খাগড়াছড়ির পানছড়িতে এক নারী শিক্ষকের আত্মকর্মসংস্থানের গল্প এখন সবার জন্য অনুপ্রেরণা। করোনার সংকটে চাকরি হারানোর শঙ্কা থেকে শুরু করে নিজের হাতে গড়ে তোলা নার্সারি আজ তাকে এনে দিচ্ছে বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকা আয়। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেমন আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল, তেমনি এই নারীর আত্মপ্রত্যয়ও দেখায় সত্যিকারের মুক্তি আসে আত্মনির্ভরতা থেকে।
করোনার সংকট থেকে কীভাবে শুরু হলো নার্সারির পথচলা?
৩১ বছর বয়সী ম্রানুচিং মারমা পেশায় একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ২০২০ সালের মাঝামাঝি করোনা মহামারির কারণে স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে তিনি বেতন পাননি। সংসার চালাতে ছোট শিশুদের টিউশনি করালেও একসময় সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। এই কঠিন সময়ে তিনি আমবাগান করার পরিকল্পনা করেন।
বাজারে চারা কিনতে গিয়ে দাম বেশি হওয়ায় তিনি কিনতে পারেননি। তখনই নিজেই চারা তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে আমের আঁটি সংগ্রহ করে বাড়ির পাশে লাগানো শুরু করেন। এভাবেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তাঁর নার্সারি।
সংগ্রামের ফসল: এক একর জমিতে ৫০ হাজার চারা
শুধু আঁটি থেকে চারা সংগ্রহ নয়, ধীরে ধীরে কলম পদ্ধতিতেও চারা উৎপাদন শিখে ফেলেন ম্রানুচিং। বর্তমানে তাঁর এক একরের একটি নার্সারিতে আম ছাড়াও লিচু, পেয়ারা, লটকন ও বারোমাসি কাঁঠালের চারা রয়েছে। সব মিলিয়ে সেখানে ৫০ হাজার চারা। চলতি বছর চারা বিক্রি করে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা আয়ের আশা তাঁর।
জাতভেদে আমের চারা ৪০ থেকে ৩০০ টাকা দামে বিক্রি করেন তিনি। নিজেদের জায়গায় নার্সারি হওয়ায় খরচ কম। জৈব সার হিসেবে ব্যবহৃত গোবরও এলাকায় কম দামে পাওয়া যায়। এছাড়া 'গ্রিন কেয়ার নার্সারি' নামে একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে অনলাইনেও চারা বিক্রি করেন তিনি।
নারী উদ্যোক্তার স্বপ্ন ও অন্যের জন্য অনুপ্রেরণা
ম্রানুচিং বলেন, তাঁর স্বপ্ন নার্সারিটিকে আরও বড় করা। তাঁকে দেখে যেন অন্য নারীরাও এগিয়ে আসেন, এটিই তাঁর চাওয়া। প্রতিদিন সকালে নার্সারিতে যান, পরিচর্যার কাজ শেষে স্কুলে যান। স্কুল ছুটির পর আবার নার্সারিতে ফিরে আসেন। ছুটির দিনের পুরোটাই কাটে নার্সারিতে।
পানছড়ির একটি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রোমিতা দেওয়ান ম্রানুচিংয়ের নার্সারি থেকে চারা কিনে সন্তুষ্ট। তিনি বলেন, 'চার বছর আগে বিভিন্ন জাতের ১০০টি চারা কিনে লাগিয়েছিলাম। এ বছর সব গাছে আম ধরেছে। আমের জাতও ভালো। আবার নতুন চারা কিনতে এসেছি।'
পানছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুস সালাম বলেন, ম্রানুচিং মারমার চারা উৎপাদনের বিষয়টি সবার জন্য অনুপ্রেরণা। কৃষি বিভাগের কাছে সহযোগিতা বা পরামর্শ চাইলে তাঁকে তা দেওয়া হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই সাফল্যের মন্ত্র কী?
ম্রানুচিংয়ের চারার বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। শিক্ষক স্বামী উচিমং মারমার কাছ থেকে দেখে দেখে প্রাথমিকভাবে চারা তৈরি শিখেছেন। এরপর নিজে নিজেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাকিটা শিখেছেন। তাঁর মতে, ভালো চারা উৎপাদনের মূলমন্ত্র হলো নিজের হাতে কাজ করা। চারা রোপণ থেকে শুরু করে প্যাকেট করা, সবকিছুই একসময় নিজ হাতে করতেন।
মুক্তির বার্তার দৃষ্টিতে এই সাফল্যের গুরুত্ব কী?
১৯৭১ সালে আমরা যেমন রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তেমনি অর্থনৈতিক মুক্তিও অর্জন করতে হবে নিজের শ্রম ও মেধা দিয়ে। ম্রানুচিং মারমার এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের শক্তি অপরিসীম। পাহাড়ের এই নারী শিক্ষক আজ দেখিয়ে দিচ্ছেন, স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করলে কোনো সংকটই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
