ব্যাংক হিসাব খুলতে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সংকট ও ব্যাংকারদের আহ্বান
চলতি অর্থবছরের বাজেটে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাসহ সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যাংক হিসাব খুলতে ব্যবসায় নিবন্ধন নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের লাখ লাখ ছোট উদ্যোক্তা এখন ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূলধারায় প্রবেশের পথে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন। ব্যাংকাররা বলছেন, এই নিয়ম কার্যকর করতে গিয়ে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যই যেন হুমকির মুখে পড়ছে।
নতুন নিয়মে কেন বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা?
বিআইএন, যা ভ্যাটের নিবন্ধন নামে পরিচিত, তা ছাড়া এখন আর কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ব্যাংক হিসাব খুলতে পারছে না। ফলে যাঁদের ব্যবসা ছোট পরিসরে, যেমন একটি দোকান বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পণ্য বিক্রি, তাঁদের অনেকেরই ট্রেড লাইসেন্স থাকলেও ভ্যাট নিবন্ধন নেই। এই নতুন বাধ্যবাধকতা তাঁদের জন্য ব্যাংকিংয়ে প্রবেশের প্রথম ধাপটিই কঠিন করে দিয়েছে।
ব্যাংকারদের সংগঠন এবিবির চিঠি ও এনবিআরের জবাব
দেশের ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) গত ১৭ আগস্ট জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট বিভাগে চিঠি দিয়ে ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য এই বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানায়। তবে গত ১৭ সেপ্টেম্বর এনবিআরের ভ্যাট বাস্তবায়ন শাখা জবাবে জানায়, আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে আবেদনটি বিবেচনার সুযোগ নেই। বরং নতুন হিসাব খোলার ক্ষেত্রে সব ব্যাংককে ভ্যাট নিবন্ধন যাচাই করতে দ্রুত নির্দেশনা দিতে পাল্টা অনুরোধ করা হয়েছে।
এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, 'বিষয়টি আইনের মাধ্যমে সংযোজন করায় কাউকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ নেই।' তবে তিনি মনে করেন, এবিবির পক্ষ থেকে চিঠিটি ভ্যাট নীতি শাখায় পাঠানো হলে আরও ভালো হতো।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নাকি নতুন প্রতিবন্ধকতা?
এবিবির নেতারা বলছেন, এই নিয়মের মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যবসাকে আরও আনুষ্ঠানিক কাঠামোতে আনা এবং করব্যবস্থার আওতা বাড়ানো। সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে তাঁদের দ্বিমত নেই। তবে বাস্তবায়নের সময় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বাস্তবতাও মাথায় রাখার কথা বলেছেন তাঁরা।
এবিবির চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ছোট উদ্যোক্তাকে ব্যাংকের ভেতরে আনা, বাইরে রাখা নয়। তাঁরা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এলে তাঁদের লেনদেনের তথ্য-উপাত্ত জানা যাবে, ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক হবে, ঋণ পাওয়ার সক্ষমতা বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত করব্যবস্থার আওতা বিস্তৃত হবে।'
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কণ্ঠস্বর
ঢাকার উত্তর বাড্ডায় ছয় বছর ধরে কাপড়ের ব্যবসা করা গার্লি বুটিকের উদ্যোক্তা রাহিয়াতুল জান্নাত বলেন, 'আমরা ভ্যাটের নিবন্ধন নিয়ে তেমন কিছু জানি না। অধিকাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এ সম্পর্কে জানেন না। তাই ব্যাংক হিসাব খোলায় ভ্যাটের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করায় অনেক নতুন উদ্যোক্তাদের সমস্যা হচ্ছে।'
সিরাজগঞ্জে ১২ বছর ধরে তাঁতপণ্য নিয়ে কাজ করা 'তাঁত গ্যালারি'র উদ্যোক্তা মো. ওমর ফারুক বলেন, 'আমরা ঠিকমতো টিআইএনের কাজটাই করতে পারছি না। এখন ভ্যাটের নিবন্ধন নিয়ে প্রতি মাসে রিটার্ন দেওয়া আমাদের জন্য কঠিন। আমরা একা কাজ করি। প্রতি মাসে বিস্তারিত হিসাব করে রিটার্ন দেওয়া বাড়তি চাপ হয়ে যাবে।'
কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে?
এনবিআরকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায় করতে হবে। এর মধ্যে ভ্যাট থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল লক্ষ্য অর্জনের উদ্যোগ হিসেবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ভ্যাটের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনবিআর।
স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির পথে নতুন চ্যালেঞ্জ
১৯৭১ সালে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তার মূল লক্ষ্য ছিল একটি আত্মনির্ভরশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন। আজকের এই সিদ্ধান্ত আমাদের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের, যাঁরা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, তাঁদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার শামিল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, প্রতিটি সংগ্রামেই আমরা চেয়েছি আমাদের মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে। এখন সময় এসেছে আমাদের অর্থনৈতিক নীতিগুলোও সেই চেতনায় পরিচালিত করার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আনা হলে তাঁদের লেনদেনের তথ্য জানা যাবে, ঋণ পাওয়ার সক্ষমতা বাড়বে এবং ধীরে ধীরে তাঁরা করের আওতায় আসবেন। কিন্তু হঠাৎ করে বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের মতো কঠোর নিয়ম তাঁদের জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে।
সমাধানের পথ কী হতে পারে?
ব্যাংকাররা মনে করেন, ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সহজ ও স্বল্প খরচের নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ভ্যাট নিবন্ধন থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশও করেছেন তাঁরা। এতে করে একদিকে যেমন আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে, অন্যদিকে কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন সম্ভব হবে।
সরকারের কাছে জরুরি পদক্ষেপের দাবি
দেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রতিটি অর্থনৈতিক সংকটে আমরা দেখেছি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুবা দেশের অর্থনীতির ভিতই দুর্বল হয়ে পড়বে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শেখায়, কোনো সংকটেই আমরা আমাদের মানুষের পাশে দাঁড়াতে ভুলি না। আজও সেই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ানোর সময় এসেছে।