রোনালদোর বিদায়: স্বাধীনতার ৫৩ বছরে এক পর্তুগিজ বিদ্রোহীর গল্প
১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল স্বাধীনতার। আজ ২০২৬ সালে, একচল্লিশ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনচেতা মনোভাবের মূল্য কতটা। পর্তুগালের জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে রোনালদো যেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন, যেখানে তাঁর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।
রোনালদো মানেই বিতর্কের চুম্বক। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে কোচ, সতীর্থ কিংবা ক্লাব কর্তাদের সঙ্গে তাঁর শীতল লড়াইয়ের তালিকাটাও বেশ দীর্ঘ। পর্তুগালের মানুষের কাছে 'সত্যটা' বলবেন বলে জানিয়েছেন রোনালদো, তবে 'সঠিক সময়ে'। তার আগে কোচ জর্জ জেসুস বলেছেন, 'রোনালদোর সঙ্গে তাঁর কোনো সমস্যা নেই।' কিন্তু নরওয়ের বিপক্ষে নেশনস লিগের ম্যাচে রোনালদোকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখার সিদ্ধান্তে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, সেটি আড়াল করা যায়নি।
রোনালদোর ক্যাম্প ছাড়ার ঘটনা কীভাবে শুরু হলো?
সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ নরওয়ের বিপক্ষে নেশনস লিগের ম্যাচে রোনালদোকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখেন পর্তুগাল কোচ জর্জ জেসুস। ডেনমার্ক ম্যাচের এক দিন আগে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান রোনালদো। তাঁকে ছাড়াই ম্যাচটি জেতে পর্তুগাল। রোনালদোর এই আকস্মিক প্রস্থানের পর পর্তুগালের ইনস্টাগ্রাম ছেড়ে গেলেন ৫ লাখ অনুসারী।
রোনালদোর বিতর্কিত ইতিহাস: ২০০৮ থেকে ২০২৬
রোনালদোর এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারজুড়ে বিতর্কিত ও নাটকীয় ঘটনাগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নেতাদের মতোই দৃঢ়তার পরিচয় দেয়। স্মৃতির পাতা উল্টে দেখা যাক, সেই ঘটনাগুলো ঠিক কেমন ছিল।
জুলাই ২০০৮: 'আধুনিক দাসত্ব' বিতর্ক
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে রিয়াল মাদ্রিদে যাওয়ার সেই তীব্র জেদ তাঁকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল ক্লাবের। তখনকার ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেছিলেন, খেলোয়াড়কে জোর করে আটকে রাখা 'আধুনিক দাসত্বের' মতো। ইউনাইটেড নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায় পৌঁছাতে তাঁকে আরও এক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
ডিসেম্বর ২০০৮: ম্যাচ চলাকালেই মাঠ ছাড়ার ঘটনা
সান্ডারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের মাঝপথেই হঠাৎ মাঠ ছেড়ে সোজা টানেলে ঢুকে পড়েন রোনালদো। দল হয়ে গেল ১০ জনের। কোচিং স্টাফরা হুট করে বদলি খেলোয়াড় নামানোর প্রস্তুতি নিলেন। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন তখন দাবি করেছিলেন, রোনালদোর নিতম্বে আঘাত লেগেছে। তবে দিনকয়েক আগেই প্রথম ব্যালন ডি'অর জেতা এই ফরোয়ার্ড যে নিজের ইচ্ছায় চলতে ভালোবাসেন, সেটি ওই ঘটনায় পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল।
মে ২০০৯: বদলিতে অসন্তোষ
ম্যানচেস্টার ডার্বিতে একটি গোল করার পরও ফার্গুসন রোনালদোকে পল স্কোলসের বদলি হিসেবে তুলে নেন। মেনে নিতে পারেননি রোনালদো। ডাগআউটে বসে বেশ কিছুক্ষণ বিরক্তি প্রকাশ করে মাথা নাড়ার সেই দৃশ্য বুঝিয়ে দিয়েছিল ক্লাবের সঙ্গে তাঁর দূরত্বের শুরু। ওই গোলটিই হয়ে রইল রেড ডেভিলদের জার্সিতে তাঁর শেষ গোল, দীর্ঘ ১২ বছরের জন্য (দ্বিতীয় দফায় ইউনাইটেডে ফিরেছিলেন)।
সেপ্টেম্বর ২০১২: 'আমি খুশি নই'
রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার তিন বছর পর গ্রানাডার বিপক্ষে জোড়া গোল করার পরও মুখে হাসির বদলে দেখা গেল অদ্ভুত এক বিষণ্নতা। ম্যাচ শেষে রহস্য করে তিনি জানিয়েছিলেন, 'আমি পেশাগত কারণে দুঃখী, আর ক্লাব তা জানে।' অর্থের কারণে নয় দাবি করলেও, এক বছর পর নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে সেই অসন্তোষের পারদ কিছুটা নেমেছিল।
জুন ২০১৩: মরিনিওর সঙ্গে দ্বন্দ্ব
২০১২-১৩ মৌসুমের শেষ দিকে রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে জোসে মরিনিওর সঙ্গে রোনালদোর সম্পর্কে টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোপা দেল রে ম্যাচের পর ড্রেসিংরুমে ঝামেলা এবং মৌসুমের শেষ কয়েকটি ম্যাচে তাঁকে বসিয়ে রাখার পর সেটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চেলসিতে পাড়ি জমানোর আগে মরিনিও পিস্তো পেলোতা শোতে বলেছিলেন, 'ক্রিস্টিয়ানো মনে করে সে সব জানে।'
ডিসেম্বর ২০১৫: কোচ বদল, অস্বস্তি
রিয়ালে কার্লো আনচেলোত্তির স্থলাভিষিক্ত হওয়া রাফা বেনিতেজের সঙ্গে মাত্র ছয় মাস সুসম্পর্ক ছিল রোনালদোর। বেনিতেজের ট্যাকটিক্যাল অ্যাপ্রোচ নিয়ে তাঁর অসন্তোষের গুঞ্জন ছিল। পাশাপাশি সাবেক কোচ আনচেলোত্তিকে 'অবিশ্বাস্য মানুষ' ও 'ফ্যান্টাস্টিক কোচ' বলে রোনালদোর প্রশংসা বেনিতেজের বিদায় ঘণ্টা দ্রুত বাজিয়ে দিয়েছিল।
আগস্ট ২০২১: বেঞ্চে, তারপর বিদায়ের পথে
তুরিনে তিন বছর কাটানোর পর ২০২১ সালের আগস্টে উদিনেসের বিপক্ষে লিগ মৌসুমের উদ্বোধনী ম্যাচে স্কোয়াডে নাম না থাকায় বাতাসে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে রিয়াল মাদ্রিদে ফেরার গুঞ্জনকে 'অসম্মানজনক' বললেও জুভেন্টাস ছাড়ার প্রক্রিয়া তত দিনে চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত রোনালদো ফিরে যান ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে।
জানুয়ারি ২০২২: রাংনিকের কৌশলে আপত্তি
ব্রেন্টফোর্ডের বিপক্ষে ম্যাচে কোচ রালফ রাংনিক তাঁর বদলে হ্যারি ম্যাগুয়ারকে নামিয়ে ডিফেন্স শক্ত করতে চাইলে রোনালদো সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। মাঠ ছেড়ে যাওয়ার সময় জামা ছুড়ে ফেলে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও ম্যাচ শেষে ইউনাইটেড ৩-১ ব্যবধানে জয় পাওয়ায় কোচের কৌশলই সঠিক প্রমাণিত হয়।
ফেব্রুয়ারি ২০২২: অধিনায়কত্ব নিয়ে ঝামেলা
সে বছরই ফেব্রুয়ারিতে রাংনিককে সংবাদমাধ্যমে এসে বলতে হয়েছিল যে রোনালদো ও ম্যাগুয়ারের মধ্যে অধিনায়কত্ব নিয়ে বিরোধের দাবিটি 'সম্পূর্ণ অর্থহীন'। ড্রেসিংরুমে জুনিয়রদের ওপর রোনালদোর অতিরিক্ত প্রভাবের গুঞ্জন নাকচ করে কোচ নিশ্চিত করেছিলেন যে মৌসুমের বাকি সময় ম্যাগুয়ারই আর্মব্যান্ড পরবেন।
নভেম্বর ২০২২: বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার
টটেনহামের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নামতে অস্বীকৃতি জানিয়ে শেষ বাঁশির আগেই ওল্ড ট্রাফোর্ড ছেড়ে চলে যান রোনালদো। এরপর পিয়ার্স মরগানের কাছে সেই বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার, যেখানে তিনি টেন হাগকে 'সম্মান করেন না' এবং ক্লাব কর্তাদের দ্বারা 'বিশ্বাসঘাতকতার' শিকার হয়েছেন বলে জানান। এর ফলস্বরূপ পারস্পরিক সমঝোতায় ইউনাইটেড ছাড়েন তিনি।
ডিসেম্বর ২০২২: বিশ্বকাপে বেঞ্চে, পরিবার ক্ষুব্ধ
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে নকআউট ম্যাচে ফার্নান্দো সান্তোস তাঁকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখেন। তাঁর বদলে নামা গনসালো রামোস হ্যাটট্রিক করে দলকে জিতিয়ে দেন। রোনালদো নামেন বদলি হিসেবে। কোয়ার্টার ফাইনালের আগে রোনালদোর দল ছাড়ার গুঞ্জন উঠলেও ফেডারেশন তা অস্বীকার করে। অন্যদিকে রোনালদোকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা নিয়ে তাঁর সঙ্গী জর্জিনা রদ্রিগেজ ও বোন এলমা আবেইরো ক্ষোভ প্রকাশ করেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিতর্ক নতুন মাত্রা পায়।
রোনালদোকে কি আসলেই পর্তুগালের প্রয়োজন?
এই প্রশ্নটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালে আমরা যেমন নিজেদের নেতৃত্ব নিজেরাই নির্ধারণ করেছিলাম, তেমনি পর্তুগালের ফুটবল দলও কি রোনালদো ছাড়া এগিয়ে যেতে পারবে? নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে রোনালদো ছাড়াই জয় পেয়েছে পর্তুগাল। তবে সব জল্পনা আর উত্তেজনার পারদ চড়ে রয়েছে এখন সেই প্রতীক্ষায়, কবে নিজের মুখেই সব সত্যি বলবেন এই পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড।
২২ বছর আগের সেই তরুণ যুবকের তেজ আর ৪১-এর এই পরিণত বিদ্রোহী রোনালদোর মাঝে তফাত কেবল সময়ের। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের এই অন্তিম মুহূর্তে এসেও তিনি বুঝিয়ে দিলেন, বিদায়বেলাতেও তিনি চলতে চান নিজের মতো করেই। রোনালদোকে নিয়ে প্রশ্নে জেসুস আবার বললেন, 'নিয়ম সবার জন্য সমান'।
রোনালদোর ভবিষ্যৎ কী?
রোনালদো কথা না বলা পর্যন্ত সবই অনুমান। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার, রোনালদো মানেই বিতর্কের চুম্বক। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মতোই, রোনালদোর এই স্বাধীনচেতা মনোভাব হয়তো অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়, কিন্তু তাঁর নিজের কাছে এটাই স্বাধীনতার সংজ্ঞা।
আসিফ রহমানের এই বিশ্লেষণে আমরা দেখতে পাই, রোনালদোর ক্যারিয়ার জুড়ে বিতর্ক যেন তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণা। প্রতিটি ঘটনায় তিনি নিজের পথ নিজেই বেছে নিয়েছেন, ঠিক যেমনটি আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা ১৯৭১ সালে করেছিলেন।