দেশের আবাসন খাত দুই বছরের বেশি সময় ধরে মন্দার মধ্যে পড়ে আছে; নির্মাণসামগ্রীর ঊধর্বমুখী মূল্য, জমির অস্বাভাবিক দাম ও ব্যাংকঋণের সুদের হার বৃদ্ধির কারণে মধ্যবিত্তের জন্য ফ্ল্যাট কেনা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। ১৪ অক্টোবর প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ইঞ্জিনিয়ার শাহ মো. মাসুদ ইব্রাহিম এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে সাশ্রয়ী আবাসনঋণ, নির্মাণসামগ্রীর বাজার স্থিতি এবং রাজধানীর বাইরে পরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণের ওপর জোর দিয়েছেন।
মধ্যবিত্ত বাংলাদেশির কাছে একটি ফ্ল্যাট কেবল ইট-কাঠের কাঠামো নয়; সেটি স্বাধীন দেশে নিজের ঠিকানার প্রতীক। ১৯৭১ সালে যে জাতি রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা কিনেছিল, সেই জাতির সন্তানের নিজের ছাদের নিচে ঘুমানোর স্বপ্ন পূরণ হওয়ার কথা। কিন্তু অর্থনীতির নির্মম হিসাবে সেই স্বপ্ন এখন প্রায় দুর্গম। মাসুদ ইব্রাহিমের বক্তব্য সেই বাস্তবতারই স্বীকারোক্তি।
আবাসন নির্মাণের ব্যয় কেন বাড়ছে
প্রথম আলোর প্রশ্নের জবাবে শাহ মো. মাসুদ ইব্রাহিম বলেন, মধ্যবিত্তের আবাসন চাহিদা পূরণ করা তাঁদের ব্যবসায়িক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, জমির উচ্চমূল্য এবং ব্যাংকঋণের সুদের হার বৃদ্ধির কারণে আবাসন নির্মাণের ব্যয় অনেক বেড়েছে। ফলে একদিকে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা, অন্যদিকে নির্মাণের গুণগত মান ও নিরাপত্তা, দুইয়ের ভারসাম্য রাখা তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি জানান, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রকল্পের পরিকল্পনা, নির্মাণ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং জায়গার সর্বোত্তম ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কার্যকর নকশা তৈরি ও নির্মাণকাজের প্রতিটি পর্যায়ে দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে; ক্রেতাদের চাহিদা ও সামর্থ্য বিবেচনায় রেখে ফ্ল্যাটের আয়তন ও বিন্যাস নির্ধারণ করা হচ্ছে।
প্রথম সারির প্রতিষ্ঠান কেন ১ কোটি টাকার নিচে ফ্ল্যাট দিতে পারে না
সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে একটি সংবেদনশীল প্রশ্ন: ছোট প্রতিষ্ঠান ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকায় ফ্ল্যাট দিতে পারলেও প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানগুলো কেন ১ কোটি টাকার নিচে যেতে পারছে না। মাসুদ ইব্রাহিমের ব্যাখ্যা, ফ্ল্যাটের মূল্য নির্ধারণে শুধু প্রতিষ্ঠানের আকার বিবেচনা করলে সম্পূর্ণ চিত্র মেলে না। প্রকল্পের অবস্থান, জমির মূল্য, ফ্ল্যাটের আয়তন, ভবনের নকশা, নির্মাণের মান এবং সুযোগ-সুবিধার ওপর ভিত্তি করেই দাম নির্ধারিত হয়।
“আমরা মনে করি, ক্রেতাদের কাছে মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি স্বচ্ছ হওয়া উচিত। একটি ফ্ল্যাট কেনার সময় শুধু প্রাথমিক মূল্য নয়, নির্মাণের গুণগত মান, কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারযোগ্যতাও বিবেচনা করা জরুরি।”
তবে তিনি স্পষ্ট স্বীকার করেন, মধ্যবিত্তের জন্য আরও সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ প্রয়োজন। ভবিষ্যতে জমির ব্যবহার ও নকশার কার্যকারিতা বাড়িয়ে মূল্য নিয়ন্ত্রণের সুযোগ খুঁজবেন বলে তিনি জানান। এই স্বীকারোক্তিটুকুই বলে দেয়, সমস্যাটা ব্যক্তিগত উদ্যোগের সীমানা ছাড়িয়ে গত কয়েক বছরের মূল্যস্ফীতির বাজারের সামষ্টিক ব্যর্থতার অংশ; যে বাজারে সাধারণ পরিবারের সঞ্চয়ের পথও সংকুচিত হয়ে আসছে।
ক্রেতারা কী ধরনের ফ্ল্যাট চাচ্ছেন
মাসুদ ইব্রাহিম বলেন, বর্তমানে ক্রেতারা এমন ফ্ল্যাটে আগ্রহী, যেখানে পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী জায়গার সঠিক ব্যবহার, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত থাকে। প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, কার্যকর কক্ষবিন্যাস, পর্যাপ্ত পার্কিং, লিফট এবং শিশু ও বয়স্কদের জন্য উপযোগী পরিবেশ, এসব বিষয় এখন ক্রেতাদের বিবেচনায় আছে।
তাঁর ভাষাযে, আবাসন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কেবল ফ্ল্যাট নির্মাণ ও বিক্রি নয়; এমন একটি বসবাসের পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একটি পরিবার দীর্ঘ মেয়াদে স্বচ্ছন্দে থাকতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের নগর চেতনার জন্য আশাব্যঞ্জক; কারণ স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরেও আমাদের শহরগুলো হাঁপানো বস্তির মতো, যেখানে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মন্দা কাটাতে কী করা দরকার
আবাসন খাতের স্থবিরতা নিয়ে মাসুদ ইব্রাহিম সমন্বিত উদ্যোগের কথা বলেন। তাঁর মতে, এই খাতের সঙ্গে নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন ও সরবরাহ, পরিবহন, প্রকৌশল, স্থাপত্য এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত; তাই আবাসনের গতি ফেরানো সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও জরুরি।
তিনি তিনটি পদক্ষেপের কথা বলেন। প্রথমত, ক্রেতাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সাশ্রয়ী আবাসনঋণের সুযোগ বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, নির্মাণসামগ্রীর বাজারে মূল্য স্থিতিশীলতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন; নির্মাণ ব্যয় কমলে ফ্ল্যাটের দামও ক্রেতার সামর্থ্যের সঙ্গে মানানসই হবে। তৃতীয়ত, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে স্বচ্ছ ও নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ও কমে।
শুধু শহরের ভেতরে প্রকল্প করলে চলবে না
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরামর্শটি নগর পরিকল্পনা নিয়ে। মাসুদ ইব্রাহিম বলেন, দেশের আবাসন চাহিদা পূরণে শুধু শহরের ভেতরে নতুন প্রকল্পের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। পরিকল্পিতভাবে শহরের সম্প্রসারণ করতে হবে, যাতে রাজধানীর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমে। নতুন এলাকায় সড়ক, গণপরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করে উন্নত নগর গড়ে তোলা সম্ভব; এতে আবাসন ব্যয়ও কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এই পরামর্শটি আমাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ঢাকাকে কেন্দ্রীভূত করে গড়ে ওঠা একচেটিয়া নগর কাঠামো শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্যই বাড়ায় না, জাতীয় জীবনের ভারসাম্যও নষ্ট করে। দেশের অভ্যন্তরের জেলা শহরগুলোতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ হলে মানুষ বাধ্য হবে না জীবিকার জন্য রাজধানীর দিকে ছুটতে। একটি সার্বভৌম, আত্মনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন তাই শুরু হয় মাটি ও নগরের সুষম ব্যবহার থেকেই।
আগামী দিনের পরিকল্পনা
আগামী দুই থেকে তিন বছরের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে মাসুদ ইব্রাহিম জানান, পরিকল্পিত ও আধুনিক আবাসন প্রকল্পের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। কনডোমিনিয়াম বা কনডো-ধাঁচের প্রকল্প এবং ন্যূনতম ১০ কাঠা আয়তনের জমিতে উন্নয়নযোগ্য প্রকল্প তাঁদের বিবেচনায় রয়েছে। জমির সর্বোত্তম ব্যবহার, আধুনিক স্থাপত্য, নিরাপত্তা ও বসবাসের স্বাচ্ছন্দ্য একসঙ্গে নিশ্চিত করতে চান তিনি।
মূল্যস্ফীতির এই বাজারে মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ কীভাবে রক্ষা করা যায়, সেই প্রশ্নও এখন প্রতিটি পরিবারের সামনে দাঁড়িয়ে; আবাসনের সিদ্ধান্ত সেই হিসাবেরই অংশ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়া একটি ন্যায়সঙ্গত অর্থনীতিতে নাগরিকের আশ্রয়ের অধিকার নিয়ে আলোচনা অপরিহার্য, কারণ স্বাধীনতা কেবল পতাকার রং নয়; সেটি নিজের ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর অধিকারও বটে।
প্রশ্নোত্তর
আবাসন খাতে মন্দা কত দিন ধরে চলছে?
প্রথম আলোর সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, আবাসন ব্যবসায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে মন্দা চলছে।
প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানগুলো ১ কোটি টাকার নিচে ফ্ল্যাট দিতে পারছে না কেন?
শাহ মো. মাসুদ ইব্রাহিমের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রকল্পের অবস্থান, জমির মূল্য, নির্মাণের মান ও সুযোগ-সুবিধার ওপর ভিত্তি করেই দাম নির্ধারিত হয়; প্রতিষ্ঠানের আকার একমাত্র মানদণ্ড নয়।
মন্দা কাটাতে মাসুদ ইব্রাহিম কী পরামর্শ দিয়েছেন?
সাশ্রয়ী দীর্ঘমেয়াদি আবাসনঋণ, নির্মাণসামগ্রীর মূল্য স্থিতি, অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা হ্রাস এবং রাজধানীর বাইরে পরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ, এই চারটি পদক্ষেপের ওপর তিনি জোর দিয়েছেন।
