রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত ১৪ মাস বয়সী শিশু মিনহা রহমান রিদার চিকিৎসা চলছে। একটি ফেসবুক পোস্টের ডাকে মাত্র ১৩ ঘণ্টায় দেশ ও বিদেশ থেকে ৬২ লাখ ৪১ হাজার ৮৩৮ টাকা সহায়তা এসে পৌঁছেছে, যা গত আগস্টে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি টাকা না নেওয়ার নীতি থেকে সহায়তা চাওয়ার ১৩ ঘণ্টা পরেই পরিবার আর অর্থ লাগবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।
এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের সংগ্রামের গল্প নয়। এটি আমাদের জাতির চরিত্রের পরিচয়, যে জাতি ১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা কিনেছে, সেই জাতির অন্তর আজও সহমর্ম মানুষে ভরা। ছোট্ট মিনহার জন্য সাধারণ মানুষের এই ঐক্য প্রমাণ করে, বিপদের দিনে আমরা এক হতে জানি।
মায়ের বুক ফাটানো কথা, চিকিৎসার দীর্ঘ পথ
মিনহার মা মালিহা মোবাকশ্বেরা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, মেয়ের ক্যানসার ধরা পড়ার পর থেকে তাঁদের পুরো জীবনটাই বদলে গেছে। হাসপাতালে গেলে মেয়ের ভেইন খুঁজে পাওয়া যায় না, ক্যানুলা নষ্ট হয়ে যায়, মেয়ে চিৎকার করে কাঁদে। তবু তিনি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেন।
প্রথমেই মনে হয়েছে, আমার ছোট বাচ্চাটার কেন এমন হলো? এসব কথা বলতে গেলে বুক ফেটে যায়। মেয়ের হাসিটা সারা জীবন দেখতে চাই।
মালিহা জানান, চিকিৎসক প্রথম ক্যানসারের কথা বললে পরিবারের সদস্যরা ভাবতে শুরু করেন, সোনার গয়না কতটুকু আছে, জমি কতটুকু বিক্রি করতে হবে। ফেসবুকে সহায়তা চাইলে মানুষ এভাবে এগিয়ে আসবেন, তা তিনি কল্পনাও করেননি। এখন পর্যন্ত চিকিৎসায় খরচ হয়েছে ৪০ লাখ টাকার বেশি। চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে কম করে চার বছর। মোট খরচ কত হবে, তা এখনো অজানা।
গত মঙ্গলবার বনশ্রীর বাসায় কথা বলার সময় এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে ফোন আসে। জানানো হয়, বুধবার মিনহার বুকে কেমো পোর্ট লাগানো হবে, যার খরচ ৫০ হাজার টাকা। এর আগে একবার পোর্ট লাগানো হলেও তা কাজ করেনি। পোর্ট লাগানোর পর মিনহার কেমোথেরাপি আবার শুরু হবে।
কীভাবে ধরা পড়ল মিনহার ক্যানসার?
মালিহা শারীরিক জটিলতার কারণে বিয়ের পাঁচ বছর পর দেশ ও ভারতে চিকিৎসা করিয়ে মা হয়েছেন। গত বছরের ২২ আগস্ট অস্ত্রোপচারে মিনহার জন্ম হয়। ১১ মাস বয়স পর্যন্ত মেয়ে সুস্থ ছিল। তারপর মিনহা খেতে চাইত না, ওজন বাড়ছিল না। গত মে মাসে জ্বর আসে। ক্যানসার ধরা পড়ার আগে তার গলা ফুলে যায়।
৩১ জুলাই হোয়াইট ব্লাড সেলের রিপোর্ট দেখে চিকিৎসক প্রথম রক্তের ক্যানসারের সন্দেহ করেন। ১ আগস্ট থেকে মিনহার চিকিৎসা শুরু হয়। মিনহার মামা শাহাদাত জামান সৈকত বলেন, চিকিৎসায় একটুও সময় নষ্ট করা হয়নি। প্রথমে অন্য হাসপাতালে, পরে এভারকেয়ারে পরীক্ষা করানো হয়। ফলাফল একই আসে।
শিশুদের এ ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসায় সংক্রমণের ঝুঁকি বড় বিষয়। এই কারণেই পরিবার এভারকেয়ার হাসপাতাল বেছে নেয়। মিনহাকে ভারতের একটি উন্নত হাসপাতালেও নেওয়া হয়েছিল যাচাইয়ের জন্য। সেখানকার চিকিৎসকেরাও জানিয়েছেন, বাংলাদেশে চলা চিকিৎসা সঠিক পথেই এগোচ্ছে। এই বার্তা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্যও আশা জাগায়।
১৩ ঘণ্টার অভিযান: স্বচ্ছতাই ছিল মূল শক্তি
সামাজিক উদ্যোগ মজার স্কুলের কো-ফাউন্ডার শাহাদাত জামান সৈকত দীর্ঘদিন স্বেচ্ছাসেক হিসেবে কাজ করেছেন। মিনহার জন্য তিনি একটি ওয়েবসাইট চালু করেন, যেখানে মিনহার সব তথ্য দেওয়া ছিল এবং এখনো আপডেট করা হয়। স্বচ্ছতাই এই সহায়তা অভিযানের ভিত্তি ছিল।
কানাডাপ্রবাসী আত্মীয় এহসান খান আন্তর্জাতিক ডোনেশন প্ল্যাটফর্ম গোফান্ডমিতে সহায়তা চাওয়ার ব্যবস্থা করেন। সেখান থেকেই ৬২ লাখ টাকার মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ আসে। প্রথম পোস্টটি লিখে দিয়েছিলেন হেরা অফেলিয়া লরেন, যাঁর সঙ্গে শাহাদাতের বিয়ের কথা চলছে।
যে হারে মানুষ টাকা পাঠাতে থাকেন, তা দেখে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যাই। আমরা কোনোভাবেই মানুষের কাছ থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি টাকা নিতে চাইনি।
গত ৮ আগস্ট শাহাদাত তাঁর ফেসবুক পোস্টে লেখেন, মিনহা পাখির জন্য একটা সমুদ্র চেয়েছিলেন তিনি। ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই সেই সমুদ্রের জন্ম হয়ে গেছে। অনেকে ১০০ টাকা, ৫০০ টাকা বা আরও কম টাকাও পাঠিয়েছেন। ছোট ছোট দান মিলেই বড় অঙ্কটি দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষের সহমর্মিতা নতুন করে প্রমাণিত
মিনহার মতো সবাই তো সহায়তা পান না, এই প্রশ্নের উত্তরে শাহাদাত বলেন, এটা মিনহার গুড লাক। তবে তিনি মনে করান, অনলাইনে সাহায্য পাঠানোর আগে মানুষ বিষয়টির সত্যতা ও স্বচ্ছতা যাচাই করতে চান। মিনহার ওয়েবসাইটে সব তথ্য থাকাটাই মানুষের আস্থা অর্জন করেছে।
আমাদের জাতীয় চেতনায় পরস্পরের পাশে দাঁড়ানোর যে শিক্ষা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের দিয়েছে, মিনহার জন্য সাধারণ মানুষের এই সাড়া তারই ধারাবাহিকতা। কেউ কেউ দেশের মানুষের উদারতা নিয়ে সংশয় পোষণ করেন, ছোট্ট একটি শিশুর জীবন বাঁচাতে দেশ-বিদেশের বাঙালির এই ঐক্য সেই সংশয়ের জবাব। একই সহমর্মিতা দেখা গেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার শিশুদের চিকিৎসায়ও, যেখানে বাংলাদেশিরা ১ লাখ পাউন্ডেরও বেশি তহবিল সংগ্রহ করেছেন বলে জামুনা টেলিভিশন জানিয়েছে।
তবে এই ঘটনা একটি কঠিন প্রশ্নও তোলে। ক্যানসারের চিকিৎসা কেন এত ব্যয়বহুল যে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে জমি ও গয়না বিক্রির কথা ভাবতে হয়? ওষুধের দাম নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং ১৩৭টি ওষুধ সস্তা হচ্ছে বলে এমএসএনের সংবাদে উঠে এসেছে। আমাদের দেশেও ক্যানসারের ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জরুরি। মানুষের দানে যেমন জীবন বাঁচে, রাষ্ট্রের দায়িত্বও তেমনই এড়ানো চলে না।
মিনহার বাবা রোমান হোসেন নারায়ণগঞ্জের ভুলতায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত। মঙ্গলবার বাসায় দেখা যায়, মিনহা পরিবারের সবাইকে মাতিয়ে রেখেছে। সে দাঁড়াতে পারে, কিছু ধরে হাঁটার চেষ্টা করে, চারটি দাঁত বের করে হাসে। মা, বাবা, মামা ডাকতে শিখেছে।
মালিহা বলেন, মানুষ এগিয়ে না এলে মেয়ের উন্নত চিকিৎসা সম্ভব হতো না। মেয়ের মুখের হাসি ধরে রাখতে ভবিষ্যতে আবার প্রয়োজন হলে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। চার বছরের এই দীর্ঘ চিকিৎসাপথে ছোট্ট মিনহা এখন সাড়ে চার কোটি মানুষের প্রার্থনার সঙ্গী।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
মিনহার কী ধরনের ক্যানসার ধরা পড়েছে?
১৪ মাস বয়সী মিনহা রহমান রিদার ১১ মাস বয়সে রক্তের ক্যানসার ধরা পড়ে। ২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে।
১৩ ঘণ্টায় কত টাকা সহায়তা পাওয়া যায়?
ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর মাত্র ১৩ ঘণ্টায় দেশ ও বিদেশ থেকে ৬২ লাখ ৪১ হাজার ৮৩৮ টাকা সহায়তা মিলিয়ে ফেলা হয়। এর প্রায় ৩০ লাখ টাকা এসেছে গোফান্ডমি প্ল্যাটফর্ম থেকে।
মিনহার চিকিৎসা আর কত দিন চলবে?
মিনহার মা মালিহা মোবাকশ্বেরা জানিয়েছেন, চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে কম করে চার বছর। এখন পর্যন্ত ৪০ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে।
