তারেক রহমানের ভারত সফর: ব্রিকস সম্মেলন কি সম্পর্কের নতুন অধ্যায়?
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হবে অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। এই সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত সরকার। কিন্তু এই সফর নিয়ে এখনো কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়নি বাংলাদেশ সরকার। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে কেন আমন্ত্রণ?
বিশ্বের প্রধান উদীয়মান অর্থনীতির জোট ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে ভারত। ব্রিকসের নিয়ম অনুযায়ী, বিভিন্ন আঞ্চলিক জোটের নেতাদের সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ২০২৫ সাল থেকে বিমসটেকের চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেই সূত্রেই তাঁকে এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
গত জুলাইয়ে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়ে এই আমন্ত্রণ জানানো হয়। এরপর থেকেই আলোচনা চলছে যে, এই সফরে যাবেন কি-না বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
দিল্লিতে কী বলল ভারত?
মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাংবাদিকদের বলেন, “দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছি, সেই সঙ্গে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস আউটরিচ সেশনে অংশগ্রহণের জন্যও আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য থাকলে আমরা আপনাদের জানাব।”
অর্থাৎ ভারত সরকারের কাছেও এখনো কোনো বার্তা পৌঁছায়নি যে, তারেক রহমান সেপ্টেম্বরে ভারত সফরে যাবেন কি-না।
ঢাকার অবস্থান কী?
বুধবার পর্যন্ত এই সম্মেলনে তারেক রহমানের যোগ দেওয়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শহীদুল করিম।
গত সোমবার তারেক রহমানের সাথে বৈঠক করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, “প্রধানমন্ত্রীকে না, চেয়ারপারসন অব বিমসটেক দাওয়াত দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে একটা চিঠি লিখেছেন এবং সেই চিঠিটি আমাদের সরকার গঠনের দিন হস্তান্তর করা হয়েছিল। সেখানে তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমন্ত্রণ একটা আছে সেখানে, সেটা আমরা দেখব কোনো এক সময়ে।”
শেখ হাসিনার অবস্থান কি সম্পর্কে প্রভাব ফেলছে?
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারতে আশ্রয় নেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কে বেশ টানাপোড়েন চলছিল। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও ভিসা বন্ধের ঘটনাও ঘটে।
গত পাঁচই অগাস্ট নয়াদিল্লিতে একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলে যুক্ত হয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। এর পরই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় বাংলাদেশ। পরদিন ভারতের রাষ্ট্রদূতের সাথে এ নিয়ে বৈঠকও করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, “শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্ককে আরো বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তিনি (শেখ হাসিনা) আবার সেখানে রাজনৈতিক বক্তব্যও রেখেছেন, এবং সেটা যাতে না রাখতে পারে সে বিষয়ে ভারতকে অনুরোধ করা হয়েছিল বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।”
বিরোধী দলগুলোর ভারত-বিরোধী অবস্থান কি বাধা?
কূটনীতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, জামায়াত, এনসিপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভারত-বিরোধী অবস্থানের কারণে বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি ভারত সফরের বিষয়ে বেশ সতর্ক। বিরোধীপক্ষের এই অবস্থানের কারণে ভারত সফর নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে।
কূটনীতিক বিশ্লেষক মাহফুজুর রহমান বলেন, “এই মুহূর্তে যারা বিরোধী দলে অর্থাৎ সংসদে অবস্থান করছে, তারা সম্ভবত কিছুটা কট্টরপন্থি। তাদের এই অবস্থানের কারণে, সরকার হয়তো অতটা সাহস পাচ্ছেন না এই ধরনের ক্ষেত্রে প্রো-ইন্ডিয়ান একটা সিদ্ধান্ত নিতে।”
সাবেক কূটনীতিকরা কী বলছেন?
সাবেক কূটনীতিকরা মনে করেন, শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল সেটি কাটিয়ে উঠতে দুই দেশের পক্ষ থেকেই চেষ্টা ছিল। তারেক রহমান যদি ভারত সফরে যান তাহলে সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
নয়াদিল্লিতে দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সাবেক সচিব মাশফি বিনতে শামস বিবিসি বাংলাকে বলেন, “প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পারিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে। সেক্ষেত্রে গুরুত্ব পাওয়া উচিত সমতা, ন্যায্যতা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিষয়গুলো।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ তো ব্রিকসের সদস্য হতে ইচ্ছুক। সেখানে গেলে এই ধরনের এনগেজমেন্ট সহজেই ভবিষ্যৎ অংশগ্রহণকে আরো শক্তিশালী করবে।”
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমানের মতে, “এমন যদি হতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আগের দিন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করলেন। পরের দিন ব্রিকসের আউটরিচে অংশ নিলেন, এটা হলে পারফেক্ট হতো। কেননা, ব্রিকসে বাংলাদেশ অনেক আগে থেকে প্রবেশের আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। সেদিক থেকে এই সফর বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।”
তবে তিনি মনে করেন, শুধু সম্মেলনে অংশগ্রহণ নয়, যদি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয় ভারতের সাথে তাহলেই কেবল ভারত সফরে যাওয়া উচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।
বাংলাদেশের জন্য ব্রিকস কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য দেশ নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরেই এই জোটে প্রবেশের আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে বাংলাদেশ। কূটনীতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই সফর বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে ব্রিকসে ভবিষ্যৎ অংশগ্রহণের পথ সুগম করতে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সর্বদা সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নীতিতে পরিচালিত। এই নীতির আলোকেই ব্রিকসের মতো আন্তর্জাতিক জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ দেখা উচিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ভারত সফর নিয়ে এখনো কেন অনিশ্চয়তা?
বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবরে বলা হয়, এই সফরে তারেক রহমান না যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি।
২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত একটানা বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। এই সময়ে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের সমর্থন দেখা গিয়েছিল আওয়ামী লীগের প্রতি। যে কারণে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারত-বিরোধী অবস্থান আরো প্রকাশ্যে আসে। সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হয়। মিছিল সমাবেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী নানা স্লোগান দিতেও দেখা যায়।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষে ভারত সফরের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে দুই দেশের সম্পর্কের উন্নয়নে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সাবেক কূটনীতিকরা।