বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এক কঠিন মোড়ে দাঁড়িয়ে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে আমরা অর্জন করেছি রাজনৈতিক স্বাধীনতা, কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি এখনো অধরা। এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রবৃদ্ধি বা মূল্যস্ফীতি নয়; বরং ব্যাপক ও গভীর আস্থার সংকট। এই সংকট কেবল একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্পষ্টভাবে প্রকাশিত ও সুসমন্বিত নীতি-পরিকল্পনা এবং তার যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
অর্থনীতি কি আবারও স্থবিরতার দিকে?
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক 'ধ্রুপদি অর্থনৈতিক স্থবিরতার' (ক্ল্যাসিক স্ট্যাগফ্ল্যাশন) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে প্রবৃদ্ধি অস্বাভাবিক রকম দুর্বল, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি চড়া। গত অর্থবছরের মার্চ প্রান্তিকে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল খুবই দুর্বল, এবং শিল্প খাত প্রকৃতপক্ষে সংকুচিত হয়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতি কার্যত মন্দার মধ্যে চলে গেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চলমান গ্যাস-সংকট, যা শিল্প উৎপাদনে আরও বড় ধাক্কা দিচ্ছে। জ্বালানি ছাড়া কলকারখানা চালানো সম্ভব নয়, আর কলকারখানা বন্ধ থাকলে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন দুই-ই ভেঙে পড়ে। পরবর্তী প্রান্তিকের তথ্য এলে হয়তো দেখা যাবে, সামগ্রিক অর্থনীতিই সংকোচনের দিকে এগোচ্ছে।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি কিছুতেই বাগে আসছে না। জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে, যা ৯ শতাংশ থেকে সামান্যই কমেছে। বিশেষ করে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে থেকে সামগ্রিক মূল্যচাপ ধরে রেখেছে। সাধারণ মানুষ যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তখন সেই অর্থনীতি কার মুক্তি দেয়?
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও রাজনৈতিক প্রভাবের পুনরুত্থান
দুর্বল প্রবৃদ্ধি আর একগুঁয়ে মূল্যস্ফীতির এই অদ্ভুত জুটি সব সময়ই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠিন পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করায়। সম্প্রসারণমূলক নীতি (সুদের হার কমিয়ে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিতে গতি আনা) গ্রহণ করলে মূল্যস্ফীতি আবার মাথাচাড়া দেওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার সংকোচনমূলক নীতি (উচ্চ সুদহার বজায় রেখে মূল্যস্ফীতি প্রশমিত হওয়া পর্যন্ত অর্থনীতি ধীর করা) নিলে প্রবৃদ্ধি আরও চাপে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরের বছর দুয়েক ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত সংকোচনমূলক নীতির পথেই হেঁটেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর 'নয়-ছয়' সুদহার সীমা তুলে দেওয়ার পর থেকে নীতি সুদহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যার ফলে ঋণ ও আমানত, উভয়ের সুদহারই বেড়েছে। যেকোনো বিচারেই বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এটি বেশ দৃঢ় বা কঠোর অবস্থান হিসেবেই থেকে গেল গণ-অভ্যুত্থানের পরের বছর দুয়েকে।
কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে আকস্মিক পরিবর্তনের পর মে মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। বিদ্যমান মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতির মধ্যে এই প্রণোদনা কতটা যৌক্তিক, তা আলোচনার দাবি রাখে। দেশের শিল্পকারখানার জ্বালানি সরবরাহের এই কঠিন সময়ে 'বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতে' প্রণোদনা ঋণের প্রবাহ বৃদ্ধির এ উদ্যোগ ব্যাংকিং খাতের পাহাড়সম খেলাপি ঋণ পরিস্থিতির মধ্যে ঋণগ্রহীতা ও ব্যাংক, দুই পক্ষের জন্য আদৌ কতটা সহায়ক হবে, তা নিয়েও পর্যালোচনা হওয়া প্রয়োজন।
মুদ্রানীতির ত্রিসংকট: তিনটি লক্ষ্য, দুটি পছন্দ
তাত্ত্বিক ও ফলিত সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি বিষয় স্বীকৃত: কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই সময়ে তিনটি লক্ষ্যের মধ্যে যেকোনো দুটি অর্জন করতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই তিনটি নয়। এই তিন লক্ষ্য হলো:
- মুদ্রানীতির স্বায়ত্তশাসন: দেশীয় অগ্রাধিকার অনুযায়ী সুদহার নির্ধারণের স্বাধীনতা;
- পুঁজির বাধাহীন চলাচল: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে প্রবাসী আয় ও রিজার্ভ সঞ্চয়ের অবাধ প্রবাহ;
- বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা: বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের স্থিতিশীল হ্রাস-বৃদ্ধি।
সুদহার কমিয়ে দেশীয় বিনিয়োগে সহায়তা দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যত মুদ্রানীতির স্বায়ত্তশাসনকেই বেছে নিয়েছে। প্রশ্ন হলো, এর বিনিময়ে তারা আসলে কী ছাড় দিচ্ছে। যদি তারা বিনিময় হারের স্থিতিশীলতাও ধরে রাখতে চায়, তবে তৃতীয় স্তম্ভটিতে ছাড় দিতে হবে, অর্থাৎ হয় বিনিময় হার রক্ষায় বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ থেকে টাকা খরচ করতে হবে, নয়তো টাকার অবমূল্যায়নের প্রত্যাশা জোরালো হলে পুঁজির প্রাতিষ্ঠানিক প্রবাহ ও প্রবাসী আয় অস্থিতিশীল হতে দেখতে হবে।
বলে রাখা ভালো, যদি পরিস্থিতি আশাতীত ভালোও হয়, তবু বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস তার রপ্তানি-প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশিই থেকে যাবে। অর্থাৎ টাকার ওপর অবমূল্যায়নের চাপ নিছকই একটি সম্ভাবনা নয়, প্রায় গাণিতিক অনিবার্যতা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে কেন আপস নয়
হাসিনা সরকারের সময়ে বছরের পর বছর ধরে কৃত্রিমভাবে বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে তৈরি হওয়া বৈদেশিক মুদ্রা বাজারের বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে না পেরে ক্রলিং পেগ পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নির্ধারণের চেষ্টাও হয়েছে। এতেও কাজ না হওয়ায় শেষে আইএমএফের পরামর্শে মুদ্রাকে অধিকতর বাজারভিত্তিক করার পথ বেছে নেওয়া হয়।
বর্তমান ব্যবস্থাকে আদতে একধরনের শিথিলভাবে ব্যবস্থাপিত ভাসমান (ম্যানেজড ফ্লোট) ব্যবস্থা হিসেবেই বর্ণনা করা যায়। এটি একটি অঘোষিত পরিসরের মধ্যে চলছে, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে অনানুষ্ঠানিক মৌখিক নির্দেশনা দিয়ে গ্রহণযোগ্য বিনিময় হারের সীমা বেঁধে দিচ্ছে বলে জানা যায়। এর সঙ্গে হাসিনা সরকারের আমলের গভর্নরের পদ্ধতির মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বলতেন যে বিনিময় হার 'বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে', কিন্তু বাস্তবে তা নিয়ন্ত্রণই করা হচ্ছিল।
এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক মূল্য নিয়ন্ত্রণ একই পরিণতির দিকে নিয়ে যায়, যা আগেও দেখা গেছে। ব্যাংকগুলো যখন আইনসম্মতভাবে নির্দিষ্ট হারের ওপরে লেনদেন করতে পারে না, তখন প্রবাসী আয় সহজেই আবার হুন্ডি চক্রে সরে যায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার কালোবাজার তৈরি হয়।
প্রবাসী আয়ের গল্প: একটি সতর্কবার্তা
আমাদের সাম্প্রতিক প্রবাসী আয়ের গল্প বস্তুত একটি সতর্কবার্তা। ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিদেশে শ্রমবাজার বেশ শক্তিশালী ছিল এবং রেকর্ডসংখ্যক শ্রমিক বিদেশে গিয়েছেন, তবু প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ছিল দুর্বল। কারণ, টাকার ক্রমাগত অবমূল্যায়নের কারণে অনেকেই অপ্রাতিষ্ঠানিক হুন্ডি চ্যানেলের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, টাকা স্থিতিশীল হওয়ায় এবং হুন্ডি ব্যবহারের প্রণোদনা কার্যত মুছে যাওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রবাসী আয় রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছায়। এটি আদতে একটি সতর্কবার্তা। বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় ভুল হলে তার প্রভাব শুধু রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়ের সরকারি পরিসংখ্যানেই পড়ে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রাভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে অপ্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে ঠেলে দেয়, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারির এখতিয়ারের বাইরে চলে যায়।
আলোর পথ না অন্ধকারের পথ?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রবৃদ্ধি বা মূল্যস্ফীতি নয়, বরং ব্যাপক ও গভীর আস্থার সংকট। আমাদের সামনে তাই দুটি পথ খোলা আছে, একটি আলোর, আরেকটি অন্ধকারের।
আলোর পথটি প্রাথমিকভাবে কষ্টের, কিন্তু মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে পুরোপুরি সুফলা। এ পথে তথ্যভিত্তিক নীতি গ্রহণ ও সক্রিয় তদারকির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে প্রশমিত হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয় এবং টাকা সবার জন্য সহনীয় মাত্রায় অবমূল্যায়িত হয়।
অন্য পথটি উদ্বেগময় আঁধারের। এ পথে সুদহার কমানোর পরও কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ হয় না, বিনিয়োগ যতটুকু হয়, সেটা ফেরত আসে না যথাযথভাবে। ফলে সংকটে থাকা ব্যাংকিং খাতের ব্যালান্স শিট আরও সংকটে পড়ে, খেলাপি ঋণ বাড়ে, ব্যাংকিং খাতে তারল্য-সংকট তৈরি হয়।
আমরা কি এই আঁধারের পথে? এই আঁধারের পথে হাঁটার সময় আমরা কি ভুলে যাচ্ছি, করপোরেট খাতের অতিরিক্ত ঋণভার ও সক্ষমতাগত সীমাবদ্ধতাই বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধিকে স্থবির রাখছে? এমনটা হলে বাংলাদেশ উভয়সংকটেই পড়বে, প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশিত সুফল ছাড়াই অবমূল্যায়ন চাপ ও রিজার্ভ ক্ষয়ের মুখোমুখি হতে হবে, সঙ্গে প্রবাসী আয় আবার অপ্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে ফিরে যাওয়ার প্রকৃত ঝুঁকিও থাকবে।
কীভাবে আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রানীতি বিবৃতিতে মূল্যস্ফীতিকে প্রধান উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও এর আগে ও পরের পদক্ষেপগুলো একেবারেই ভিন্ন সংকেত দিচ্ছে। পরিকল্পনাহীন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু, ঋণ-আমানতের ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধানে সীমা আরোপ এবং নীতি সুদহার হ্রাসের মতো পদক্ষেপগুলোর ফলে মুদ্রাবাজার ও জনসাধারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকৃত নীতি-অবস্থানের ধারাবাহিকতার প্রত্যাশিত গতিপথ সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা পাচ্ছে না।
বাংলাদেশের এখন সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন একটি যথাযথ 'ফরোয়ার্ড গাইডেন্স' কাঠামো। এটা মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির যথাযথ সমন্বয় নিশ্চিত করবে, যেখানে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, সম্ভাব্য পরিস্থিতি এবং এদের ওপর নীতিমালা বাস্তবায়নের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ার বিস্তারিত বিশ্লেষণ থাকবে। যে কাঠামো কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সংস্থার মধ্যে একটি সামগ্রিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রদান করবে। ফলে জ্বালানিসংকট এবং ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ ও মূলধন পর্যাপ্ততার অভাবের মতো গভীরতর কাঠামোগত সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব হবে, যা শুধু সুদহার কমিয়ে বা প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়।
১৯৭১ সালে আমরা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছি। সেই স্বাধীনতার অর্থনৈতিক মুক্তি এখনো আমাদের অর্জন করতে হবে। সেই পথে আস্থা ও স্বচ্ছতাই আমাদের প্রধান হাতিয়ার।
● জ্যোতি রাহমান ফলিত সামষ্টিক অর্থনীতিবিদ এবং পানাম ইনস্টিটিউটের চেয়ারপারসন।
● আসিফ খান একজন বিনিয়োগবিশেষজ্ঞ; পানাম ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি।