জাতীয় দলের বিকল্প নয়, আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার গড়াই এইচপির লক্ষ্য: সালাহউদ্দীন
বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ গড়তে নতুন করে সাজানো হচ্ছে বিসিবির হাই পারফরম্যান্স ইউনিট (এইচপি)। সারা বছর ধরে চলবে ক্রিকেটারদের ক্যাম্প ও মনিটরিং। জাতীয় দলের সাবেক সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দীনের নেতৃত্বে এইচপি এখন শুধু জাতীয় দলে খেলোয়াড় পাঠানোর কারখানা নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার তৈরির কারিগর হিসেবে কাজ করবে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেমন আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল, তেমনি ক্রিকেটের মাঠেও সেই চেতনায় নিজেদের সেরা প্রমাণ করার সময় এসেছে বলে মনে করেন তিনি।
এইচপির নতুন পরিকল্পনা কী?
আগে এইচপি প্রোগ্রাম ছিল তিন-চার মাসের। এখন তা সারা বছর ধরে চলবে। খেলোয়াড়রা সব সময় মনিটরিংয়ের মধ্যে থাকবেন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় খেলতে গেলেও তাদের ওপর নজর থাকবে। সালাহউদ্দীন বলেছেন, 'এইচপির ছেলেরা তিন-চার মাস পর কোথায় গেল না গেল, আগে আমরা কোনো খোঁজখবর রাখতাম না। এখন সারা বছর তারা মনিটরিংয়ের মধ্যে থাকবে।'
জাতীয় দলের বিকল্প নয়, আন্তর্জাতিক মানই লক্ষ্য
সালাহউদ্দীন স্পষ্ট করে বলেছেন, এইচপির মূল লক্ষ্য কাউকে জাতীয় দলে পাঠানো নয়। তাঁর ভাষায়, 'আমি একটা ছেলেকে এনে জাতীয় দলে পাঠিয়ে দেব, এটা কোনো কোচের স্বপ্ন হতে পারে না। সে ওই জায়গায় গিয়ে কত দিন টিকে থাকতে পারবে, সর্বোচ্চ মানে গেল কি না, সেটাই আসল।' খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ মান অতিক্রম করাই এখন এইচপির মূল দর্শন। ক্রিকেট সংস্কৃতি, টেকনিক্যাল দিক ও ট্যাকটিকস সব দিক দিয়েই খেলোয়াড়দের গড়ে তোলা হবে।
স্কোয়াডে কারা থাকবেন?
স্কোয়াডে কতজন থাকবেন তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে যাঁরা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ দলকে সেবা দিতে পারবেন, তাঁদেরই সুযোগ দেওয়া হবে। জাতীয় লিগের পর এইচপির স্কোয়াড ঘোষণা করা হবে। সালাহউদ্দীন বলেছেন, 'যাদের মনে হবে যে তারা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ দলকে সার্ভিস দিতে পারবে, বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আরও এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখতে পারবে, তাদেরই স্কোয়াডে নেওয়া হবে।'
পেস বোলিং ইউনিটে বিশেষ নজর
পেস বোলারদের জন্য আলাদা বিভাগ থাকবে, যেখানে তারা সারা বছর অনুশীলন করতে পারবে। তরুণ পেসারদের ফিটনেস উন্নত করাই এর মূল লক্ষ্য। সালাহউদ্দীন বলেছেন, 'এখানে যদি ২০ জন ভালো পেস বোলার থাকে, এইচপিতে যখন ব্যাটসম্যানরা অনুশীলন করবে, তারা ভালো বোলারের বিপক্ষে ব্যাটিং করতে পারবে।' পেস বোলিং ইউনিটে আলাদা কোচিং স্টাফ থাকবে।
রিহ্যাব প্রোগ্রামও এইচপির আওতায়
চোট থেকে ফিরে আসা খেলোয়াড়দের জন্য বিসিবির রিহ্যাব প্রোগ্রামও এখন এইচপির অধীনে আসছে। জাতীয় দলের সাবেক ট্রেনার মারিও ভিল্লাভারায়েন যোগ দিয়েছেন রিহ্যাব প্রধান হিসেবে। সালাহউদ্দীন বলেছেন, 'অনেক সময় দেখা যায়, চোটে পড়ার পর একজন খেলোয়াড়ের ফিরে আসতে তিন-চার বছরও সময় লেগে যায়। এই সময়ে তাদের যথাযথ পরিচর্যা দরকার।' পেসারদের চোটের কারণ হিসেবে বোলিং অ্যাকশনকে দায়ী করে তিনি বলেছেন, 'অ্যাকশনে সমস্যা থাকলে ওই ছেলে আবারও একই চোটে পড়বে।'
বড় কোচিং প্যানেল, স্থানীয় কোচদের উন্নয়ন
এইচপির কোচিং প্যানেল এখন অনেক বড় হবে। প্রতিটি বিভাগে অন্তত তিনজন করে কোচ থাকবেন। সোহেল ইসলাম, মিজানুর রহমান, মাহমুদউল্লাহ, আবদুর রাজ্জাক, তালহা জুবায়ের ও কোরি কলিমোরের মতো কোচরা থাকবেন। সালাহউদ্দীন বলেছেন, 'তরুণ কোচদের মানও আমরা এখানে উন্নত করার চেষ্টা করব, যেন ভবিষ্যতে তারা বাংলাদেশের ক্রিকেটের কোচিংয়ে নেতৃত্ব দিতে পারে।' বিদেশি বিশেষজ্ঞদের খণ্ডকালীন আনার পরিকল্পনা থাকলেও স্থানীয় কোচদের উন্নয়নকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক মানের সুবিধা
মিরপুরের একাডেমি মাঠ পুরোই এইচপির অধীনে আসবে। সেখানে আরও ২০টি উইকেট তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের জিম ও সুইমিংপুলের সুবিধা পাবেন খেলোয়াড়রা। ভবিষ্যতে পুরো এইচপি পূর্বাচলে স্থানান্তরিত হবে।
কোচ হিসেবে উন্নয়নের চ্যালেঞ্জই বড়
জাতীয় দলের সহকারী কোচ থেকে এইচপির দায়িত্ব নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে সালাহউদ্দীন বলেছেন, 'ক্রিকেটে কাজের জন্য ডেভেলপমেন্টের জায়গাটাই বেশি উপভোগ্য মনে হয় আমার কাছে। আপনি যখন কিছুতে উন্নতি আনতে যাবেন, তখনই চ্যালেঞ্জটা বেশি থাকে।' কোচ ডেভেলপমেন্টও তাঁর পছন্দের জায়গা। তিনি বলেছেন, 'আমি জানি আমাদের কোচদের ঘাটতি কোথায়। আমার মনে হয়েছে, এসব জায়গায় আমি ওদের সাহায্য করতে পারব।'
বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তৃণমূল থেকে উন্নয়ন প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধের পর যেমন বাঙালি নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে, তেমনি ক্রিকেটেও নিজেদের সামর্থ্যের ওপর আস্থা রেখে এগিয়ে যেতে হবে। এইচপির এই নতুন উদ্যোগ সেই পথেই এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা।