একটি বাছুর থেকে স্বাবলম্বী: শেরপুরের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর আত্মনির্ভরতার গল্প
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার বাগমারা গ্রামের বোধন মাহাতো ও তাঁর পরিবারের জীবন বদলে দিয়েছে একটি ছোট্ট বকনা বাছুর। চার বছর আগে সরকারি সহায়তায় পাওয়া সেই বাছুরটি আজ তাদের সংসারে নিয়ে এসেছে আয়, স্বপ্ন এবং আত্মনির্ভরতার নতুন অধ্যায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেমন আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল, তেমনি এই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পরিবারগুলোর জন্য সরকারি এই উদ্যোগ হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক মুক্তির পথ।
কীভাবে শুরু হলো পরিবর্তনের যাত্রা?
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার শাহবন্দেগি ইউনিয়নের বাগমারা গ্রামের বোধন মাহাতো (৩৫) আগে কখনো নিজের জমিতে কাজ করতেন, কখনো অন্যের জমিতে দিনমজুরি। কাজ মিললে ঘরে আসত টাকা, না মিললে ফিরতে হতো খালি হাতে। অভাবের সংসারে তখন চুলা জ্বালানোই কঠিন হয়ে পড়ত।
চার বছর আগে বোধন ও তাঁর স্ত্রী অনিতা রানী মাহাতো (২০) সরকারি সহায়তায় একটি বকনা বাছুর পান। সেই বাছুরটি যত্নে লালনপালন শুরু করেন তাঁরা। আজ সেই বাছুরটি বড় হয়েছে এবং ইতিমধ্যে তিনটি বাছুর দিয়েছে। দুটি এঁড়ে বাছুর আট মাস বয়সে বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে আরেকটি গাভি কিনেছে পরিবারটি। এখন গরু পালন থেকে নিয়মিত আয় আসে। পাশাপাশি বোধন একটি অটোরিকশাও কিনেছেন। অনিতা গরুর যত্নের পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজ করে মাসে প্রায় চার হাজার টাকা আয় করেন।
আগে সংসারে অভাব লেগেই থাকত। এখন গরু আছে, আয় আছে। স্বপ্ন দেখি, একদিন বাড়িতেই গরুর খামার করব। সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়াব।
অনিতা রানী মাহাতো, গৃহবধূ, শেরপুর, বগুড়া
শুধু একটি পরিবার নয়, বদলাচ্ছে গোটা গ্রামের চিত্র
শুধু বোধন-অনিতার পরিবার নয়, বাগমারা ও পাশের হাতিগাড়া গ্রামের আরও কয়েকটি পরিবার সরকারি সহায়তায় পাওয়া বকনা বাছুর থেকে নিজেদের ভাগ্য বদলের চেষ্টা করছেন।
বাগমারা গ্রামের সুধন মাহাতোর (৩৬) স্ত্রী তাপসী মাহাতো (২৭) গোয়ালঘরে একটি গাভির যত্ন নিচ্ছেন। গত বছর সরকারি সহায়তায় পাওয়া বকনা বাছুরটি ইতিমধ্যে একটি বাছুর দিয়েছে। প্রতিদিন প্রায় তিন লিটার দুধ পাওয়া যায়। এক লিটার পরিবারের জন্য রেখে বাকি দুই লিটার বিক্রি করেন তাঁরা।
দুধ বিক্রি করে যে টাকা পাই, তা সংসারের কাজে লাগে। আশা করছি, এই গরু থেকেই আরও গরু হবে।
তাপসী মাহাতো, গৃহবধূ, বাগমারা, শেরপুর
নিমাই চন্দ্র মাহাতোর (৭০) বাড়িতে বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে গিয়ে দেখা যায়, কিছুক্ষণ আগেই বাড়ির গাভিটি একটি এঁড়ে বাছুরের জন্ম দিয়েছে। এক বছর আগে সরকারি সহায়তায় বকনা বাছুরটি পেয়েছিল পরিবারটি। সেটিই বড় হয়ে এখন বাছুর দিয়েছে।
পাশের হাতিগাড়া গ্রামের দয়াল তাঁতি (২৮) ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাওয়া বাছুরটি বড় করছেন। তাঁর ইচ্ছা, এই বাছুর থেকেই একদিন পাঁচটি গরু করবেন।
গরু বিক্রি করে জমি ইজারা: শিখা বালার ভিন্ন গল্প
একই গ্রামের শিখা বালা তাঁতির (৪০) গল্প একটু ভিন্ন। চার বছর আগে পাওয়া বকনা বাছুরটি বড় হয়। পরপর দুই বছর দুটি এঁড়ে বাছুর দেয়। পরে গাভিটি অসুস্থ হয়ে পড়লে গাভি ও দুটি বাছুর বিক্রি করেন তিনি। সেই টাকা দিয়ে আড়াই বিঘা জমি ইজারা নিয়েছেন। এখন ওই জমিতে ধান করে বছরে প্রায় ৬০ হাজার টাকা আয় করছেন।
সরকারি উদ্যোগে কতটি বাছুর বিতরণ হয়েছে?
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পরিবারের মধ্যে ৪৪টি বকনা বাছুর বিতরণ করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেওয়া হয়েছে ৪৬টি বকনা ও ৫০টি এঁড়ে বাছুর।
শেরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নিয়ায কাযমীর রহমান বলেন, অনগ্রসর ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক ও জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যেই এসব বাছুর বিতরণ করা হয়েছে। বাছুর দেওয়ার পর পরিবারগুলোকে চিকিৎসা ও পালনসংক্রান্ত পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, সরকারি সহায়তা প্রকল্পের মাধ্যমে পাওয়া বাছুর লালনপালন করে পরিবারগুলো স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে।
একটি বাছুর, অসংখ্য স্বপ্ন
একটি ছোট বকনা বাছুর দিয়ে শুরু। কারও ঘরে বেড়েছে গরু, কেউ দুধ বিক্রি করে আয় করছেন। আবার কেউ গরু বিক্রি করে জমি ইজারা নিয়েছেন। বোধন মাহাতোর পরিবারের মতো কয়েকটি পরিবারের কাছে সেই বাছুর এখন শুধু একটি গরু নয়; সংসারে আয়ের নতুন পথ।
১৯৭১ সালে আমরা যেমন অস্ত্রের মাধ্যমে মুক্তি পেয়েছি, আজ এই পরিবারগুলো অর্থনৈতিক মুক্তির পথে হাঁটছে। স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ এই আত্মনির্ভরতার গল্প আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণা। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, প্রতিটি সংগ্রামেই আমরা প্রমাণ করেছি, আমরা পারি। এই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পরিবারগুলোর সাফল্যও সেই চেতনারই প্রতিফলন।