প্রায় ১০ মাসের দীর্ঘ বিরতির পর গত বৃহস্পতিবার কক্সবাজার থেকে ৮০০ পর্যটক নিয়ে প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে পৌঁছেছে এমভি বার আউলিয়া। এর মধ্যে প্রায় ৫০০ পর্যটক দ্বীপে রাত কাটাচ্ছেন, বাকি ৩০০ জন বেলা সাড়ে তিনটায় একই জাহাজে ফিরে গেছেন।
আমাদের দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন; একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত এই ভূখণ্ডের দক্ষিণ প্রান্তে দাঁড়িয়ে দেখা যায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। দ্বীপটি আমাদের সামুদ্রিক সার্বভৌমত্বের সীমান্তরেখায় দাঁড়িয়ে আছে যুগ যুগ ধরে। সেই দ্বীপেই দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার পর ফিরেছে পর্যটকের ঢল, ফিরেছে স্বস্তি।
প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটিঘাট থেকে যাত্রা শুরু করে জাহাজটি। প্রায় ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রপথ পেরিয়ে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় পর বেলা সোয়া একটায় এটি সেন্ট মার্টিন জেটিঘাটে পৌঁছায়।
জেটিঘাটে ফুল দিয়ে বরণ
জাহাজ থেকে পর্যটকরা নামার পর স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা তাঁদের ফুল দিয়ে বরণ করেন, মিষ্টিমুখও করানো হয়। দীর্ঘ বিরতির পর পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় দ্বীপের ব্যবসায়ী, হোটেলমালিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ফিরেছে আয়ের পথ।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী প্রথমবারের মতো দ্বীপে এসে বলেন, জাহাজ থেকে নীল জলের সেন্ট মার্টিন দেখতে একরকম, আবার সৈকতে দাঁড়িয়ে দেখা আরেক রকম। তাঁর ভাষায়, নীল জলের এমন দ্বীপ মন ভালো করে দেয়।
কক্সবাজার থেকে জাহাজটি যখন গভীর বঙ্গোপসাগরের দিকে যাচ্ছিল, তখন সবাই উচ্ছ্বসিত ছিল। সেন্ট মার্টিনে পা রাখতেই সব ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে গেছে
এ কথা বলেন ঢাকার রায়েরবাজারের ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম, যিনি স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে দ্বীপের পশ্চিম সৈকতের একটি রিসোর্টে উঠেছেন। তাঁর দলের সদস্য হাসমত জানান, স্বচ্ছ নীল জলের সাগর আর প্রবাল পাথর দেখেছেন, দেখা হয়েছে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বাংলোবাড়ি সমুদ্রবিলাস। বাঙালির সাহিত্য আর সাগর, দুটোই একসঙ্গে পাওয়া যায় এই দ্বীপে।
ছেঁড়াদিয়ায় যাওয়া নিষিদ্ধ কেন?
দ্বীপের দক্ষিণের দিরামাথা সৈকতের আরও দক্ষিণে রয়েছে বিচ্ছিন্ন দুই দ্বীপ মাঝেরদিয়া ও ছেঁড়াদিয়া। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হওয়ায় সেখানে পর্যটকদের যাতায়াত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিকেলে কয়েকজন পর্যটক ছেঁড়াদিয়া যাওয়ার চেষ্টা করলে পরিবেশ অধিদপ্তর ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা তাঁদের বাধা দেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সেন্ট মার্টিন কার্যালয়ের মেরিন পার্কের সুপারভাইজার আবদুল আজিজ বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ছেঁড়াদিয়ায় পর্যটকদের যাতায়াত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেউ যাওয়ার চেষ্টা করলে তাঁদের বুঝিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ উদ্দেশ্যে দিরামাথা ও মাঝেরদিয়ার মধ্যবর্তী প্রায় ৫০০ মিটার সৈকতে লাল নিশানা ও তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছে।
সরকারের ১২ দফা নির্দেশনা
দুই বছর আগে অতিরিক্ত পর্যটক ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে দ্বীপের পরিবেশ হুমকির মুখে পড়লে সরকার ১২ দফা নির্দেশনা জারি করে। সে অনুযায়ী রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, শব্দ সৃষ্টি বা বারবিকিউ পার্টি নিষিদ্ধ। কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল ক্রয়-বিক্রয়, সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া ও শামুক-ঝিনুকের ক্ষতি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সৈকতে মোটরসাইকেল বা সি-বাইকসহ যেকোনো মোটরচালিত যান চলাচল করা যাবে না। পলিথিন বহনও নিষিদ্ধ।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, পর্যটকরা কোথাও ময়লা-আবর্জনা ফেলছেন কি না এবং নিয়ম ভেঙে সংবেদনশীল এলাকায় যাচ্ছেন কি না, সেসব তদারকির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেন্ট মার্টিন কোস্টগার্ড স্টেশনের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মারুফ আহমেদ জানান, পর্যটকদের সচেতন করতে এবং নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়মিত টহল চলছে।
ভাড়া ও নিবন্ধন
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম জানান, সেন্ট মার্টিনগামী একমুখী জাহাজভাড়া সর্বনিম্ন ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে; সর্বোচ্চ ভাড়ায় কেবিনের সুবিধা রয়েছে। আগামী দিনে এমভি কর্ণফুলী ও এমভি টেকনাফসহ আরও কয়েকটি জাহাজ এই পথে চলাচলের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, সরকার অনুমোদিত জাহাজে অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে পর্যটকরা দ্বীপে যেতে পারবেন। গত বছর একটি পর্যটকবাহী জাহাজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল; সে ধরনের দুর্ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য জাহাজগুলোর ফিটনেস যাচাই চলছে।
প্রতিদিনের সংবাদ জানায়, নতুন নিয়মে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার অনুমতি পাবেন। দেশ টিভির প্রতিবেদনেও এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রথম দিনে দ্বীপে যান ৮৩৬ পর্যটক, জানিয়েছে প্রতিদিন সেবক।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকরা সেন্ট মার্টিনে ভ্রমণ ও রাত যাপন করতে পারবেন। বাঙালির এই প্রবাল দ্বীপ আমাদের সামুদ্রিক ঐতিহ্য; নিয়ম মেনে ভ্রমণ করলেই তা টিকে থাকবে আগামী প্রজন্মের জন্য।
প্রায়শ্চর্য্য প্রশ্ন
সেন্ট মার্টিনে পর্যটক মৌসুম কত দিন পর্যন্ত চলবে?
২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকরা দ্বীপে ভ্রমণ ও রাত যাপন করতে পারবেন।
প্রতিদিন কতজন পর্যটক সেন্ট মার্টিন যেতে পারবেন?
নতুন নিয়মে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার অনুমতি পাবেন।
জাহাজভাড়া কত?
একমুখী ভাড়া সর্বনিম্ন ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা; সর্বোচ্চ ভাড়ায় কেবিনের সুবিধা মেলে।
