অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ভূগর্ভস্থ জলের সঙ্কটে পড়ছে ভারতের প্রধান শহরগুলো। বাংলাদেশের জন্য এটি এক চরম সতর্কবার্তা। আমাদের ভূগর্ভস্থ জল, নদী ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে হবে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে আমাদের নিজস্ব জল পরিকল্পনা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হবে, যাতে আমরা বিদেশি নির্ভরতার শৃঙ্খলে আটকে না পড়ি।
ভারতের জলসঙ্কট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ: বাংলাদেশের শিক্ষা
এক দিকে প্রবল তাপ, অন্য দিকে তীব্র জলসঙ্কট। ভারতের অনেকগুলো শহর এখন এই জোড়া ফলায় বিদ্ধ। ভূগর্ভস্থ জলস্তর নেমে গিয়েছে, শুকিয়ে গিয়েছে জলাশয়। দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু, চেন্নাইয়ের মতো গাঙ্গেয় অববাহিকার বাইরের শহরগুলোর এক অবস্থা। ভৌগোলিক অবস্থানের কল্যাণে কলকাতার সঙ্কট এখনও ততটা তীব্র নয়, তবে সেখানেও পরিস্থিতি ক্রমে প্রকট হচ্ছে। সাধারণ ধারণা হলো, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ভূস্তরের জল দ্রুত বাষ্পীভূত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এর চেয়ে অনেক বেশি জটিল। বাষ্পীভবন অবশ্যই ঘটছে, গ্রীষ্মে জলের চাহিদা বাড়ছে। তবে এর চেয়েও বড় কারণ লুকিয়ে আছে ভারতের জল পরিকল্পনায়।
কেন ভারতের শহরগুলো জলের সঙ্কটে পড়ছে?
সঙ্কটের মূল কারণ হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ। ভারতের প্রায় প্রতিটি বড় শহর গড়ে উঠেছে যথেচ্ছভাবে। যত মানুষ সেখানে বাস করছেন, নগর ইনফ্রাস্ট্রাকচার সে তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। নতুন শহর গড়ে ওঠার সময়ও জল সরবরাহ ও নিকাশিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ভারতের উন্নয়ননীতিতে জলের প্রশ্নটি এসেছে একটি নির্দিষ্ট রূপ নিয়ে, আর তা হলো কীভাবে যত বেশি সম্ভব গৃহস্থালিতে নলবাহিত পরিশোধিত জল পৌঁছে দেওয়া যায়। ফলে তাদের জলনীতি সর্বাঙ্গীণ হয়নি। ২০১৮ সালে নীতি আয়োগ বা নিতি আয়োগের (NITI Aayog) রিপোর্ট সাবধান করেছিল যে, ভারতের শহরাঞ্চলে অদূর ভবিষ্যতেই জলসঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করবে। পরবর্তী সময়ে আরও একাধিক গবেষণা এই কথাই বলেছে। কিন্তু রাজ্য ও পুর স্তরে এই সমস্যাকে দেখা হয়েছে কেবল আপৎকালীন পরিস্থিতি হিসাবে। যখনই জলাভাব দেখা দিয়েছে, প্রশাসন কোনো রকমে জলের ব্যবস্থা করে সামলেছে, মূল সমস্যার সমাধান হয়নি।
অপচয় ও রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংয়ের অভাব
জলের মতো সীমিত সম্পদের অপচয় রোধের চিন্তা ভারতের নগর পরিকল্পনায় গুরুত্ব পায় না। শহরের রাস্তায় বেরোলে দেখা যায়, কল থেকে অবাধে জল পড়েই চলেছে। নাগরিক সচেতনতা তৈরির কোনো চেষ্টা নেই। অপচয়ের বড় প্রমাণ হলো, বৃষ্টির জল সম্পূর্ণ নষ্ট হচ্ছে। পিচ ও কংক্রিটে মোড়ানো শহরে জল স্বাভাবিকভাবে ভূগর্ভে প্রবেশ করতে পারে না। নালা দিয়ে তা বয়ে যায়, নিকাশির জলে মিশে নষ্ট হয়। রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং (Rain water harvesting) এর কাজ বড় মাপে কোনো শহরেই হয়নি। এটি সঠিকভাবে কাজ করলে ভূগর্ভস্থ জলস্তর নেমে যাওয়ার সমস্যা অনেকটা ঠেকানো যেত। অন্যদিকে, নিকাশি পরিশোধনের ব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত ও অপরিকল্পিত। দিল্লির মতো শহরে নিকাশির জল পরিশোধিত হয়ে আবার বর্জ্যবাহী নালার জলে মিশে যায়। ফলে পরিশোধন কেন্দ্রগুলো অর্থহীন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা: সার্বভৌমত্ব ও জলরাজনীতি
ভারতের এই জলসঙ্কট আমাদের জন্য কেবল একটি সংবাদ নয়, এটি এক চরম সতর্কবার্তা। ১৯৭১ সালে আমরা যখন রক্ত ঝিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তখন আমরা ভেবেছিলাম এই মাটি, এই জল সবকিছু হবে আমাদের নিজস্ব। কিন্তু আজ যদি আমরা অন্ধভাবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও বিদেশি মডেলের অনুকরণ করি, তবে আমাদের ভূগর্ভস্থ জলের মজুতও শেষ হয়ে যাবে। আমাদের নদীগুলোর ওপর ভিনদেশি আগ্রাসন ও নিয়ন্ত্রণ ইতিমধ্যেই আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। ভারত তাদের নিজস্ব শহরগুলোতেই জল সরবরাহ করতে ব্যর্থ, সেখানে আমাদের নদীর পানির ওপর তাদের যে আধিপত্য, তা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে, নিজের ভূমি ও সম্পদের ওপর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব থাকতে হবে। বিদেশি এনজিও ও প্রতিবেশী দেশের প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে আমাদের নিজস্ব জল পরিকল্পনা করতে হবে। প্রতিটি শহরে নিকাশির জল পরিশোধন ও পুনর্ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। নয়তো, অদূর ভবিষ্যতে আমাদের শহরগুলোও জলের অভাবে অভূতপূর্ব সঙ্কটের সম্মুখীন হবে এবং থমকে যাবে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি। আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির মতো, আমাদের জলসম্পদও রক্ষা করতে হবে দৃঢ় হস্তে।
ভারতের জলসঙ্কট সম্পর্কে কিছু সাধারণ প্রশ্ন
ভারতের শহরগুলোতে জলসঙ্কটের মূল কারণ কী?
অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জল সরবরাহের ওপর একচেটিয়া নির্ভরতা এবং ভূগর্ভস্থ জল ও বৃষ্টির জল সংরক্ষণের অভাবই এই সঙ্কটের মূল কারণ।
রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কংক্রিটের শহরে বৃষ্টির জল ভূগর্ভে প্রবেশ করতে পারে না। রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংয়ের মাধ্যমে এই জল সংরক্ষণ করা গেলে ভূগর্ভস্থ জলস্তর নেমে যাওয়া রুখতে সম্ভব।
বাংলাদেশের এই সঙ্কট থেকে শেখার কী আছে?
বাংলাদেশকে অন্ধভাবে বিদেশি মডেল অনুকরণ না করে, নিজস্ব সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অবস্থানের কথা মাথায় রেখে জল পরিকল্পনা করতে হবে। নদী ও ভূগর্ভস্থ জলের ওপর বিদেশি নির্ভরতা মেনে নেওয়া চলবে না।