পরকালের জীবন নিয়ে বিশ্বাসী মানুষের মনে একটি প্রশ্ন বহুকাল ধরে ঘুরপাক খায়: বেহেশতে গিয়ে কি আমরা পৃথিবীর সেই পরিচিত জীবনসঙ্গীকেই ফিরে পাব? সম্প্রতি প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি ধর্মীয় বিশ্লেষণে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে কোরআন, হাদিস ও শাস্ত্রজ্ঞদের ব্যাখ্যার আলোকে।
মানুষের প্রথম সম্পর্কই হলো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। আদি পিতা আদম (আ.)-কে বেহেশতে রাখা হলে সঙ্গী হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছিল হাওয়া (আ.)-কে। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিস থেকে জানা যায়, বেহেশতে কোনো মানুষ সঙ্গীহীন থাকবে না (হাদিস: ২৮৩৪)। মহান আল্লাহ বান্দাকে বেহেশতের নেয়ামত দেওয়ার সময় তাকে ভালোবাসাময় এক পবিত্র জীবনসঙ্গী বা জীবনসঙ্গিনী দান করবেন।
পরকালে কে হবেন আমাদের সঙ্গী
প্রথম আলোর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বলা যায়, এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) কয়েকটি সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন (আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, ২০/৩৫০)। প্রথমত, পৃথিবীতে যারা ঈমানদার দম্পতি হিসেবে একসঙ্গে জীবন কাটিয়েছেন, তারা বেহেশতেও একে অপরের সঙ্গী হিসেবে পুনর্মিলিত হবেন। দ্বিতীয়ত, কোনো বিশ্বাসী মানুষ যদি কাউকে গভীরভাবে ভালোবেসেও বৈধ কোনো কারণে বিয়ে করতে না পারেন, তবে আল্লাহ বেহেশতে তাঁদের সেই কাঙ্ক্ষিত মিলন ঘটিয়ে দেবেন। তৃতীয়ত, কাউকে হয়তো বিশেষ স্বর্গীয় সঙ্গী দান করা হবে, যিনি হবেন পরকালের এক বিশেষ নেয়ামত।
অনুভূতির আমূল পরিবর্তন
দাম্পত্য জীবনের প্রাত্যহিক তিক্ততা থেকে অনেকে ঠাট্টা করে বলেন, পৃথিবীর এই স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গেই যদি বেহেশতে থাকতে হয়, তবে তো সেটা আর বেহেশত হলো না। কিন্তু শাস্ত্রের ব্যাখ্যা বলছে অন্য কথা। পৃথিবীতে মানুষের মধ্যে রাগ, অভিমান, মানসিক দূরত্ব কিংবা অপছন্দের জন্ম হতে পারে, কিন্তু বেহেশতে প্রবেশের আগেই অন্তর থেকে সব তিক্ততা স্থায়ীভাবে মুছে দেওয়া হবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, আমি তাদের অন্তর থেকে সব ক্ষোভ ও অনৈক্য দূর করে দেব; তারা ভাই ভাই হয়ে সামনাসামনি আসনে বসবে (সুরা হিজর, আয়াত: ৪৭)।
বিখ্যাত মুফাসসির আবদুর রহমান আস-সাদি তাঁর তাফসির গ্রন্থে লিখেছেন, বেহেশতবাসীদের হৃদয় হবে শতভাগ নির্মল ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ; সেখানে পুরোনো অভিমান বা অসন্তোষের সামান্য ছিটেফোঁটাও থাকবে না (তাইসিরুল কারিমির রহমান, ১/৪৩৫)। ফলে পৃথিবীতে কোনো দম্পতির মাঝে সমস্যা থাকলেও বেহেশতে তারা পরম ভালোবাসায় একে অপরকে গ্রহণ করবেন।
সৌন্দর্যের নিত্যনতুন বিকাশ
বেহেশতের দাম্পত্য সম্পর্কের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো সম্পর্কের চিরনবীনতা। সেখানে ভালোবাসা কখনো স্তিমিত হবে না, বরং সময়ের সঙ্গে তা বাড়তে থাকবে। মহানবী (সা.) বলেছেন, বেহেশতবাসীরা প্রতিবার জীবনসঙ্গীর মুখোমুখি হলে দেখবে তার রূপ-সৌন্দর্য আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে। স্বামী স্ত্রীকে বলবে, আল্লাহর শপথ, আমার কাছ থেকে যাওয়ার পর তোমার সৌন্দর্য আরও কতই না বেড়েছে। স্ত্রীও সেই উত্তর ফিরিয়ে দেবেন (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮৩৩)।
নারীদের জন্য কী থাকবে?
অনেকে প্রশ্ন তোলেন, বেহেশতের বর্ণনায় নারীদের জন্য কী রয়েছে? প্রথম আলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রকৃত সত্য হলো বেহেশতে কোনো অপূর্ণতা থাকবে না। নারী একা যদি বেহেশতের অধিকারী হন, তিনি যেমন সঙ্গী কামনা করবেন, তেমনই পাবেন। কোরআনে বলা হয়েছে, তোমরা এবং তোমাদের জীবনসঙ্গীগণ আনন্দচিত্তে বেহেশতে প্রবেশ করো (সুরা জুখরুফ, আয়াত: ৭০)। এই আয়াত নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই সমান সুসংবাদ বহন করে।
ইবনুল কাইয়িম আরও একটি বিষয় উল্লেখ করেছেন। পার্থিব পুণ্যবতী নারীদের সৌন্দর্য ও মর্যাদা বেহেশতে হুরদের চেয়ে অনেক গুণ বেশি হবে, কারণ তারা পৃথিবীতে কষ্ট সহ্য করে ঈমান ও ইবাদত রক্ষা করেছিলেন (হাদি আল-আরওয়াহ, পৃষ্ঠা ২৭৫)। ঈমানের জন্য সহ্য করা কষ্টের মূল্য আল্লাহর কাছে বিনষ্ট হয় না, এটাই এই ব্যাখ্যার মর্মকথা।
ঈমান ও সহনশীলতার শিক্ষা
এই বিশ্লেষণ আমাদের একটি গভীর শিক্ষা দেয়। পার্থিব জীবনের দাম্পত্য কলহ, অভিমান ও দূরত্ব চূড়ান্ত সত্য নয়; এগুলো ক্ষণস্থায়ী। যে দেশ ও জাতি হাজার বছরের সংগ্রামে ত্যাগের ইতিহাস বহন করে, সেখানে পরিবারের বন্ধন ও পারস্পরিক সহনশীলতার মূল্য আমরা ভালো করেই জানি। একাত্তরের শহীদদের স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মুক্তির মূলমন্ত্র ভালোবাসা আর ঐক্য। পরিবারে সেই ঐক্য ধরে রাখা প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব।
বেহেশতের এই প্রতিশ্রুতি আমাদের শেখায়, পৃথিবীতে ক্ষোভ নিয়ে না থেকে ক্ষমা ও ভালোবাসার পথ ধরেই জীবন গড়া উচিত। কারণ পরকালে যে মিলনের অপেক্ষা, সেই মিলনের শর্তই হলো পৃথিবীতে ঈমান ও সৎকর্ম নিয়ে জীবনযাপন। প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিমান সামলে স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন মজবুত করা যায়, আর সেই বন্ধনই হতে পারে পরকালের চিরস্থায়ী সঙ্গের সূচনা।
সত্য কী: প্রশ্ন ও উত্তর
বেহেশতে কি পৃথিবীর স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে থাকবেন?
ইমাম ইবনে কাসির (রহ.)-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ঈমানদার দম্পতি বেহেশতে একে অপরের সঙ্গী হিসেবে পুনর্মিলিত হবেন। তবে ঈমানদার কোনো পুরুষ বা নারী একা থাকলেও সেখানে তিনি সঙ্গীহীন থাকবেন না।
বেহেশতে কি রাগ-অভিমান থাকবে?
না। কোরআনের ভাষায়, বেহেশতে প্রবেশের আগেই অন্তর থেকে সব ক্ষোভ ও অনৈক্য মুছে দেওয়া হবে (সুরা হিজর, আয়াত: ৪৭)। পার্থিব কলহের কোনো চিহ্নই সেখানে থাকবে না।
নারীরা বেহেশতে কী পাবেন?
বেহেশতে কোনো অপূর্ণতা থাকবে না। পুণ্যবতী নারীরা যা কামনা করবেন, তা-ই পাবেন। ইবনুল কাইয়িমের মতে, পার্থিব পুণ্যবতীদের মর্যাদা হুরদের চেয়েও বেশি হবে।
