১৯৭১ সালে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন ভূমিতে আজ নিত্যপণ্যের দামে নাভিশ্বাস উঠেছে সাধারণ মানুষের। সংসার সচল রাখতে গিয়ে সঞ্চয়ের স্বপ্ন যেন ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। তবে ইতিহাস সাক্ষী, এই জাতি কখনো প্রতিকূলতায় মাথা নত করেনি। আজকের অর্থনৈতিক চাপও সেই চেতনায় মোকাবিলা করা সম্ভব, যদি আয়-ব্যয়ের হিসাব সঠিক থাকে এবং সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে ওঠে।
সংসারের খরচ বেড়েছে কতটুকু?
২০২১ সালে মাসে ৫০ হাজার টাকায় সংসার চলত আজহার হোসেনের (ছদ্মনাম)। বেতনের কিছু অংশ তিনি সঞ্চয়ও করতে পারতেন। কিন্তু কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা ও যাতায়াতের খরচ বেড়ে যাওয়ায় এখন একই সংসার চালাতে খরচ হচ্ছে ৭০ হাজার টাকার বেশি। অর্থাৎ আগের তুলনায় মাসে অন্তত ২০ হাজার টাকা বেশি খরচ, বছরে যা দাঁড়ায় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আজহারের বেতন গত পাঁচ বছরে সেই হারে বাড়েনি। ফলে এখন সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাতে হচ্ছে। কখনো কখনো অতিরিক্ত কাজ করেও আয়ের চেষ্টা করছেন তিনি। এতে তাঁর শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়ছে।
চার বছরের বেশি সময় ধরে দেশের সাধারণ গড় মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে। নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারই আগের চেয়ে বেশি খরচ করছে, কিন্তু আয় তেমন বাড়েনি।
আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখবেন যেভাবে
সংসারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রথম ধাপ হলো আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব রাখা। মাসের শুরুতে সম্ভাব্য খরচের তালিকা তৈরি করে মাস শেষে প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে মেলালে বোঝা যাবে কোন খাতে বেশি টাকা যাচ্ছে।
পরিবারের খরচ কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। নিয়মিত প্রয়োজনীয় খরচের মধ্যে রয়েছে বাসাভাড়া, খাবার, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, যাতায়াত ও সন্তানের পড়াশোনা। ব্যক্তিগত প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে চিকিৎসা, পোশাক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কেনাকাটা। বাইরে খাওয়া, বিনোদন, ঘোরাঘুরি ও তাৎক্ষণিক কেনাকাটা পরিবর্তনশীল ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত। সঞ্চয়, জরুরি তহবিল ও ঋণ পরিশোধের জন্যও অর্থ বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন।
প্রতিদিনের খরচ মুঠোফোনের নোট, খাতা বা স্প্রেডশিটে লিখে রাখা যায়। ছোট ছোট খরচ মাস শেষে বড় অঙ্কে দাঁড়ায়, তাই নিয়মিত হিসাব রাখা জরুরি।
সঞ্চয়ের দুই সূত্র: ৫০/৩০/২০ এবং ৮০/২০
বহুল আলোচিত একটি পদ্ধতি হলো ৫০/৩০/২০ নিয়ম। সাবেক মার্কিন সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ও তাঁর মেয়ে অ্যামেলিয়া ওয়ারেন তিয়াগি তাঁদের 'অল ইয়োর ওয়ার্থ: দ্য আলটিমেট লাইফটাইম মানি প্ল্যান' বইয়ে এ পদ্ধতির কথা তুলে ধরেন। তাঁদের পরামর্শ হলো কর-পরবর্তী আয়ের ৫০ শতাংশ প্রয়োজনীয় খরচে, ৩০ শতাংশ ব্যক্তিগত পছন্দের খাতে এবং ২০ শতাংশ সঞ্চয় ও ঋণ পরিশোধে বরাদ্দ রাখা।
আরেকটি পদ্ধতি হলো ৮০/২০ সূত্র। এ ক্ষেত্রে মাসের শুরুতেই আয়ের ২০ শতাংশ সঞ্চয়ের জন্য সরিয়ে রেখে বাকি ৮০ শতাংশ দিয়ে সংসার চালানো। আয় কম হলে অনুপাত পরিবর্তন করা যেতে পারে। মূল কথা হলো, মাস শেষে যা অবশিষ্ট থাকবে তা সঞ্চয় না করে শুরু থেকেই সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ জমানোর পরিকল্পনা করা।
জরুরি তহবিল কেন প্রয়োজন?
হঠাৎ চিকিৎসা, চাকরি হারানো বা আয় কমে যাওয়ার মতো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। যে দেশের অর্থনীতির ৮০ শতাংশের বেশি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের, সেখানে আর্থিক অনিশ্চয়তা বেশি। জরুরি সময়ে সঞ্চয় না থাকলে ধার বা ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা ভবিষ্যতের আয়ের ওপর চাপ তৈরি করে।
ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনায় জরুরি তহবিল গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরিবারের অপরিহার্য ব্যয়ের তিন থেকে ছয় মাসের সমপরিমাণ অর্থ আলাদা রাখার কথা বলা হয়। আয় অনিয়মিত হলে বা নির্ভরশীল সদস্য বেশি থাকলে আরও বড় তহবিল প্রয়োজন হতে পারে।
ঋণের খরচ সম্পর্কে সতর্কতা
ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া, উচ্চ সুদের ব্যক্তিগত ঋণ কিংবা কিস্তিতে কেনাকাটার দায় ভবিষ্যতের আয়ের ওপর বড় চাপ তৈরি করে। নতুন ঋণ নেওয়ার আগে কিস্তি পরিশোধের সামর্থ্য ও মোট সুদের পরিমাণ হিসাব করে দেখা উচিত।
অর্থনীতিবিদের পরামর্শ: ব্যয় কমিয়ে সঞ্চয়ের অভ্যাস রাখুন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়েমা হক বলেন, 'ব্যয় বেড়েছে ঠিক, কিন্তু সঞ্চয় যেন একেবারে বন্ধ হয়ে না যায়। কিছু টাকা হলেও নিয়মিত সঞ্চয় করতে হবে।'
তিনি বলেন, জরুরি নয় এমন খাতে ব্যয় কমানো সম্ভব। যেমন প্রতি সপ্তাহে বাইরে খেতে না গিয়ে মাসে একবার বা দুবার যাওয়া। বাসার জন্য মাল্টা না কিনে দেশীয় ফল আমড়া কেনা। প্রোটিনের ক্ষেত্রে বেশি দামের মাছের পরিবর্তে কম দামের মাছ কেনা যেতে পারে। এতে পুষ্টিমানের বিশেষ তারতম্য হবে না।
ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। ভোগের জন্য ঋণ না নেওয়াই ভালো এবং আগের ঋণের বোঝা বেশি দিন টেনে নেওয়া উচিত নয়।
স্বল্প আয়ে সঞ্চয়ের অনুপ্রেরণা: বেঙ্গালুরুর প্রুফরিডারের গল্প
স্বল্প আয়ে সঞ্চয়ের উদাহরণ হিসেবে ভারতের বেঙ্গালুরুর এক ব্যক্তির জীবনযাপনের গল্প আলোচনায় এসেছে। দ্য ইকোনমিক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫৩ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি পেশায় প্রুফরিডার। ২০০০ সালে মাত্র ৫ হাজার রুপি নিয়ে গ্রাম থেকে বেঙ্গালুরুতে আসেন তিনি। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৭ বছর।
মাসে ৪ হাজার ২০০ রুপি বেতনে কর্মজীবন শুরু করা ওই ব্যক্তির বেতন ২০২৫ সালে দাঁড়ায় ৬৩ হাজার রুপি। দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ের ফলে তাঁর ব্যাংকে জমা অর্থের পরিমাণ ১ কোটি ১ লাখ রুপি। বিনিয়োগ থেকে তাঁর মাসিক আয় ৬০ হাজার রুপি। তাঁর কোনো ঋণ নেই। ঋণ নেওয়া ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার এড়িয়ে চলা এবং নিজের খরচ সীমিত রাখার মাধ্যমে তিনি মিতব্যয়ী জীবন যাপন করেছেন।
আর্থিক স্বাধীনতা মানে কী?
সীমিত আয়ের মানুষের কাছে আর্থিক স্বাধীনতা মানে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া নয়; বরং ঋণগ্রস্ত না হওয়া, জরুরি পরিস্থিতি সামলানো এবং ভবিষ্যতের জন্য কিছু অর্থ জমাতে পারাও বড় অর্জন।
তবে ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের শৃঙ্খলাই সব সমস্যার সমাধান নয়। আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের স্থিতিশীলতা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আর্থিক নিরাপত্তার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। একজন মানুষ কতটা সঞ্চয় করতে পারবেন, তা শুধু তাঁর খরচের অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে না; বরং আয় ও পারিবারিক দায়িত্বের বাস্তবতার ওপরও নির্ভর করে।
স্বাধীনতার ৫৩ বছরে আমরা বহু সংকট কাটিয়ে এসেছি। অর্থনৈতিক এই চ্যালেঞ্জও আমাদের সামর্থ্য ও দৃঢ়তায় কাটিয়ে উঠব, এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
