসোর্টের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর বন্ধের নোটিশ দিয়েছিল, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) দুই দফা নোটিশ দিয়ে ভেঙে ফেলতে বলেছিল, ফায়ার সার্ভিস ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে সতর্ক করেছিল। তবু সেই রিসোর্টেই আগুনে প্রাণ গেছে ১০ পর্যটকের, যাঁদের ছয়জন একই পরিবারের।
সংখ্যায় যা বলছে কক্সবাজারের বাস্তবতা
সরকারি সংস্থা, হোটেলমালিক সমিতি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পাওয়া প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলায় সাত শতাধিক আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতিসহ নানা অনিয়ম রয়েছে। জেলায় হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ মিলিয়ে সংখ্যা এখন দুই হাজারের বেশি; ২০০০ সালে যা ছিল মাত্র দুই শতাধিক।
অথচ জেলায় অগ্নিনিরাপত্তা সনদ রয়েছে মাত্র ১১৫টি হোটেল-রিসোর্টের, পরিবেশগত ছাড়পত্র ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের। হোটেলমালিকদের হিসাব অনুযায়ী বছরে অন্তত ৯০ লাখ পর্যটক কক্সবাজারে আসেন। তাঁদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়ার কেউ নেই।
কউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে প্রায় আড়াই হাজার স্থাপনা গড়ে উঠেছে, এর মধ্যে হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ প্রায় ২৫০টি। তারকা মানের কয়েকটি ছাড়া অন্যগুলোর বৈধ অনুমোদন নেই।
নোটিশ, জরিমানা, মামলা; কিন্তু ব্যবসা থেমে নেই কেন
কলাতলীর আটতলা হোটেল কক্স রোটানার অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ও পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। পরিবেশগত ছাড়পত্রও নেই। হোটেল সি সোর, আরহাম রিসোর্ট, মডার্ন রিসোর্ট ও পার্ল এভিনিউরও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই। সবাইকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ব্যবসা চলছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, গত এক বছরে ৫৫টি হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁকে মোট ১ কোটি ২৭ লাখ ৩৪ হাজার ১৫৮ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে। শতাধিক রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ২৮টি। তবু পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জমির উদ্দিন স্বীকার করেছেন, তবু কাজ হচ্ছে না।
দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থাগুলো নামমাত্র জরিমানা, নোটিশ ও মামলা করে একধরনের দায় সারছে। আইনের তোয়াক্কা না করে পরিবেশের ওপর ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ঠিকই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান।
এ কথা বলেছেন কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা। তাঁর মতে, অবৈধ স্থাপনাগুলো অবিলম্বে উচ্ছেদের মাধ্যমে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়াই সময়ের দাবি।
পরিবেশবাদী সংগঠন ধরার কক্সবাজার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, কউক, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের গাফিলতিতেই একের পর এক বেআইনি হোটেল-রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। পুরো কক্সবাজার শহরই গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে।
সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন এখানেও
১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তার মূল চেতনা হলো নিজের ভূমি, নিজের জনগণ আর নিজের সম্পদের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ। কক্সবাজারের সৈকত আমাদের জাতীয় সম্পদ, বিদেশি পর্যটকের কাছে বাংলাদেশের মুখর প্রতীক। সেই সৈকত যখন মুনাফালোভী একশ্রেণীর অবাধ দখলে চলে যায়, তখন তা শুধু পরিবেশের ক্ষতি নয়, রাষ্ট্রের সার্বভৌম দায়িত্বের ব্যর্থতা।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ইসিএভুক্ত এলাকায় হোটেল-কটেজ নির্মাণের কোনো সুযোগ আর কাউকে দেওয়া হবে না। শীত মৌসুমে বিপুল পর্যটক আসবেন, তাঁদের নিরাপত্তা দিতে অগ্নিনির্বাপণ সনদ না থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সিলগালা করা উচিত। কথার মতো কাজ হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
মামলা ও অসহায় স্বজনের অপেক্ষা
টুপটুপ রিসোর্ট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ, প্রধান আসামি মালিক মো. তানভীর। ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম ওরফে সুমনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। নিহত ১০ জনের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে পড়ে আছে। আগুনে পুড়ে চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া পরিচয় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
আশুলিয়ার স্কুলশিক্ষিকা নাসরিন আক্তারের সন্ধান এখনো মেলেনি। স্বামী দেওয়ান ফয়সাল হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বলেন, লাশের যে অবস্থা দেখা গেল, কারও পরিচয় শনাক্ত করারই উপায় নেই।
প্রশ্ন হলো, অগ্নিকাণ্ডের পর কী হবে?
কক্সবাজারে কতগুলো হোটেল-রিসোর্টে অগ্নিনিরাপত্তা সনদ আছে?
দুই হাজারের বেশি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের মধ্যে মাত্র ১১৫টির অগ্নিনিরাপত্তা সনদ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য জানিয়েছে প্রথম আলো।
ইসিএ এলাকায় নির্মাণ কি বৈধ?
না। ২০১৬ সালের ব্যবস্থাপনা বিধিমালায় ইসিএভুক্ত জমির শ্রেণি পরিবর্তনে পরিবেশ অধিদপ্তরের সম্মতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
টুপটুপ রিসোর্টের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
পরিবেশ অধিদপ্তর, কউক ও ফায়ার সার্ভিস একাধিক নোটিশ দিয়েছিল, কিন্তু ব্যবসা বন্ধ হয়নি। ফলাফল: ১০ পর্যটকের মৃত্যু।
সরকার এখন কী করতে যাচ্ছে?
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের দাবি, গত দুই সপ্তাহে শহরে দুই শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, অগ্নিনিরাপত্তা সনদ না থাকা প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা উচিত। আগামী শীত মৌসুমের আগে এই প্রতিশ্রুতি কার্যকর হয় কি না, সেটাই জাতির কাছে প্রশাসনের পরীক্ষা।
