বালোচিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামে ইসরায়েলের নতুন কৌশল: এক ঢিলে দুই পাখি মারার চাল
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলা বালোচিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলন এখন নতুন মোড় নিচ্ছে। ইসলামাবাদের দমননীতির বিরুদ্ধে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যখন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, তখন পর্দার আড়াল থেকে ইসরায়েল এই বিদ্রোহীদের সমর্থন দিচ্ছে বলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। এই ঘটনা শুধু পাকিস্তানের জন্যই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজও আমাদের প্রেরণা জোগায়। বালোচদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আমাদের সেই সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু এই সংগ্রামে ইসরায়েলের মতো একটি শক্তির হস্তক্ষেপ কি সত্যিই বালোচদের জন্য কল্যাণকর হবে? নাকি এটি আরেকটি সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত?
ইসরায়েল কেন বালোচিস্তানে আগ্রহী?
ইসরায়েলের জন্য বালোচিস্তান তিনটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এর কৌশলগত অবস্থান। বালোচিস্তানের সাথে ইরানের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। আরব সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে এই অঞ্চলটি ইসরায়েলকে ইরান ও পাকিস্তানের ওপর নজরদারি চালানোর সুযোগ করে দেবে।
দ্বিতীয়ত, বালোচিস্তান খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। প্রাকৃতিক গ্যাস, ইউরেনিয়াম, তামা, কয়লা এবং বিরল ধাতুর বিশাল ভান্ডার রয়েছে এই অঞ্চলে। স্বাধীনতা পেলে ইসরায়েল এই সম্পদে বিনিয়োগ করে অর্থনৈতিক লাভবান হতে পারে।
তৃতীয়ত, গ্বদর বন্দর। এই সমুদ্র বন্দরটি বর্তমানে চীন নির্মাণ করছে। ইসরায়েল চায় চীনকে সরিয়ে নিজেরা এই বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিতে। এতে করে ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানো সহজ হবে।
মেমরি থিঙ্ক ট্যাঙ্কের ভূমিকা
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক 'মিডল ইস্ট মিডিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট' বা মেমরি বালোচিস্তান নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা প্রকাশ করছে। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য কর্নেল ইগাল কারমন, যিনি মোসাদে ২০ বছর কাজ করেছেন। ২০১২ সাল থেকে ইসরায়েলে গোয়েন্দা তথ্য পাচারের অভিযোগ রয়েছে মেমরির বিরুদ্ধে।
মেমরি বালোচ জাতীয়তাবাদী নেতা মির ইয়ার বালোচকে 'বিশেষ উপদেষ্টা' হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। মির ইয়ার বালোচ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চালান এবং সম্প্রতি জাতিসংঘে বালোচিস্তানে শান্তি বাহিনী পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা
বালোচিস্তানের এই সংগ্রাম আমাদের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যেন কোনো বিদেশী শক্তি আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে না পারে। ইসরায়েলের মতো দেশগুলোর কৌশল সবসময় তাদের নিজস্ব স্বার্থে কাজ করে।
বাংলাদেশের উচিত এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নেওয়া। আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার চেতনা রক্ষায় আমাদের সজাগ থাকতে হবে। কোনো বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপ আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে গ্রহণযোগ্য নয়।
ভবিষ্যৎ পরিণতি
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বালোচিস্তান নিয়ে ইসরায়েলের চাপ বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র একে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারে। কিন্তু পাকিস্তান সহজে এই বিশাল অঞ্চল ছেড়ে দেবে না। বালোচিস্তান পাকিস্তানের ৪৪ শতাংশের বেশি জমি নিয়ে গঠিত। ফলে সামরিক অভিযানের তীব্রতা বাড়াতে পারে রাওয়ালপিন্ডি।
এক কথায়, বালোচিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রাম এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি জটিল খেলায় পরিণত হয়েছে। ইসরায়েল, আমেরিকা, চীন ও ভারত সবাই নিজেদের স্বার্থে এই অঞ্চলকে ব্যবহার করতে চায়। বালোচদের প্রকৃত স্বাধীনতা ও কল্যাণ কোথায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ইসরায়েল কি বালোচিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামে সরাসরি জড়িত?
সরাসরি প্রমাণ না থাকলেও, মেমরি থিঙ্ক ট্যাঙ্কের মাধ্যমে ইসরায়েল বালোচ বিদ্রোহীদের সমর্থন দিচ্ছে বলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। মোসাদের প্রাক্তন কর্মকর্তারা এই থিঙ্ক ট্যাঙ্কের সাথে জড়িত।
বালোচিস্তানের স্বাধীনতা কি বাংলাদেশের জন্য হুমকি?
বালোচিস্তানের স্বাধীনতা সরাসরি বাংলাদেশের জন্য হুমকি নয়, তবে এই অঞ্চলে বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের উচিত সতর্ক থাকা।
বালোচিস্তানের সম্পদে ইসরায়েলের কী আগ্রহ?
বালোচিস্তানে প্রাকৃতিক গ্যাস, ইউরেনিয়াম, তামা ও বিরল ধাতুর বিশাল মজুত রয়েছে। ইসরায়েল এই সম্পদে বিনিয়োগ করে অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি কৌশলগত সুবিধা নিতে চায়।