শারজায় ২১ অক্টোবর আফগানিস্তানের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের মুখ্য ম্যাচে বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু জয়ের পথ নয়, একটি কঠিন অঙ্কও রয়েছে। ফাইনালে উঠতে হলে ম্যাচ জেতার পাশাপাশি ব্যবধানের হিসাবও মেলাতে হবে লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের।
প্রথমে ব্যাটিং করলে বাংলাদেশ যত রানই করুক, জেততে হবে কমপক্ষে ৪১ রানের ব্যবধানে। পরে ব্যাট করলে হিসাব আরও জটিল হয়ে যায়। যেমন, আফগানিস্তান যদি ৩০০ রান করে, তাহলে বাংলাদেশকে নামতে হবে ৪২.২ ওভারের মধ্যে সেই লক্ষ্য ছুঁতে। প্রথম আলোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই অলিখিত সেমিফাইনাল মেলাতে হবে অন্য হিসাবও।
জিতার আগে যে বাধা
অঙ্ক মেলানোর আগে ম্যাচ জেতার কাজটাই বাংলাদেশের জন্য কঠিন। যে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশ ৯৯ রানে হেরেছে, আফগানিস্তান তাদের তেমন পাত্তাই দেয়নি। পরশু এই দুই দলের ম্যাচে ব্যাটিং-বোলিং কোথাওই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়নি। আফগানরা ১৭ রানে ৪ উইকেট নেওয়া রশিদ খানের দাপটে জিম্বাবুয়েকে গুটিয়ে দিয়েছে সহজেই।
ওয়ানডেতে আফগানদের বিপক্ষে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসও সুখকর নয়। সর্বশেষ দুটি সিরিজেই হার মেনেছে বাংলাদেশ, গত বছরের শেষ সিরিজে হতে হয়েছে ধবলধোলাই। সব প্রতিপক্ষ মিলিয়ে সর্বশেষ পাঁচ ওয়ানডের চারটিতেই জিতেছে আফগানিস্তান, আর বাংলাদেশ হেরেছে চারটিতেই।
ব্যাটিং সংকট: মিডল অর্ডারেই মূল সমস্যা
মাঠের বাস্তবতাও কঠিন। ওয়ানডে ব্যাটিং অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশের দুশ্চিন্তার জায়গা, বিশেষ করে রান তাড়া করতে নামলে। গত তিন বছরে ১৫ বার দুই শর বেশি রানের লক্ষ্য তাড়া করে সফল হয়েছে মাত্র চারবার। বর্তমান ক্রিকেটে যেখানে তিন শ রান নিয়মিত তাড়া হয়, সেখানে বাংলাদেশ দুই শ রানের লক্ষ্যেই হিমশিম খাচ্ছে।
সংকটের মূলে মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতা। টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে গত তিন বছরে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের চেয়ে মিডল অর্ডারে কম গড়ে রান করেছে শুধু জিম্বাবুয়ে আর আয়ারল্যান্ড। এই দুঃসময়ে মাঝের ওভারগুলোতে আরও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারেন রশিদ খান। বাংলাদেশের বিপক্ষে মাত্র ১৯ গড়ে তিনি নিয়েছেন ৩৫ উইকেট, আর এখন তিনি দুর্দান্ত ফর্মেও আছেন।
তানজিদের মুখে মানসিকতার প্রসঙ্গ
ওপেনার তানজিদ হাসান অবশ্য এই সংকটকে মানসিক বলেই মনে করেন। গতকাল দলের পক্ষে একটি ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, 'আমি বলব এটা মানসিক ব্যাপার। ৩০০-৩৫০ রানের কথা চিন্তা না করে যদি আমরা এটা ছোট ছোট লক্ষ্য বানিয়ে খেলি, তাহলে আমার মনে হয় সহজ হবে।'
তানজিদ সামর্থ্যে কোনো ঘাটতি দেখছেন না। তাঁর ভাষায়, 'যদি স্কিলের সমস্যা থাকত তাহলে কিন্তু আমরা ঘরের মাঠেও ভুগতাম। আমরা ঘরের মাঠে যে রকমভাবে খেলি, যদি একই মানসিকতা ও প্রস্তুতি নিয়ে দেশের বাইরেও খেলতে পারি, দল হিসেবে খুব ভালো করব।'
বিদেশের মাঠে বাংলাদেশের কেমন অবস্থা?
সত্যিই, ঘরের মাঠে এ বছর টানা চার সিরিজে জিতেছে বাংলাদেশ, কিন্তু দেশের বাইরের চিত্র ভিন্ন। ২০২৩ বিশ্বকাপের পর বিদেশের মাঠে খেলা ১৭টি ওয়ানডের ১৩টিতেই হার মেনেছে দলটি। জুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জিম্বাবুয়েকে টপকাতে হলে বাংলাদেশের কমপক্ষে ৪১ রানের জয় লাগবে, অর্থাৎ শুধু জয়ে কাজ চলবে না।
এক বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকা-জিম্বাবুয়ে-নামিবিয়ার মতো বিরুদ্ধ কন্ডিশনেই বিশ্বকাপ খেলতে হবে বাংলাদেশকে। সেই বড় পরীক্ষার আগে দৈনিক ইত্তেফাকের বিশ্লেষণে যেমন বলা হয়েছে, এই ম্যাচে শুধু জিতলেই চলবে না, ফাইনালে ওঠার সমীকরণও মেলাতে হবে। আর ক্রিকেট গুরুকুলের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের জয়ের ব্যবধান ২১৭ রান বা তার বেশি হলে সমীকরণ আবার ভিন্ন হয়ে যাবে।
১৯৭১-এর চেতনায় খেলার ডাক
একটি জাতি হিসেবে আমরা কখনোই অসম্ভবকে ভয় পাইনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাঠে আমাদের পূর্বসূরিরা দেখিয়েছিলেন, ইচ্ছাশক্তি থাকলে দুর্গও জয় করা যায়। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতার লড়াই, প্রতিটি ধাপে বিজয় এসেছে সংহতি আর আত্মবিশ্বাস থেকে। ক্রিকেটের মাঠেও সেই আত্মবিশ্বাসের বিকল্প নেই।
তুলনামূলক কাছাকাছি বা খর্বশক্তির জিম্বাবুয়ে-আফগানিস্তানকে নিয়ে সিরিজের ফাইনালে যদি খেলতে না পারে বাংলাদেশ, তবে বিশ্বকাপের আগে ওয়ানডেতে দলের সামর্থ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। তাই আজ শারজার মাঠে শুধু একটি ম্যাচ নয়, জাতীয় সাহস ও মনোবলের পরীক্ষাও দেখার অপেক্ষায় কোটি বাঙালি।
পাঠকের সাধারণ প্রশ্ন
বাংলাদেশ কীভাবে ফাইনালে উঠতে পারে?
আফগানিস্তানের বিপক্ষে জিততে হবে এবং প্রথমে ব্যাটিং করলে কমপক্ষে ৪১ রানের ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করতে হবে।
পরে ব্যাট করলে কী সমীকরণ?
আফগানিস্তান ৩০০ রান করলে বাংলাদেশকে ৪২.২ ওভারের মধ্যে লক্ষ্য ছুঁতে হবে; প্রতিপক্ষের রান বদলালে ওভারের হিসাবও বদলাবে।
রশিদ খান কেন এত বড় হুমকি?
বাংলাদেশের বিপক্ষে তিনি ১৯ গড়ে ৩৫ উইকেট নিয়েছেন এবং সর্বশেষ ম্যাচে ১৭ রানে ৪ উইকেট নিয়ে দুর্দান্ত ফর্মের সংকেত দিয়েছেন।
