দল বনাম দেশ: তারেক রহমানের সরকার কি সঠিক পথে হাঁটছে?
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সেই ঐতিহাসিক উচ্চারণ, 'ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়' — এই বাণী কি কেবল সভা-সমাবেশের স্লোগান হয়ে রইল, নাকি বাস্তব রাজনীতিতে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে? ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রক্তস্নাত পথ বেয়ে উঠে আসা নতুন বাংলাদেশে এই প্রশ্নই আজ সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক।
রাষ্ট্রের স্বার্থ নাকি ব্যক্তিগত আবেগ?
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী চিন্তাবিদ হান্স মরগেনথাউ বলেছিলেন, রাষ্ট্র চালাতে ব্যক্তিগত আবেগ নয়, দেশের স্বার্থই মুখ্য। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা বা আনুগত্য কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর শেখ হাসিনা ভারতের আশ্রয় নিয়েছিলেন — এই ব্যক্তিগত ঋণ কি তবে রাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল? প্রশ্নটা আজও প্রাসঙ্গিক।
নতুন সরকারের সামনে একই পরীক্ষা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার সাত মাসের বেশি সময় ধরে দেশ চালাচ্ছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরুকরণ ও দুর্বল প্রতিষ্ঠানের বোঝা নিয়ে এই সরকারের যাত্রা শুরু। কিন্তু সম্প্রতি ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দলীয় নেতাদের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দলের জন্য ত্যাগ করা নেতাদের 'মূল্যায়ন' করা ভালো কথা, কিন্তু যে কাজের দায়িত্ব পাচ্ছেন, সেই কাজের যোগ্যতা কি যাচাই করা হচ্ছে?
যোগ্যতা নাকি আনুগত্য?
১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবিএম মূসা। কিন্তু ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলেই তিনি পিআইবির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পান। তখন তার দলীয় পরিচয় নয়, কাজের যোগ্যতাই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। সেই চেতনাই কি আজ আমাদের দরকার? আওয়ামী লীগপন্থী সেরা প্রকৌশলী, জামায়াতপন্থী দক্ষ চিকিৎসক, এনসিপিপন্থী মেধাবী প্রযুক্তিবিদ — শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কি তাদের বাদ দেওয়া যায়?
জনমতের প্রশ্ন
রাজনীতিতে শুধু সত্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, মানুষের ধারণাও বড় বিষয়। মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও দখলের ঘটনা জনমনে যে ক্ষোভ তৈরি করেছে, তা উপেক্ষা করার নয়। প্রায় ৫০ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি মিরপুরের মা ও শিশুদের সেবা দিয়ে এসেছে। এই ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে, যদিও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। সরকার তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে — এটা ভালো দিক। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, পারিবারিক পরিচয়ের কারণেই কি তাকে সংসদ সদস্য করা হয়েছিল?
ওয়ান-ইলেভেনের শিক্ষা
২০০১ থেকে ২০০৬ সালের শাসনামলের অভিযোগ আর ওয়ান-ইলেভেনের পরিণতি বিএনপিকে বড় মূল্য দিতে হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস নিজেই স্বীকার করেছেন, ওয়ান-ইলেভেনের পরিণতি বিএনপির চেয়ে বেশি আর কেউ ভোগ করেনি। তাহলে এত বড় অভিজ্ঞতার পরও যদি দলের কারও ত্যাগের মূল্য দিতে গিয়ে জনমনে পুরোনো সন্দেহ ফিরে আসে, শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা কার?
জুলাইয়ের চেতনা কি বাঁচবে?
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অন্তত ১৩৩ শিশু প্রাণ দিয়েছে, তাদের ১১৭ জনই গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। এত রক্ত, এত ত্যাগের পরও যদি রাজনীতি আবার 'আমার লোক', 'আমার দলের মানুষ' — এই পুরোনো হিসাবে ফিরে যায়, তাহলে জুলাই থেকে আমরা কী শিখলাম? জুলাই কি শুধু সরকার বদলানোর জন্য ছিল, নাকি রাজনীতিটাও বদলানোর জন্য? ১৯৭১ সালের চেতনা ও জুলাইয়ের রক্ত — দুই-ই আমাদের একই শিক্ষা দেয়: দেশ সবার বড়। সেই শিক্ষা কি আমরা ধারণ করতে পারব?