বিসিক থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ: স্বাধীনতার চেতনায় গড়ে তুলুন নিজের শিল্প
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার ৫৪ বছরের পথচলায় বাংলাদেশ আজ আত্মনির্ভরশীলতার নতুন দিগন্তে। সেই আত্মনির্ভরশীলতার পথে দেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য সুখবর নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। ৫০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ এখন সরাসরি মিলবে দেশের ৬৪টি জেলার বিসিক কার্যালয় থেকে। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হবে না, জামানত ছাড়াই দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যাবে।
বিসিকের ঋণ কর্মসূচি: মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়নের হাতিয়ার
১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর যে স্বাধীন দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে বিসিক। বর্তমানে বিসিকের তিন ধরনের ঋণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
প্রণোদনা প্যাকেজ ঋণ কর্মসূচি: করোনা-পরবর্তী সময়ে ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ১০০ কোটি টাকা নিয়ে চালু হয় এই কর্মসূচি। পরে এটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিলে রূপ নেয়। গত জুন পর্যন্ত এই তহবিলের আকার দাঁড়িয়েছে ২৭০ কোটি টাকা, যেখান থেকে ৯ হাজার ২৯১ জন উদ্যোক্তা ঋণ পেয়েছেন।
'বিনীত' ঋণ কর্মসূচি: ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে নিজস্ব অর্থায়নে চালু হওয়া এই কর্মসূচি মাত্র ১৫ কোটি টাকা দিয়ে শুরু হলেও আজ এর আকার ১৫০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। গত জুন পর্যন্ত ৮ হাজার ৮৭৩ জন এই তহবিল থেকে ঋণ পেয়েছেন।
মৌচাষি ঋণ কর্মসূচি: প্রান্তিক পর্যায়ের মৌচাষিদের জন্য ২০১৯ সাল থেকে আলাদা কর্মসূচি চালু করেছে বিসিক। এই তহবিলের আকার বর্তমানে ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, যেখান থেকে মৌচাষিরা ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ পেয়ে থাকেন। এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪৯৭ জনকে এই ঋণ দিয়েছে বিসিক।
ঋণের পরিমাণ ও অনুমোদন: কত টাকা, কীভাবে মিলবে
উদ্যোক্তারা ৫০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। বিসিকের কর্মকর্তারা জানান, শিগগিরই ঋণের এই সীমা আরও বাড়ানো হতে পারে।
ঋণ অনুমোদনের ক্ষমতা ভাগ করা হয়েছে তিন স্তরে। বিসিকের জেলা কার্যালয় সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত, আঞ্চলিক কার্যালয় ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত, আর ১০ লাখ টাকার বেশি হলে (২০ লাখ টাকা পর্যন্ত) অনুমোদন দেয় বিসিকের প্রধান কার্যালয়।
ঋণের শর্ত: জামানত ছাড়াই দুই লাখ টাকা
বিসিক থেকে দেওয়া দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সম্পূর্ণ জামানতমুক্ত। এ ক্ষেত্রে শুধু একজন জামিনদার (গ্যারান্টার) থাকলেই ঋণ পাওয়া যায়। দুই লাখ টাকার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে 'ইকুইটেবল মর্টগেজ ডিড'-এর মাধ্যমে উদ্যোক্তার নিজস্ব জমি বা বাড়ির কাগজপত্র বিসিক কার্যালয়ে বন্ধক রাখতে হয়। কোনো ব্যাংক বা তৃতীয় পক্ষের জটিলতা ছাড়া এই কাজ বিনা খরচে বিসিক কার্যালয়েই সম্পন্ন হয়। ঋণ পরিশোধের পর উদ্যোক্তা কাগজপত্র ফেরত পান।
জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২-এ বর্ণিত যেকোনো ধরনের শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠান এই ঋণের জন্য আবেদন করতে পারে। তবে নতুন উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা, বিসিক শিল্প নগরীর শিল্প প্লটের মালিক ও উদ্যোক্তা এবং রপ্তানিমুখী খাতগুলোকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
সুদের হার: ব্যাংকের তুলনায় অর্ধেকেরও কম
বিসিকের ঋণ কর্মসূচিতে সুদের হার অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সুলভ। নারী উদ্যোক্তাদের মাত্র ৫ শতাংশ সুদহারে এই ঋণ দেওয়া হয়, আর পুরুষ উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ৬ শতাংশ। এক বছর থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর মেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুবিধা রয়েছে। বর্তমানে সাধারণ ব্যাংকঋণের সুদহার ১৫ শতাংশ পর্যন্ত, অর্থাৎ ব্যাংকঋণের তুলনায় অনেক কম সুদে বিসিক থেকে ঋণ নিতে পারবেন উদ্যোক্তারা।
ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার ন্যূনতম ৩০ শতাংশ ইকুইটি এবং নারী উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ ইকুইটি নিশ্চিত করতে হবে। উদ্যোক্তার বিনিয়োগকৃত জমি, কারখানা ঘর, যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক স্থায়ী বিনিয়োগ ইকুইটি হিসেবে দেখানো যাবে। একক অথবা অংশীদারি মালিকানা উভয় ক্ষেত্রে ঋণ পেতে পারেন।
আবেদনের নিয়ম: বছরের যেকোনো সময়, ১৫ দিনে নিষ্পত্তি
উদ্যোক্তারা বছরের যেকোনো সময় বিসিকের জেলা কার্যালয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ ঋণের জন্য সরাসরি আবেদন করতে পারবেন। ঋণ আবেদনের ১৫ দিনের মধ্যে আবেদনপ্রক্রিয়া নিষ্পত্তি করার নিয়ম রয়েছে।
কে পাবেন এই ঋণ?
ঋণগ্রহীতাকে (উদ্যোক্তা) বাংলাদেশি নাগরিক হতে হবে। তিনি জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হবেন অথবা আন্তজেলায় তাঁর নিজস্ব প্রতিষ্ঠান থাকতে হবে। উদ্যোক্তার বয়স ১৮ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে হতে হবে। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ গ্রাহক হিসেবে চিহ্নিত হলে এ ঋণের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন না।
ঋণগ্রহীতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিসিক জেলা কার্যালয়, বিসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বিসিক নকশা কেন্দ্র ও বিসিক থেকে মৌমাছি পালনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বেকার যুবক ও যুব নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বাংলার অর্থনৈতিক স্বাধীনতার নতুন অধ্যায়
১৯৭১ সালে আমরা অর্জন করেছি রাজনৈতিক স্বাধীনতা। আজ সেই স্বাধীনতাকে অর্থনৈতিক মুক্তিতে রূপ দিতে বিসিকের এই উদ্যোগ এক অনন্য হাতিয়ার। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান, নিজের শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়তে চান, তাদের জন্য এই ঋণ কর্মসূচি এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। দেশের ৬৪টি জেলার বিসিক কার্যালয়ে যোগাযোগ করে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিন।