চলতি মৌসুমে নোয়াখালী অঞ্চলের লক্ষ্মীপুর জেলায় প্রায় ৭১০ কোটি টাকার সুপারি বেচাকেনা হওয়ার প্রত্যাশা করেছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। প্রথম আলোর সংবাদ অনুযায়ী, কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসে সুপারি সংগ্রহের এই মৌসুমে জেলার শতাধিক হাটবাজার এখন দিনরাত ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে মুখর। দেশের নিজস্ব মাটি ও শ্রম থেকে উৎপন্ন এই ফসন একটি জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিকে কীভাবে সচল রাখে, লক্ষ্মীপুর তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেহমনী এলাকার সুপারির বাজারে সড়কের ধারে বিশাল সুপারির স্তূপ জমে থাকে। জেলার বাইরের পাইকাররা স্তূপ থেকে স্তূপে ঘুরে দরদাম করেন, মিললে বস্তা বা ঝাঁকা ভরে দূরদূরান্তে পাঠান। সপ্তাহে দুই দিন এই বাজার বসে, আর শুধু তেহমনী বাজারেই প্রতি সপ্তাহে এক থেকে দেড় কোটি টাকার লেনদেন হয়।
কত দামে বিক্রি হচ্ছে সুপারি
তেহমনী বাজারের বিক্রেতা নজরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে প্রতি পণ অর্থাৎ ৮০টি পাকা সুপারি বিকি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকায়। প্রতি কাউন অর্থাৎ ১ হাজার ২৮০টি সুপারির দাম ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা।
জেলার অন্যতম বড় বাজারগুলোর মধ্যে রয়পুর উপজেলার হায়দাগঞ্জ, আলিয়া মাদ্রাসা এলাকা, বাসাবাড়ি, দেনায়েতপুর, খাসেরহাট, মোল্লারহাট ও মীরগঞ্জ উল্লেখযোগ্য। লক্ষ্মীপুর সদরের দালাল বাজার, রসুলগঞ্জ, ভবানীগঞ্জ, মান্দারী, দত্তপাড়া ও জকসি এবং রামগঞ্জের উপজেলা শহর, সোনাপুর, কাঞ্চনপুর ও করপাড়া বাজারেও চলে সুপারির কেনাবেচা।
দুই যুগ ধরে এ ব্যবসা করছেন রায়পুর উপজেলার রাখালিয়া গ্রামের মোখলেছুর রহমান। তিনি বলেন, মৌসুমে স্থানীয় বাজার থেকে সুপারি সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাহিদা অনুযায়ী পাঠানো হয়। প্রতি বছর তাঁর হাত ধরেই ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে দাবি তাঁর।
ভেজানো, শুকনা ও পাকা: তিন ধরনের বিক্রি
বিক্রেতা ও চাষিরা জানান, সুপারি তিনভাবে বিক্রি হয়। এখন মূলত পাকা সুপারি বিক্রি হচ্ছে, এর বাইরে ভেজানো ও শুকনা সুপারি বাজারে যায়। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুরে উৎপাদিত সুপারির প্রায় ৬০ শতাংশ নদী-নালা, খাল, পুকুর ও পানিভর্তি চৌবাচ্চায় ভিজিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। বাকি ৪০ শতাংশ কাঁচা ও রোদে শুকিয়ে বিক্রি হয়।
রায়পুরের চর মোহনা গ্রামের কৃষক মফিজ উদ্দিন বলেন, নভেম্বর-ডিসেম্বরে বাগানের সুপারি পাকে, তখন মজুতদাররা জোটবদ্ধ হয়ে বাজার থেকে কেনেন। কৃষকদের বিক্রি শেষ হলে জানুয়ারি থেকে মার্চে দাম লাফিয়ে বাড়ে, তখনই ভেজানো সুপারির বেশি বিক্রি হয়।
শ্রমিকের দৈনিক আয় আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা
সুপারির মৌসুমে বাগানমালিক ও ব্যবসায়ীরা যেমন আয় করেন, তেমনি গাছ থেকে সুপারি পাড়ার শ্রমিকেরাও উপকৃত হন। রায়পুরের কেরোয়া এলাকার রুবেল হোসেন ২০ বছর ধরে এ কাজ করছেন। তিনি বলেন, প্রতি গাছ থেকে সুপারি পেড়ে ১০ টাকা পান, আর মৌসুমে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০টি গাছে উঠেন।
রুবেল হোসেন আরও জানান, এতে তাঁর দৈনিক আয় দাঁড়ায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। একটি গাছ থেকে দুই থেকে তিনবার সুপারি পাওয়া যায়; মৌসুমের আয়ে পরিবারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি কিছু সঞ্চয়ও করা সম্ভব হয় বলে তিনি জানালেন।
কৃষি কর্মকর্তারা কী বলছেন
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জহির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, কার্তিক ও অগ্রহায়ণ সুপারি সংগ্রহের প্রধান সময়, আর এ সময় উৎপাদন ও বাজারজাতকরণকে কেন্দ্র করে লক্ষ্মীপুরের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আসে। সুপারির বাজার ভালো থাকলে কৃষকের আয় বাড়ে, পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ উপকৃত হন।
জহির আহমেদ বলেন, লক্ষ্মীপুরে উৎপাদিত সুপারির অর্ধেকের বেশি আসে রায়পুর উপজেলা থেকে, এরপর লক্ষ্মীপুর সদরের অবস্থান। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর পাকা, শুকনা ও ভেজানো মিলিয়ে প্রায় ৭১০ কোটি টাকার সুপারি বিক্রি করতে পারবেন কৃষকেরা।
নিজের মাটিতে নিজের ফসন
লক্ষ্মীপুরের মাটি ও আবহাওয়া সুপারি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একটি সুপারিগাছ থেকে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ফলন পাওয়া যায়; একবার চারা রোপণ করলে দীর্ঘমেযাদি আয়ের উৎস মিলে যায়। দীর্ঘমেযাদি লাভের কারণে ভালো দামের আশায় নতুন করে বাগান করতে আগ্রহী হচ্ছেন অনেক কৃষক।
গত বছর জেলায় ৭ হাজার ২৪৫ হেক্টর জমিতে সুপারিবাগান ছিল, বর্তমানে তা প্রায় ৭ হাজার ২৫০ হেক্টর। গতবার উৎপাদন হয়েছে ৪২ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন, আর এবারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪২ হাজার ৩৫০ মেট্রিক টন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে ওঠা এই বাংলাদেশের গর্ব তার নিজস্ব কৃষি, নিজস্ব বাজার আর নিজস্ব শ্রমিকের সংগ্রামে। যেমন মেঘনাতীরের জনগণ নিজেদের নদী ও ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করে, তেমনি লক্ষ্মীপুরের কৃষক আজ নিজের মাটির ফসনে স্বাবলম্বনের পথ দেখছেন, কোনো পরদেশি দায়িত্ব ছাড়াই। বিস্তারিত প্রেক্ষাপটে পাঠক এই সংবাদেও দেখতে পারেন কীভাবে স্থানীয় সম্পদ জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে।
সুপারির বাজার ভালো গেলে আগামী জানুয়ারি থেকে মার্চে ভেজানো সুপারির দাম আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন চাষিরা। জেলার হাটবাজারগুলো ততক্ষণ পর্যন্ত চলবেই, পণ আর কাউনের হিসাবে।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
চলতি মৌসুমে লক্ষ্মীপুরে কত টাকার সুপারি বেচাকেনা হবে?
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, পাকা, শুকনা ও ভেজানো মিলিয়ে প্রায় ৭১০ কোটি টাকার সুপারি বিক্রি হওয়ার প্রত্যাশা।
সুপারি পাড়ার শ্রমিকের দৈনিক আয় কত?
প্রতি গাছে ১০ টাকা হারে আয় করা একজন শ্রমিক মৌসুমে দিনে ২৫০ থেকে ৩০০টি গাছে কাজ করে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পান।
লক্ষ্মীপুরের কোথা থেকে সবচেয়ে বেশি সুপারি আসে?
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জহির আহমেদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উৎপাদিত সুপারির অর্ধেকের বেশি আসে রায়পুর উপজেলা থেকে।
একটি সুপারিগাছ কত বছর ফল দেয়?
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একটি সুপারিগাছ থেকে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ফলন পাওয়া সম্ভব।
