জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। গতকাল বৃহস্পতিবার দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পাঠানো পদত্যাগপত্রে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট, নারীদের প্রতি দলের দৃষ্টিভঙ্গি এবং কমিটি পুনর্গঠনের পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন।
এলাকার তরুণ সমাজ ও রাজনীতিসচেতন মানুষের মধ্যে এই খবর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের গড়া দল থেকে এবার বেরিয়ে যাওয়া নারী নেত্রীর সংখ্যা অনেকটাই বেড়েছে। Deshrupantor-এর খবর অনুযায়ী, সামান্তা শারমিন দলটি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন এবং এই ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
এক বছর ধরেই চলছিল বিরোধ
হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্ত নেননি সামান্তা। Prothomalo-র এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এনসিপি নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর মতাদর্শিক বিরোধ শুরু হয়েছিল প্রায় এক বছর আগে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের সময় তিনি এর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
ওই জোটের বিরোধিতা করে এর আগেই এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে ২০ জনের বেশি নেতা পদত্যাগ করেছেন। সর্বশেষ সেই তালিকায় নাম লেখালেন সামান্তা শারমিন। জোট গঠিত হওয়ার পর থেকেই তিনি দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন, এমনকি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্যপদ থেকেও নিজেকে সরিয়ে নেন। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বারবার আহ্বান জানানো হলেও তাঁর জবাব ছিল, এনসিপি জামায়াত জোট না ছাড়লে তিনি পর্ষদে ফিরবেন না।
গত ২৩ অক্টোবর এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠিত হলে সামান্তাকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক থেকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। অনেকের কাছে এটি ছিল কার্যত পদাবনতি।
পদত্যাগপত্রে চারটি কারণ
নাহিদ ইসলামকে পাঠানো পদত্যাগপত্রে সামান্তা শারমিন চারটি বিষয় উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, নিজস্ব রাজনৈতিক লাইন স্পষ্ট না থাকায় এনসিপিকে জামায়াতের মধ্যে হারিয়ে যেতে হচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী তরুণদের এই দলটিকে এখন জামায়াতের জন্য নানা ইস্যুতে সহায়ক ভূমিকা নিতে হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, বড় রাজনৈতিক দলের লেজুড় হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত এনসিপির নিজস্ব রাজনীতি ও অভ্যুত্থানোত্তর নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করেছে। তৃতীয়ত, এনসিপির ভূমিকা নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে; নারীদের রাজনৈতিকভাবে পেছনে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় জামায়াত ও অতি ডানপন্থী শক্তিগুলোর অনুসারী ও সহযোগী হয়েছে দলটি। চতুর্থ কারণ হিসেবে কাউন্সিল এড়িয়ে কমিটি পুনর্গঠনের অসন্তোষের কথা তুলে ধরেছেন তিনি।
সামান্তা বলেছেন, এসব বিষয়ে বারবার পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানোর পরেও এনসিপি তার গতিপথ পরিবর্তন করতে আগ্রহী হয়নি। এ জন্যই তিনি দল থেকে পদত্যাগ করছেন বলে জানিয়েছেন।
এনসিপি নেতাদের প্রতিক্রিয়া
সামান্তার পদত্যাগে বিস্মিত নন এনসিপির নেতারা। দলের রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার Prothomalo-কে বলেন, সামান্তা অনেক দিন ধরেই দলে নিষ্ক্রিয় ছিলেন; পদত্যাগের মধ্য দিয়ে তিনি সেই নিষ্ক্রিয়তাকেই একটি আনুষ্ঠানিক রূপ দিলেন। তিনি বলেন, এতে দলের কোনো নতুন লাভ বা ক্ষতি হয়নি।
এনসিপিতে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ আছেন। তিনি জামায়াতবিরোধী ব্লকের নেতৃত্ব দিতে পারতেন।
সারোয়ার তুষারের এই মন্তব্য দিয়েই এনসিপি নেতৃত্বের অনেকে স্বীকার করছেন যে দলে ভিন্নমতের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে এসেছে। আমার সকাল ২৪-এর প্রতিবেদনেও জামায়াত জোট বিরোধিতাকেই সামান্তার পদত্যাগের মূল কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
নারীনেত্রীদের দলত্যাগের ধারাবাহিকতা
জুলাই অভ্যুত্থানের পর জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র হিসেবে সামান্তা শারমিনের পাশাপাশি উমামা ফাতেমা, নুসরাত তাবাসসুম, নাজিফা জান্নাত ও তাসনিম জারার মতো নারী নেত্রীরা জাতীয় আগ্রহের কেন্দ্রে ছিলেন। কিন্তু জামায়াত জোটের প্রশ্নে তাঁদের প্রায় সবাই দলের সঙ্গে পথ আলাদা করেছেন।
গত বছরের ডিসেম্বরে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করেন তাসনিম জারা। তাজনূভা জাবীন ও সৈয়দা নীলিমা দোলাও জামায়াত বিরোধিতা থেকেই দল ছেড়েছেন। এই ধারাবাহিকতায় সামান্তার পদত্যাগ একটি প্রশ্ন তুলে ধরেছে: অভ্যুত্থানের স্বপ্ন নিয়ে জন্ম নেওয়া দলটি কি মূলত জামায়াতের ছায়ায় সরে যাচ্ছে?
তাসনিম জারা গতকাল রাতে ফেসবুকে সামান্তাকে প্রশংসা করে লেখেছেন, সামান্তা শারমিন সেই অল্প মানুষদের একজন, যাঁরা মানুষের জীবনকে বুঝতে ও পাশে দাঁড়াতে মানুষের কাছে যান। তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা এখনো অনেক বাকি, এমন মানুষের জায়গা রাজনীতিতে আরও বড় হওয়া দরকার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিতর্ক
সামান্তার দলত্যাগে এনসিপির ভেতরেই শুরু হয়েছে মুখে মুখে সমালোচনা। দলের দপ্তর সম্পাদক সাদিয়া ফারজানা ফেসবুকে লেখেন, কেবল মিডিয়া ফেস বা লাখ লাখ ফলোয়ারধারী নারীরাই গোটা নারীসমাজের এজেন্সির দাবিদার নন; দলের সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সুযোগমতো দলের বুকে ছুরিকাঘাত করা সৎ নেতৃত্বের কাজ হতে পারে না।
এনসিপির স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মনজিলা ঝুমাও ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট দিয়ে লেখেন, জুলাইয়ে ঘরে বা বিদেশে বসে থেকেও অনেকে এনসিপির বদৌলতে জুলাই কন্যা হয়ে গেছেন, আর পেছন থেকে ছুরিকাঘাত তাঁরাই সবার আগে করেছেন।
অন্যদিকে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ছয় সদস্যের লিয়াজোঁ কমিটি থেকে চার শতাধিক কমিটির জাতীয় নাগরিক কমিটিতে উত্তরণে যাঁদের ভূমিকা ছিল, তাঁদের নিয়ে নোংরামি ও অপপ্রচার একটি বাজে নজির বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি লেখেন, যাঁরা ভিত গড়ে দিয়ে জোটের কারণে চলে গেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকুন।
বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম লেখেছেন, সামান্তা শারমিনের প্রতিটি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত; এনসিপি জামায়াতের বি টিম হিসেবে কাজ করছে।
জাতীয় রাজনীতির জন্য এর অর্থ কী
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশের অগ্রগতি ঘটেছে ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী শক্তির হাতে। জামায়াতে ইসলামী ছিল সেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক ধারক। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে অভ্যুত্থানোত্তর নতুন প্রজন্মের একটি অংশ যখন জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হচ্ছে, তখন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ভাষার মর্যাদা রক্ষাকারী শক্তিগুলোর জন্য এটি একটি গভীর শঙ্কার বার্তা।
সামান্তা শারমিনের পদত্যাগ কেবল একটি দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। এটি তরুণ প্রজন্মের রাজনীতির একটি স্পষ্ট প্রশ্ন: স্বাধীনতার চেতনায় জন্ম নেওয়া আন্দোলন কি ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কাছে আত্মসমর্পণ করবে, নাকি নিজস্ব পথে অগ্রসর হবে? আগামী দিনগুলোতে আরও কত নেতা-কর্মী দলটি ছাড়বেন, সেটিই দেখার বিষয়।
