গত নভেম্বরে প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণা জানাচ্ছে, ১৯৯৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে চীনের ম্যানগ্রোভ বনের আয়তন ১৬৬ শতাংশ বেড়েছে এবং উপকূলীয় পাখির প্রজাতি ১৪৮ থেকে বেড়ে ৩৯৭-তে পৌঁছেছে। দ্য ইনোভেশন জার্নালে প্রকাশিত এই ২২ বছরের গবেষণা আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে: আমাদের সুন্দরবন, আমাদের জাতীয় সম্পদ, কি সেই পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব?
এই গবেষণার তথ্য প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। চীনের নিংবো ইউনিভার্সিটির ভূগোল ও স্থানিক তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের পাঁচ গবেষক এই অধ্যয়ন পরিচালনা করেছেন।
চীনের সাফল্যের সংখ্যা কী বলছে
গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে চীনের ম্যানগ্রোভ বনের মোট আয়তন ১০ হাজার ৬১৭ হেক্টর থেকে বেড়ে ২৮ হাজার ১৯৪ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। আইইউসিএনের লাল তালিকাভুক্ত সংকটাপন্ন পাখির সংখ্যা ১১ থেকে বেড়ে ২১ হয়েছে, অর্থাৎ সংকটাপন্ন পাখির পরিমাণ ৯১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। হুমকির তালিকাভুক্ত পাখিরাও ম্যানগ্রোভ এলাকায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
গবেষকেরা ১৩ হাজার ৩০০টির বেশি ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে এই ফলাফলে পৌঁছেছেন। পাখির তথ্য এসেছে জিবিআইএফের ই-বার্ড ডেটাসেট থেকে। বিশ্বের বাইরের প্রেক্ষাপটে বলা যায়, Yahoo News জানিয়েছে, চীনের এই ম্যানগ্রোভ পুনরুজ্জীবন নতুন পাখির ঝাঁক ফিরিয়ে এনেছে।
নীতিমালাই মূল চাবিকাঠি
গবেষকেরা মনে করছেন, চীন সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ও লক্ষ্যভিত্তিক নীতিমালাই এই বন বিস্তারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০০০ সালের চীন জলাভূমি সংরক্ষণ কর্মপরিকল্পনা, ২০০৯ সালের সংশোধিত সামুদ্রিক পরিবেশ সুরক্ষা আইন এবং ২০২১ সালের ডিসেম্বরে কার্যকর হওয়া জলাভূমি সুরক্ষা আইন মিলে ম্যানগ্রোভকে একটি দৃঢ় আইনি কাঠামোর আওতায় এনেছে।
তিনটি ব্যবস্থা বিশেষভাবে কার্যকর হয়েছে: কৃত্রিম উপায়ে চারা রোপণ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বনায়ন, চিংড়ি ঘের পুকুরগুলো পুনরায় ম্যানগ্রোভ ভূমিতে রূপান্তর, এবং আগ্রাসী প্রজাতির কঠোর নিয়ন্ত্রণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ওই অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত বৃদ্ধিও চারা টিকিয়ে রাখায় সহায়ক হয়েছে।
আমাদের সুন্দরবন: স্বাধীন বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ
১৯৭১ সালে আমরা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম এই ভূখণ্ডের প্রতিটি নদী, পাখি ও বনের মালিকানা নিজেদের হাতে ফিরিয়ে আনতে। সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি আমাদের সার্বভৌমত্বের সবুজ প্রাচীর, উপকূলের কোটি মানুষের জীবনরেখা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল হিসেবে সুন্দরবন বঙ্গোপসাগর উপকূলে আমাদের জাতীয় গর্ব।
কিন্তু সত্যটা কঠিন। বিশ্বব্যাপী ম্যানগ্রোভের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গত অর্ধশতাব্দীতে ধ্বংস হয়ে গেছে। আজকের পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ম্যানগ্রোভ অ্যালায়েন্সের তথ্যে ১৯৮০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে বিশ্বে ম্যানগ্রোভ ৩৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল। আমাদের চকরিয়ার সুন্দরবন ধ্বংস হয়েছে চিংড়ি চাষসহ নানা কারণে, ঠিক যেভাবে চীন তার ঘেরগুলো ফিরিয়ে বন বানিয়েছে।
বাংলাদেশ কী শিখতে পারে
গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ম্যানগ্রোভ বৃদ্ধি সরাসরি সামুদ্রিক পরিবেশের মান উন্নত করে, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন নিয়ন্ত্রণ করে এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে পাখির প্রজাতি বাড়ায়। ছোট মাছ, চিংড়ি ও মলাস্কের প্রাচুর্য বাড়ায় পাখিরা খাদ্য ও আশ্রয় পায়, ঝাঁকে ঝাঁকে ফিরে আসে।
আমাদের শুধু গাছ লাগানোই যথেষ্ট নয়। উপকূলের পানি ও মাটির মান, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ও খাদ্যশৃঙ্খলের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন জরুরি। চীনের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, রাষ্ট্রীয় ইচ্ছাশক্তি আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই পার্থক্য গড়ে দেয়। সরকার সুন্দরবন রক্ষা ও চকরিয়ার বন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে; এখন দরকার সেই চেষ্টাকে আইনি কাঠামো ও বিজ্ঞানভিত্তিক মূল্যায়নের আওতাযে আনা।
একটি জাতি যেমন তার ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা করে স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখে, তেমনি তার বন ও নদী রক্ষা করে ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখে। সুন্দরবন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মতোই অনন্য; একবার হারালে পুনরুদ্ধার যুগ যুগ ধরে লাগে। চীন ২২ বছরে যা করেছে, বাংলাদেশও সেই সংকল্প নিয়ে এগোতে পারে, যদি রাষ্ট্র ও জাতি একসঙ্গে কাজ করে।
