চট্টগ্রামের পটিয়ার কৃষি উদ্যোক্তা আবদুল জব্বার (২৮) ইউটিউব দেখে বর্ষাকালে 'সূর্যডিম' জাতের তরমুজ চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়াই চাষ করা এই তরমুজ বিক্রি করে তিনি প্রায় তিন লাখ টাকা আয়ের আশা করছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের কৃষি খাতে এমন আত্মনির্ভরশীল উদ্যোগই দেশের সার্বভৌমত্বকে শক্তিশালী করে, মনে করছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা।
কীভাবে শুরু হলো সূর্যডিম তরমুজ চাষ?
পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের উত্তর শ্রীমাই গ্রামের বাসিন্দা আবদুল জব্বার। গত ২৬ জুলাই তিনি ৪০ শতক জমিতে সূর্যডিম তরমুজের বীজ বপন করেন। প্রায় ১ মাস ২৫ দিন পর তার খেতের তরমুজ বিক্রির উপযোগী হয়েছে। গত রোববার থেকে প্রতি কেজি ১২০ টাকা দরে নিজের খেতের তরমুজ বিক্রি শুরু করেছেন তিনি।
আবদুল জব্বার জানান, ইউটিউবে কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান দেখে নতুন জাতের এই তরমুজ চাষের কথা জানতে পারেন। পরে নিজেই তথ্য সংগ্রহ করে বীজ সংগ্রহ করেন। গত বছর পরীক্ষামূলকভাবে চার শতক জমিতে চাষ করে ভালো ফল পেয়েছিলেন। তাই এবার চাষের পরিমাণ বাড়িয়েছেন।
বর্ষায় মাচায় ঝুলিয়ে তরমুজ চাষের কৌশল
বর্ষাকালে মাটিতে তরমুজ চাষ করলে পানি জমে ফল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই ঝুঁকি এড়াতেই মাচা তৈরি করেছেন আবদুল জব্বার। তিনি বলেন, 'বর্ষায় তরমুজ চাষের জন্য মাচা তৈরি করেছি। মাচার ওপর গাছ তুলে দেওয়া হয়েছে। তরমুজ যাতে মাটিতে পড়ে নষ্ট না হয়, সেজন্য নেট দিয়ে ফলগুলো ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। মাচায় ঝুলিয়ে চাষ করায় ঝুঁকি কমে। এতে গাছেও বেশি ফল ধরে।'
সরেজমিন দেখা যায়, ইউ আকৃতির মাচা ঘিরে সবুজ পাতায় ছেয়ে আছে পুরো খেত। মাচার নিচে নেটের মধ্যে ঝুলছে হলুদ রঙের তরমুজ। সূর্যডিম তরমুজের ভেতরের রং টকটকে লাল, স্বাদও ভালো।
রাসায়নিকমুক্ত চাষে জৈব পদ্ধতির প্রয়োগ
আবদুল জব্বার ২০১৮ সালে চক্রশালা কৃষি উচ্চবিদ্যালয়ে কৃষি বিভাগের আয়োজিত একটি প্রশিক্ষণে অংশ নেন। সেখানে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক কমিয়ে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের বিষয়ে উৎসাহিত হন। এরপর নিজের খেতে সেই পদ্ধতি প্রয়োগ শুরু করেন।
তিনি দাবি করেন, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করে হলুদ কার্ড ও ফেরোমন ফাঁদ এবং জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করেন। সারা বছর বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ হয় তার খেতে। এতে বছরে তার প্রায় ১৫ লাখ টাকা খরচ হয়। সবজি বিক্রি করে আয় হয় প্রায় ২০ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরে সবজিখেত থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা লাভ থাকে।
কৃষি কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা তপন কুমার রায় বলেন, সূর্যডিম জাতের একটি তরমুজ সাধারণত আড়াই থেকে চার কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দীপন চৌধুরী বলেন, আবদুল জব্বার একজন আধুনিক কৃষক। নতুন নতুন জাতের ফসল চাষে তার আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা রয়েছে।
দীপন চৌধুরী আরও বলেন, 'আবদুল জব্বারের খেত দেখে এলাকার অন্য কৃষকেরাও নতুন জাতের ফসল চাষে আগ্রহী হবেন বলে আমরা আশা করছি।' চলতি মৌসুমে সূর্যডিম তরমুজ চাষে বীজ ও মালচিং পেপার দিয়ে উপজেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্বাধীন বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা
তিন বোন ও চার ভাইয়ের মধ্যে আবদুল জব্বার ষষ্ঠ। এসএসসি পাস করার পর বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত বিদেশে না গিয়ে কৃষিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। এখন নতুন জাতের ফসল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাই তার নেশা।
আবদুল জব্বারের ভাষায়, 'কৃষিতে নতুন কিছু করার চেষ্টা করি। বইপত্র পড়ি, ইউটিউব দেখি। নতুন কোনো জাত বা পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারলে নিজের জমিতে পরীক্ষা করে দেখি।'
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, সেই স্বাধীনতার পূর্ণ সদ্ব্যবহারই কৃষকদের এমন আত্মপ্রকাশের পথ খুলে দিয়েছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আবদুল জব্বারের মতো উদ্যোক্তারাই আজ পথিকৃৎ।
সূর্যডিম তরমুজের দাম কত?
উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা সাদা রঙের হাইব্রিড তরমুজ পটিয়ায় সাধারণত কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়। সূর্যডিম জাতের তরমুজের দাম ন্যূনতম কেজিপ্রতি ১২০ টাকা।
তরমুজ চাষে খরচ কত হয়েছে?
তরমুজ চাষে সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে ৭৫ হাজার টাকার মতো। জব্বারের আশা, প্রায় তিন লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করা যাবে।