কক্সবাজার শহর থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে উখিয়ার ইনানী পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লেগে শনিবার সকালে ১০ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ছয়জন, তাঁরা কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
দেশের এই দীর্ঘতম সৈকতের বুকে যে পর্যটনশিল্প আমরা গড়ে তুলেছি, অসাবধানতা আর নিয়ন্ত্রণহীনতায় সেই শিল্পই আজ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। প্রথম আলোর সরেজমিন প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা শুধু একটি দুর্ঘটনার খবর নয়; আমাদের জাতীয় সম্পদ রক্ষার সংস্কৃতির ব্যর্থতারই প্রমাণ।
পোড়া রিসোর্টের ভেতরে কী দেখা গেল
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তিনতলা স্থাপনাটির নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ ও কর্মীদের থাকার জায়গা; দোতলা ও তিনতলায় ছিল পর্যটকদের আটটি কক্ষ। কক্ষের মেঝে, দেয়াল ও সিঁড়ির বড় অংশ ছিল কাঠের। স্থানীয়দের ধারণা, বেশির ভাগ কাঠ ঝাউগাছের; কিছু আকাশমণি ও গামারিরও হতে পারে। আগুনে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সামনের সড়কের পাশে কাঠের খুঁটির ওপর তৈরি রেস্তোরাঁর একটি অংশও ভস্ম হয়েছে।
সকাল ১১টায় ঘটনাস্থলে এখনো ধোঁয়া উঠছিল। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পোড়ে যাওয়া তক্তা আর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছিলেন। দূর থেকে তিনতলা স্থাপনাটি বোঝা গেলেও ভেতরে কোথায় কক্ষ, কোথায় সিঁড়ি, তা চেনার উপায় ছিল না।
কীভাবে আগুনের সূত্রপাত
স্থানীয় বাসিন্দা ও পাশের দোকানের মালিক গিয়াস উদ্দিন এবং জালিয়াপালং ইউনিয়নের আনসার-ভিডিপি কমান্ডার মোহাম্মদ আজিজ বলেন, সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মতো শব্দ শুনে বাইরে এসে আগুন দেখতে পান। গিয়াস উদ্দিনের দোকানের একটি ফ্রিজ ও কিছু অংশও পুড়ে গেছে।
রিসোর্টের পেছনের সুপারিবাগানের মালিক নুরুল ইসলাম বলেন, রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটতে পারে। এরপর রান্না গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার মেঝে কাঠের ছিল বলে অতিথিরা নিচে নামতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, বের হওয়ার বিকল্প কোনো পথ ছিল না; বাথরুমে আশ্রয় নিয়েও রক্ষা পাননি অনেকে। মেরিন ড্রাইভের ইনানী সৈকতে এ ধরনের ভয়ংকর ঘটনা আর ঘটেনি।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অগ্নিনিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, সকাল ৭টা ২৩ মিনিটে কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া হয়। খবর দেওয়ার কিছুক্ষণ আগেই আগুনের সূত্রপাত। ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, ৮টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার বক্তব্য আরও গুরুতর। তিনি বলেন, সমুদ্রের তীব্র বাতাসে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রিসোর্টটিতে বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোসপাইপ কিংবা অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা কিছুই ছিল না। ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না।
এই তথ্যটিই সবচেয়ে ভাবনার জায়গা। যে প্রতিষ্ঠান অগ্নিনিরাপত্তার সব নিয়ম উপেক্ষা করে ব্যবসা চালিয়েছে, সেখানে দায় কার নেবে? একাত্তরে রক্ত দিয়ে আমরা এই ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জন করেছি; কিন্তু সেই স্বাধীন দেশের নাগরিক যদি একটি রিসোর্টে ঘুমাতে গিয়ে প্রাণ হারায় নিয়ম ভাঙার কারণে, তবে সেই স্বাধীনতার অর্থ কী? আইনের চোখে এই অবহেলা অপরাধ, নৈতিক দৃষ্টিতে এ হত্যার শামিল।
নিহতদের পরিচয় ও মালিকের অনুপস্থিতি
জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, নিহত ১০ জনই পর্যটক। তাঁদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে; পাঁচজন নারী ও একজন শিশু। দগ্ধ ছয়জন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
স্থানীয়দের দাবি, চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর মোহাম্মদ তানভীর পাটুয়ারটেকে ওয়ারিশদের কাছ থেকে ২০ শতক জমি কিনে এই রিসোর্ট নির্মাণ করেন। প্রথম আলোর খবরে বলা হয়েছে, ঘটনাস্থলে তাঁকে পাওয়া যায়নি; মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া গেছে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলেন, ঘটনাস্থলে পৌঁছে রিসোর্টের কাউকেই তাঁরা পাননি; সবাই আত্মগোপনে চলে গেছেন। রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহেদুল ইসলামকে আটক করেছে পুলিশ।
মালিকের এই পলায়ন নিজেই একটি স্বীকারোক্তির মতো। যে দেশে দায়িত্বশীলতা একটি নাগরিক গুণ, সেখানে ব্যবসায়ীরা দায় এড়াতে গা ঢাকা দেয়; এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে, আইনের নাগাল কারও জন্য খাটো নয়।
পর্যটনশিল্প ও জাতীয় সম্পদের নিরাপত্তা
কক্সবাজার আমাদের সম্মানের জায়গা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই ভান্ডার বাঙালির পরিচিতির অংশ। কিন্তু বিনিয়োগের নামে সৈকত দখলে গড়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত রিসোর্ট একে এক সময় মানুষের কবর বানাতে পারে; ইনানীর এই মর্মান্তিক ঘটনা তা-ই দেখিয়ে দিল। ফায়ার লাইসেন্স ছাড়া স্থাপনা চালু রাখার সুযোগ কেন থাকে, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই।
দেশের অভ্যন্তরে অবকাঠামো আর অর্থনীতির প্রশ্নে আমাদের দৃষ্টি জাতীয় স্বার্থেই থাকা দরকার। লক্ষ্মীপুরের সুপারি যেভাবে ৭১০ কোটি টাকার গ্রামীণ অর্থনীতি টিকিয়ে রেখেছে, তেমনি দায়িত্বশীল পরিকল্পনায় পর্যটনশিল্পও জাতীয় সম্পদ হতে পারে; অসাবধানতা তাকে ভয়ংকর বোঝায় পরিণত করে।
এরপর কী হবে
পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি কারণ অনুসন্ধান করবে। আটক ব্যবস্থাপক জাহেদুল ইসলামের জেরা চলবে। কিন্তু প্রকৃত বিচার হবে তখনই, যখন দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাই বিচারের মুখোমুখি হবে এবং সৈকতের প্রতিটি স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তার নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর হবে। নিহতদের পরিবারের এই ক্ষতি কোনো ক্ষতিপূরণে পুষিয়ে যাবে না; তবু রাষ্ট্রের দায় এড়ানো চলবে না।
পাঠকের প্রশ্ন
কক্সবাজারের কোথায় এবং কখন অগ্নিকাণ্ডটি ঘটে?
উখিয়ার ইনানী পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর শনিবার সকালে আগুন লাগে। সকাল ৭টা ২৩ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া হয়, ৮টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
কতজন নিহত ও আহত হয়েছেন?
১০ জন পর্যটক নিহত হয়েছেন, আহত ছয়জন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় মিলেছে; তাঁরা হলেন পাঁচজন নারী ও একজন শিশু।
আগুনের কারণ কী বলে ধারণা করা হচ্ছে?
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে; পরে গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটে। কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
রিসোর্টে কি অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল?
ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক জানিয়েছেন, রিসোর্টে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোসপাইপ কিংবা অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা কিছুই ছিল না; ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না।
