২০২৬ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে লাহোরে সাংবাদিকদের এক ঐতিহাসিক সভার পরদিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি জাল এমআই৬ নথিসহ ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়ে। জাল নথিতে মুনিজা জাহাঙ্গীর, ফারহাতুল্লাহ বাবর ও হামিদ মীরকে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬-এর এজেন্ট হিসেবে দাবি করা হয়।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ভুয়া প্রচারণার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানে গণমাধ্যমের ভয়াবহ অবস্থা নিয়ে লিখেছেন দেশটির খ্যাতিমান সাংবাদিক হামিদ মীর। তাঁর বক্তব্য, পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।
মৃত্যুর ছায়ায় গণমাধ্যম
পাকিস্তানের অন্যতম সুপরিচিত সাংবাদিক মাজহার আব্বাসের নতুন বইয়ের নাম 'মিডিয়া আন্ডার দ্য শ্যাডো অব ডেথ' অর্থাৎ মৃত্যুর ছায়ায় গণমাধ্যম। বইয়ের প্রচ্ছদেই চিত্রটি স্পষ্ট: কলম ও ক্যামেরা হাতে সাংবাদিকেরা সেন্সরশিপের কারাগারে বন্দী।
কয়েক দিন আগে ইসলামাবাদে বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়। সেখানে সঞ্চালনা করেছিলেন উপস্থাপক আবসা কোমল, যাঁকে কয়েকদিন আগেই বেতন-না-দেওয়ার প্রতিবাদ করার কারণে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। পাকিস্তানে চাকরি হারানো বা পর্দায় নিষিদ্ধ হওয়া সাংবাদিকদের জন্য নতুন কিছু নয়।
একাত্তরের সাংবাদিকতার স্মৃতি বহন করি যেমন
১৯৭১ সালে বাংলার সাংবাদিকেরা সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে জীবন দিয়েছেন; সাংবাদিকতার স্বাধীনতা আমাদের জাতীয় চেতনার অংশ। সেই চেতনা থেকেই পাকিস্তানে আজ যা ঘটছে, তা আমাদের গভীরভাবে স্পর্শ করে। পাকিস্তান আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ ছিল, আর সেই রাষ্ট্রের গণমাধ্যম আজ নিজেই মুক্তির লড়াইয়ে নামতে বাধ্য হয়েছে।
হামিদ মীর জানান, ২০১২ সালে সহকর্মী আবসার আলমকে নিয়ে তিনি পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিলেন। পরে মাজহার আব্বাস, আসমা শিরাজি এবং কেনিয়ায় রহস্যজনকভাবে নিহত প্রয়াত আরশাদ শরিফও আবেদনকারী হন। তাঁরা তথ্য মন্ত্রণালয়ের গোপন তহবিল বিলুপ্তি এবং আবাসন ব্যবসায়ী মালিক রিয়াজের সাংবাদিকদের দেওয়া সুযোগ-সুবিধা প্রকাশের দাবি জানান। সেই গোপন তহবিল সাংবাদিকদের ঘুষ দিতে ব্যবহৃত হতো।
বছরের পর বছর শতাধিক শুনানির পর সুপ্রিম কোর্ট গোপন তহবিলের অর্থছাড়া বন্ধ করে এবং ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের জন্য একটি আচরণবিধি তৈরি করে। ২০১৫ সালে পেমরা তা কার্যকর করে। কিন্তু হামিদ মীরের ভাষায়, আচরণবিধি কোনো দিন বাস্তবায়িত হয়নি।
মোশাররফের সামরিক শাসনের চেয়েও খারাপ
বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কেন হামিদ মীর বলেছেন বর্তমান পরিস্থিতি জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সামরিক শাসনের চেয়েও খারাপ। তাঁর উত্তর: মোশাররফের আমলে মাত্র পাঁচজন উপস্থাপকের ওপর কয়েক মাসের নিষেধাজ্ঞা ছিল। অথচ আজকের তথাকথিত গণতান্ত্রিক আমলে ১৫ জন উপস্থাপক পর্দা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। জনপ্রিয় উপস্থাপক কাশিফ আব্বাসিকে এক বছর ধরে এআরওয়াই টেলিভিশনে দেখা যাচ্ছে না।
২০২১ সালে ইমরান খানের সরকার হামিদ মীরকে ৯ মাসের বেশি সময়ের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সেই রেকর্ডও ভেঙে দিয়েছে। আগে শুধু সরকার বা এমকিউএম গণমাধ্যমকে হুমকি দিত; এখন রাষ্ট্রবহির্ভূত শক্তি ও কিছু সন্ত্রাসী সংগঠনও সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে সক্রিয়।
প্রদেশে প্রদেশে নির্যাতনের চিত্র
লাহোরের সভায় মুনিজা জাহাঙ্গীরের আয়োজনে যোগ দিয়েছিলেন বিভিন্ন প্রদেশের সাংবাদিক নেতারা। কোয়েটা থেকে আসা সেলিম শহীদ জানান, প্রধান টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্রগুলো বেলুচিস্তানে কার্যালয় বন্ধ করছে; অনেক জেলা গণমাধ্যমের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা।
করাচি ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টসের সভাপতি তাহির হাসান বলেন, করাচি প্রেসক্লাবের বাইরে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের শনাক্ত করতে চারপাশে ক্যামেরা বসানো হয়েছে। খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে ৩০ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন; পেশোয়ার প্রেসক্লাবে হয়েছে আত্মঘাতী বোমা হামলা। পাঞ্জাব ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টসের মহাসচিব কামার ভাট্টির দাবি, প্রদেশটির ৬০ শতাংশ সাংবাদিক বেকার এবং পরিস্থিতি সামরিক শাসনামলের চেয়েও খারাপ।
গিলগিট থেকে আসা ইসরারউদ্দিন ইসরার বলেন, গিলগিট-বালটিস্তানে ইন্টারনেট নেই, অথচ টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ওই অঞ্চলের খবরই প্রচার করে না। পাকিস্তান ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টসের মহাসচিব আরশাদ আনসারি পেকা আইন, ২০২৫-কে কালো আইন আখ্যা দিয়ে ঘোষণা করেন, গণমাধ্যমকে বাঁচাতে সাংবাদিকেরা শিগগির রাজপথে নামবেন। কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার ভিডিও সংযোগে আশ্বাস দেন, আইনটি ভুয়া খবর ছড়ানো ব্যক্তি ও সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হবে।
এমআই৬ ভুয়া নথি কেন ছড়ানো হলো
সভার পরদিনই ছড়ানো হয় জাল এমআই৬ নথির ভুয়া খবর, যেখানে দাবি করা হয় ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের নির্দেশে লাহোরের সভা হয়েছিল। ক্ষমতাসীনদের সমর্থকেরা 'লন্ডনের মনিবদের' ইঙ্গিত দেন। এই প্রচারণা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে; তাঁরা জানতে চাইছেন, পাকিস্তানে এমআই৬ কেন আক্রমণের লক্ষ্য।
হামিদ মীরের কটাক্ষপূর্ণ জবাব: এমআই৬-এর এজেন্ট কারা, খুঁজে বের করুন, তবে নামগুলো জানিয়ে দিন। এজেন্টরা যদি গণমাধ্যমকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে চান, তাঁদের ধন্যবাদ জানাতে চাই আমরা। তিনি মনে করিয়ে দেন, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সবসময় মুক্ত সংবাদমাধ্যমের পক্ষে ছিলেন; ১৯৪৭ সালের আগে রাষ্ট্রদ্রোহে অভিযুক্ত সাংবাদিকদের পক্ষে আইনজীবী হয়ে আদালতে দাঁড়িয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক সূচকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা থেকে আইনের শাসন, সুশাসন থেকে গণতন্ত্র, সব ক্ষেত্রেই পাকিস্তানের অবস্থান এখন তলানিতে। মাজহার আব্বাসের বই শুধু সংবাদমাধ্যমের নয়, বিচার বিভাগ ও সংসদের স্বাধীনতা হারানোরও এক শোকগাথা।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা
আমাদের জন্য এই পরিস্থিতির শিক্ষা স্পষ্ট। যে রাষ্ট্র ১৯৭১ সালে বাংলার কণ্ঠস্বর চেপে ধরতে চেয়েছিল, সেই রাষ্ট্রের নিজের কণ্ঠই আজ বন্দী। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা কোনো বিলাসিতা নয়; জাতীয় সার্বভৌমত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রবাসে আমাদের ভাষার সাংবাদিকেরা যে সম্মান অর্জন করছেন, তারও সংবাদ এসেছে সম্প্রতি: ব্রিটেনে মিডিয়া এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন দুই বাংলাদেশি সাংবাদিক। এই সাফল্য রক্ষা করতে হলে ঘরের ভেতরেও স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের চর্চা অটুট রাখতে হবে।
পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, রাষ্ট্রবহির্ভূত শক্তি ও বিদেশি প্রভাবের কাছে গণমাধ্যমের আত্মসমর্পণ কোনো দিন ভালো পরিণতি এনেছে। সম্প্রতি আইএসআইয়ের হানি ট্র্যাপ তদন্তের খবরও আমাদের অঞ্চলে বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতার বাস্তবতা মনে করিয়ে দিয়েছে। সত্যিকারের সার্বভৌমত্ব চাইলে মুক্ত সংবাদমাধ্যম রক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
পাকিস্তানে গণমাধ্যমের পরিস্থিতি কেমন?
পেকা আইন, ২০২৫ কী?
পাকিস্তানের সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মতে, এই আইন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম নেতারা একে কালো আইন আখ্যা দিয়েছেন, যদিও সরকার বলছে এটি শুধু ভুয়া খবর ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য হবে।
জাল এমআই৬ নথিতে কাদের নাম ছিল?
জাল নথিতে মুনিজা জাহাঙ্গীর, ফারহাতুল্লাহ বাবর ও হামিদ মীরকে এমআই৬-এর এজেন্ট বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। হামিদ মীর এটিকে ভুয়া প্রচারণা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
হামিদ মীর কে?
হামিদ মীর পাকিস্তানের খ্যাতিমান সাংবাদিক এবং আরএসএফ বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পুরস্কারের আন্তর্জাতিক জুরির সদস্য।
