ঝাড়খণ্ডের যুব আন্দোলন: ১৯৭১-এর চেতনায় ন্যায়বিচারের লড়াই
ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাত্র-যুব সমাজের আন্দোলন ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে। এই আন্দোলন শুধু একটি রাজ্যের চাকরিপ্রার্থীদের দাবি নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর সংগ্রামের প্রতীক, যা আমাদের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সে সময় আমরা যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলাম, তেমনি আজও ভারতের পূর্বাঞ্চলের এই যুবকরা তাদের অধিকার ও ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করছে।
আন্দোলনের সূত্রপাত ও মূল কারণ
জুলাই মাসের শেষ দিক থেকে ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন (জেপিএসসি) এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশন (জেএসএসসি)-এর সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে আন্দোলনে সামিল হন ছাত্র যুব সম্প্রদায়। রাঁচির জয়পাল সিং মুণ্ডা স্টেডিয়ামে শত শত ছাত্র-ছাত্রী জড়ো হতে থাকেন। তাদের অভিযোগ, এই কমিশনগুলো দ্বারা পরিচালিত পরীক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চলছে, যার ফলে লক্ষ লক্ষ যুবকের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পুলিশি দমন ও প্রতিবাদ
সোমবার আন্দোলনকারী ছাত্রদের উপর লাঠিচার্জের বিরোধিতা করে মঙ্গলবার সেখানে বনধের ডাক দিয়েছিল বিজেপি। মঙ্গলবার ঝাড়খণ্ড বিধানসভার দিকে দলের কর্মীরা মিছিল শুরু করার পর ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। আরএসএসের ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) সদস্যরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এবিভিপির কমপক্ষে ১১০ জন কর্মীকে আটক করে পুলিশ।
পুলিশের পাল্টা দাবি, তাদের লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া হয়েছে। রাঁচি সিটি এসপি পারস রাণা জানিয়েছেন মিছিল চলাকালীন পাথর ছোড়ায় তিন থেকে চারজন জওয়ান আহত হয়েছেন। ব্যারিকেড ভাঙার সময় জওয়ানরা পদদলিত হতে পারেন, এই আশঙ্কায় পুলিশ 'মৃদু লাঠিচার্জ' করে।
সরকারের অবস্থান ও সমালোচনা
ঝাড়খণ্ডের মন্ত্রী ইরফান আনসারি বিজেপির ডাকা বনধের সমালোচনা করে বলেছেন, শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে 'হাইজ্যাক' করার চেষ্টা করছে। মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন জানিয়েছেন, পুলিশ-প্রশাসন সোমবার মিছিলের সময়ে 'সংযম' দেখিয়েছে। তিনি এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন, 'আজকের (সোমবার) ছাত্র বিক্ষোভ চলাকালীন সংযম, সংবেদনশীলতা এবং পূর্ণ দায়িত্বের সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য আমি প্রশাসন ও পুলিশের সকল কর্মকর্তা ও কর্মীদের ধন্যবাদ জানাই।'
তবে সরকারের বক্তব্য মানতে নারাজ আন্দোলনকারীরা। তাদের সমস্ত দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা।
আন্দোলনকারীদের কণ্ঠস্বর
অনুষ্কা নামে এক আন্দোলনকারী বিবিসি বাংলার সাংবাদিক ময়ূরী সোমকে বলেছেন, 'ঝাড়খণ্ডে চাকরির সুযোগ কম। তাই বহু চাকরিপ্রার্থী রাজ্য সরকারে চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন দেখেন, নিজেদের এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার আশায়। অনেকের কাছে কৃষিকাজ বা দিনমজুরির কাজ থেকে বেরিয়ে আসার এটাই একটাই একমাত্র পথ। কিন্তু প্রায় প্রতিবারই ঝাড়খণ্ডের সরকারি চাকরির পরীক্ষায় কোনও না কোনও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অযোগ্য প্রার্থীরা দুর্নীতির মাধ্যমে চাকরি পাচ্ছেন। যোগ্য প্রার্থীরা বার বার বঞ্চিত হন।'
উম্মে হাবিবা নামে এক অনশনকারী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, 'বিয়ের জন্য চাপ উপেক্ষা করেই এই চাকরির পরীক্ষাগুলো দিচ্ছিলাম। ভেবেছিলাম চাকরি পেয়ে গেলে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারব। ঝাড়খণ্ড তৈরির পর থেকে আজ পর্যন্ত একটাও সরকারি চাকরির পরীক্ষা সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে হয়নি। কখনও প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়, বা পরীক্ষার খাতায় অসঙ্গতি পাওয়া যায়। চাকরি বিক্রিও হয়। আমাদের লড়াই কোনও রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়। আমরা চাই শিক্ষাব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন।'
রাজনীতির ছোঁয়া এড়াতে সচেতন আন্দোলনকারীরা
বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা ময়ূরী সোম রাঁচি থেকে জানিয়েছেন, 'এই মঞ্চে যাতে রাজনীতির রং না ঢোকে সে বিষয়ে বেশ সচেতন আন্দোলনকারীরা। তারা এই আন্দোলনকে সংবিধান মেনে এবং শান্তি বজায় রেখে চালানোর উপর যেমন জোর দিয়েছেন তেমনই অনুরোধ করেছেন কেউ যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই মঞ্চ ব্যবহার না করেন।'
ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র নাথ মাহাতোর অনশন ও অসুস্থতা
সোমবার রাতে ওই ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা দেবেন্দ্র নাথ মাহাতোর স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। তিনি গত নয়দিন ধরে অনশন করছিলেন। বিধানসভা অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। তারপর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দাবিতে আদিবাসী সমাজের দীর্ঘ আন্দোলনের পুরোধা শিবু সোরেনের ছবি সঙ্গে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে চেপে বিক্ষোভস্থলে পৌঁছান মি. মাহাতো। পরে স্ট্রেচারের উপর দাঁড়িয়ে জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, 'লাঠি, গুলি এবং বন্দুক দিয়ে সরকার চালানো যায় না। জনগণকে সন্তুষ্ট রেখেই সরকার চলে।'
সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও দাবি আদায়
এরই মাঝে সরকারের সঙ্গে দু'দফা বৈঠক হয় আন্দোলনকারীদের। রোববারের বৈঠকে সরকার ১৪তম জেপিএসসি এবং কম্বাইন্ড সিভিল সার্ভিসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষাসহ তিনটে পরীক্ষা বাতিল করতে রাজি হয়। চতুর্দশ জেপিএসসি পরীক্ষা সংক্রান্ত কথিত আর্থিক অনিয়মের তদন্তভার এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-কে দেওয়ার দাবিও মেনে নেওয়া হয়। ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে রোববার ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (জেপিএসসি) তিন সদস্য পদত্যাগ করেন। কারিগরি ও উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী সুদিব্য কুমার সোনু জানান সরকার ৯৮% দাবি মেনে নিয়েছে।
অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের বক্তব্য জেএসএসসি-সিজিএল পরীক্ষার ফলাফল বাতিল না হওয়া এবং জেপিএসসি-সংশ্লিষ্ট সমস্ত পরীক্ষায় সিবিআই তদন্তের নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তারা বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন।
প্রশ্ন ও উত্তর
ঝাড়খণ্ডের এই আন্দোলনের মূল কারণ কী?
ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন (জেপিএসসি) এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশন (জেএসএসসি)-এর সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মের অভিযোগ তুলে এই আন্দোলন শুরু হয়। যোগ্য প্রার্থীরা দুর্নীতির কারণে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ।
পুলিশি দমনের ঘটনায় কারা জড়িত?
সোমবার বিধানসভা অভিযানের সময় পুলিশ লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও জল কামান ব্যবহার করে। বিজেপি সমর্থিত এবিভিপি কর্মীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন এবং ১১০ জনকে আটক করা হয়।
সরকার আন্দোলনকারীদের কী কী দাবি মেনে নিয়েছে?
সরকার ১৪তম জেপিএসসি এবং কম্বাইন্ড সিভিল সার্ভিসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষাসহ তিনটে পরীক্ষা বাতিল করতে রাজি হয়েছে। এছাড়া জেপিএসসির তিন সদস্য পদত্যাগ করেছেন এবং তদন্তভার ইডিকে দেওয়া হয়েছে।
উপসংহার
ঝাড়খণ্ডের এই যুব আন্দোলন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতার জন্য লড়াই কখনো থামে না। ১৯৭১ সালে আমরা যেমন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য লড়াই করেছিলাম, আজও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের যুবকরা তাদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার জন্য লড়াই করছে। এই আন্দোলন আমাদের দেশপ্রেমিক চেতনারই একটি প্রতিচ্ছবি।