মার্কিন 'সুপার পাওয়ার'র রণতরীতে শৌচাগার সংকট: ইরান যুদ্ধের আগে নৌবাহিনীর লজ্জার ইতিহাস
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে আমরা শিখেছিলাম, স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে গেলে শুধু অস্ত্রই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সাহস, সংকল্প এবং নিজের মাটি ও মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। আজ সেই পাঠ মনে রেখে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি হিসেবে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর বর্তমান অবস্থা দেখে অবাক হতে হয়। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার আগেই তাদের বিমানবাহী রণতরীগুলোর শৌচাগার সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, 'সুপার পাওয়ার' বলে পরিচিত দেশটির গর্ব এখন ধুলোয় মিশেছে।
ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনে অস্বাস্থ্যকর শৌচাগারের ছবি ভাইরাল
সম্প্রতি প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকা থেকে ইরানি রণাঙ্গনে পাঠানো হচ্ছে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে রণতরীটির অস্বাস্থ্যকর শৌচাগারের ছবি। মার্কিন প্রতিরক্ষা গবেষক সেথ হার্প গত ১৬ অগস্ট এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) ছবিগুলো পোস্ট করেন। সেখানে দেখা গেছে, বাদামি ও হলুদ হয়ে যাওয়া কমোডের জলে ভাসছে মল, শ্যাওলা ধরা মেঝে এবং ভাঙা পাইপ।
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলোর একাংশের দাবি, ওয়াশিংটনে মোতায়েন নৌসৈনিকদের কাছ থেকে ছবিগুলো পান হার্প। অন্যদিকে, রণতরীটির এক নাবিক খাদ্যসংকটের অভিযোগ তুলে বলেছেন, ''আমরা কখনওই তাজা খাবার পাই না। ফলে প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়া মাংস এবং ফল খেয়ে কাটাতে হচ্ছে। অথচ, পেন্টাগনের কারও কোনও হেলদোল নেই।''
১৯৯২ সালে চালু হওয়া রণতরীতেও সংস্কারের পরও শৌচাগার অপরিবর্তিত
১৯৯২ সালের জুনে মার্কিন নৌবহরে যুক্ত হয় পরমাণু শক্তিচালিত ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন। ৯০টি লড়াকু জেট নিয়ে দীর্ঘ সময় সমুদ্রে ভেসে থাকার ক্ষমতা থাকলেও, নৌসৈনিকদের জীবনযাত্রার মান নিয়ে বারবার অভিযোগ উঠেছে। ২০২৩ সালে রণতরীটিতে আমূল সংস্কার করে কয়েক কোটি ডলার ব্যয় করা হয়। ছয় বছরের জন্য পরমাণু চুল্লিতে জ্বালানি ভরলেও, শৌচালয়গুলোর উন্নতি করা হয়নি বলেই প্রতীয়মান।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে ২৫০ দিনের মোতায়েনে নাবিকদের বিদ্রোহ
একটানা ২৫০ দিনের বেশি ইরান সংলগ্ন সমুদ্রে মোতায়েন আছে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। বন্দরে ফেরার অনুমতি না মেলায় রণতরীতে দানা বাঁধে 'বিদ্রোহ'! সূত্রের খবর, যুদ্ধের মধ্যেই জাহাজ ছেড়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করেন অন্তত সাত জন নৌসৈনিক। তড়িঘড়ি কপ্টার নামিয়ে তাদের উদ্ধার করতে সক্ষম হন ক্যাপ্টেন।
ডেমোক্র্যাটিক দলের নেতা তথা মার্কিন কংগ্রেস সদস্য মাইক লেভিন সমাজমাধ্যমে লিংকনের ভয়াবহ অবস্থার বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, ''আমাদের সৈনিকদের শ্যাওলা পড়া পাইপে স্নান করতে হচ্ছে। শৌচাগারের একাংশ ভেঙে পড়েছে। কাচাকাচি বা গরম জলের নেই কোনও ব্যবস্থা। খাবার বলতে আধ কাপ ভাত পাচ্ছেন তাঁরা। সাবান, সুগন্ধি বা টুথপেস্টের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীও ফুরিয়ে গিয়েছে।''
ট্রাম্পের মন্তব্য ও জর্জ ওয়াশিংটনের রওনা
বিষয়টি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ''বিমানবাহী রণতরী লিংকন মোটেই দীর্ঘ দিন মাঝসমুদ্রে মোতায়েন নেই। সেখানকার নৌসৈনিকদের পরিবারের কেউই চিন্তিত নন। যুদ্ধজাহাজটিকে খুব শীঘ্রই স্থানান্তরিত করা হবে।'' তার ওই মন্তব্যের পরই রণক্ষেত্রে রওনা দেয় ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন।
ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের 'শৌচাগার যুদ্ধ'
গত মার্চে লোহিত সাগর সংলগ্ন এলাকায় মোতায়েন থাকা ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের ভেতরের একটি ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে রণতরীটির শৌচাগারের সামনে মার্কিন নৌসৈনিকদের লম্বা লাইন দেখা যায়। ৫,০০০ ফৌজির জন্য হাতেগোনা শৌচালয় থাকায় মলত্যাগের জন্য মাঝেমধ্যেই ৪০-৪৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাদের।
বিশ্বের আধুনিকতম বিমানবাহী রণতরীটির এই সমস্যাকে 'শৌচাগার যুদ্ধ' বলে উল্লেখ করেছে একাধিক মার্কিন গণমাধ্যম। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে কর্মজীবন শুরু করা ফোর্ডে 'ইউনিসেক্স' শৌচালয় রয়েছে এবং পয়ঃপ্রণালীতে 'ভ্যাকুয়াম' পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু পাইপ সঙ্কীর্ণ হওয়ায় দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকায় সমস্যায় পড়ে জাহাজটি।
বিশ্লেষকদের দাবি, ফোর্ডে মোতায়েন থাকা ৫,০০০ নৌসৈনিকের দৈনিক বর্জ্য বহনের সক্ষমতা রণতরীটির পয়ঃপ্রণালীর নেই। সমুদ্রের নোনা জলের প্রভাবে পাইপের ভিতরে ক্যালশিয়াম জমে নিকাশি পথ আরও সরু হয়ে যায়। ফলে শৌচাগারে 'অ্যাসিড ফ্লাশ'-এর নির্দেশ দিতে বাধ্য হন ক্যাপ্টেন, যার প্রতি বারে খরচ আনুমানিক চার লক্ষ ডলার। দিনে অন্তত একবার সৈনিক ও প্রকৌশলীদের নিজের হাতে পয়ঃপ্রণালীর পাইপ পরিষ্কার করতে হচ্ছিল।
শৌচালয় সমস্যার খবর প্রকাশ্যে আসার কিছু দিনের মধ্যেই ফোর্ডের ভিতরের লন্ড্রি ঘরে আগুন লাগে। তার পরই তড়িঘড়ি রণতরীটিকে বন্দরে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয় পেন্টাগন। গোটা ঘটনার নেপথ্যে অন্তর্ঘাতের গন্ধ পেয়েছেন সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ।
স্বাধীনতার চেতনা বনাম সাম্রাজ্যবাদের পতন
১৯৭১ সালে আমরা আমাদের মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলাম। আজকের এই খবর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে দেশ নিজের সৈনিকদের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করতে পারে না, তাদের পক্ষে অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব হরণ করা কখনো সম্ভব নয়। মার্কিন নৌবাহিনীর এই অবস্থা সাম্রাজ্যবাদের চরম পতনেরই ইঙ্গিত বহন করে। বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশের জন্য এটি একটি শিক্ষণীয় বিষয় যে, নিজের শিকড়, নিজের সংস্কৃতি এবং নিজের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ থাকাই প্রকৃত শক্তির উৎস।
Photo: Anandabazar Patrika