ডুরান্ড ফাইনালে হাবাসের পাঁচ চাল: স্বাধীনতার চেতনায় লাল-হলুদের জয়গান
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজও বাঙালির রক্তে। সেই চেতনার প্রতিফলন ঘটল ময়দানেও। ইস্টবেঙ্গলের কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস তাঁর কৌশলের জোরে ডুরান্ড কাপের ফাইনালে মোহনবাগানকে হারিয়ে দেখিয়ে দিলেন, সঠিক পরিকল্পনা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে যেকোনো বাধাই জয় করা সম্ভব। এই জয় শুধু ফুটবল মাঠের জয় নয়, এটি আমাদের জাতীয় চরিত্রেরই জয়।
হাবাসের প্রতিশোধ ও ইস্টবেঙ্গলের ঐতিহাসিক জয়
মোহনবাগানের কোচ হিসেবে ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে একটিও ম্যাচ হারেননি হাবাস। কিন্তু ইস্টবেঙ্গলের কোচ হিসেবে প্রথম ডার্বিতেই হারতে হয়েছিল তাঁকে। সেই আঁতকে ঘা ছিল তাঁর মনে। ডুরান্ড কাপের ফাইনালে সব হিসাব বদলে দিলেন তিনি। মোহনবাগানের কোচ পানাজিওটিস দিমপেরিসকে দাঁড় করিয়ে হারালেন তিনি। এই জয় যেন মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়েরই প্রতিচ্ছবি।
বিশ্রামের সিদ্ধান্ত: সঠিক পরিকল্পনার জয়
ডুরান্ড ফাইনালের আগের দিন ফুটবলারদের বিশ্রাম দিয়েছিলেন হাবাস। তা নিয়ে সমালোচনাও হয়েছিল। কিন্তু তাঁর সিদ্ধান্ত যে সঠিক ছিল, তা ফাইনালে বোঝা গেল। অনেক তরতাজা দেখাল ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলারদের। ৯০ মিনিট ধরে তাঁরা চাপে রাখলেন মোহনবাগানকে। শারীরিক দক্ষতায় সবুজ-মেরুনকে পর্যুদস্ত করল লাল-হলুদ। পোড়খাওয়া কোচ হাবাস জানতেন, ফাইনালে জিততে হলে কোনও ফাঁক রাখলে চলবে না। সব ফাঁক ভরাট করলেন তিনি। দিমপেরিস বুঝতেই পারলেন না, কোন ছকে খেলাবেন। হাবাসের পরিকল্পনার কোনও জবাব তাঁর কাছে ছিল না।
হাবাসের পাঁচ চাল: কৌশলের কারসাজি
১) জমাট রক্ষণ: প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা
হাবাস জানেন, আক্রমণ ম্যাচ জিতালেও প্রতিযোগিতা জেতায় রক্ষণ। ইস্টবেঙ্গলে তরুণ রক্ষণ তৈরি করেছেন তিনি। আনোয়ার আলির সঙ্গে রয়েছে জয় গুপ্তা ও হার্দিক ভাট। তিন জনেরই বয়স অল্প। তাঁরা যেমন আক্রমণে উঠতে পারেন, তেমনই রক্ষণের সময় কাজের কাজটা করেন। ডুরান্ড ফাইনালে সেটাই দেখা গেল। যত বার মোহনবাগান আক্রমণে উঠল, তত বার প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে থাকলেন তাঁরা। রক্ষণের ফাঁকই খুঁজে পেলেন না ম্যাকলারেন, সাহালেরা। তা হলে আর কী ভাবে গোল হবে। পাশাপাশি গোলরক্ষক প্রভসুখনও ভরসা দিলেন। বেশ কয়েকটি ভাল বল বাঁচালেন তিনি।
২) মাঝমাঠের দখল: খেলার নিয়ন্ত্রণ
শুরু থেকেই মাঝমাঠের দখল নিজেদের পায়ে নিয়ে নিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। রশিদ, জিকসন সিংহ, দানি রামিরেজদের দাপটে একের পর এক আক্রমণ করে তারা। তাতেই ভেঙে পড়ে মোহনবাগানের রক্ষণ। অন্য দিকে দিমপেরিস রক্ষণাত্মক পরিকল্পনা করেছিলেন। ডুরান্ডে বাগানের সেরা গোলদাতা সাহালকেই শুরু থেকে নামাননি তিনি। আপুইয়াকে নামিয়ে রক্ষণ জমাট করতে চেয়েছিলেন। তাতে না হল রক্ষণ, না হল আক্রমণ। গোটা ম্যাচ জুড়ে ইস্টবেঙ্গলের মাঝমাঠ দুর্দান্ত খেলল।
৩) শুভাশিসের দুর্বলতা কাজে লাগানো
বয়স হয়েছে শুভাশিসের। গতি নেই। আক্রমণে উঠলে আর নামতে পারেন না। হাবাস তা জানতেন। তাই বাঁ প্রান্তে তিনি নামিয়ে দিলেন এডমুন্ড লালরিনডিকা ও বিপিন সিংহকে। দু'জনেরই গতি রয়েছে। সেই গতি কাজে লাগিয়ে বার বার শুভাশিসের দিক থেকে আক্রমণ করল ইস্টবেঙ্গল। হ্যাটট্রিক করলেন লালরিনডিকা। এক গোল করলেন বিপিন। দ্বিতীয়ার্ধে একটা সময় পুরো দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন শুভাশিস। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, দৌড়াতেই পারছেন না।
৪) রশিদকে ব্যবহার: নেপথ্য নায়ক
হাবাস জানেন, তাঁর দলের খেলা চালান রশিদ। তাই তাঁকে ঠিক ভাবে ব্যবহার করলেন তিনি। প্রথমার্ধে রশিদ অনেক বেশি আক্রমণাত্মক খেললেন। তাঁর পায়েই একের পর এক আক্রমণ তৈরি হল। গোল দু'টি গোল করালেন রশিদ। দ্বিতীয়ার্ধে আবার কিছুটা রক্ষণাত্মক খেলতে দেখা গেল তাঁকে। হাবাস জানতেন, মোহনবাগান গোলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে। তাই তাঁদের রক্ষণকে আরও জমাট হতে হবে। রশিদ সেই কাজটাই করলেন। রশিদ আরও একটি ম্যাচে দুর্দান্ত খেললেন। দলের জয়ের নেপথ্য নায়ক তিনি।
৫) দ্বিতীয়ার্ধে ছক বদল: বুদ্ধিমানের কৌশল
প্রথমার্ধে হাবাস যে ছকে খেলেছেন, দ্বিতীয়ার্ধে তা দেখা যায়নি। প্রথমার্ধে গতি ও পাসিং ফুটবল কাজে লাগিয়ে গোল তুলে নিতে চেয়েছিলেন তিনি। সেটা হয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে খেলার গতি কমিয়ে দেয় ইস্টবেঙ্গল। হাবাস জানতেন, খেলার গতি কমালে মোহনবাগানেরও সমস্যা হবে। পাশাপাশি রক্ষণের দিকে বেশি নজর দেন তিনি। জানতেন বাগান মরিয়া আক্রমণ করলে তাদের রক্ষণে ফাঁক তৈরি হবে। প্রতিআক্রমণ থেকে সেই ফাঁক কাজে লাগাতে পারবেন তিনি। লাগিয়েও ফেলেছিলেন প্রায়। দু'টি সহজ সুযোগ নষ্ট করে ইস্টবেঙ্গল। নইলে ডার্বির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মার্জিনে জিতে মাঠ ছাড়তে পারতেন হাবাস।
স্বাধীনতার চেতনায় জয়ের বার্তা
এই জয় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ১৯৭১ সালে যেমন স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলাম, তেমনি আজও নিজের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রাখলে যেকোনো প্রতিকূলতাকে জয় করা সম্ভব। হাবাসের এই কৌশলগত জয় আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাঙালির মেধা ও শ্রমের জয় আজ প্রমাণিত। জয় হোক আমাদের চিরকালীন চেতনার, জয় হোক বাঙালির।
ছবি: আনন্দবাজার পত্রিকা