ফ্রান্সে টানা তৃতীয় সপ্তাহের বিক্ষোভের পাশাপাশি হ্যালোইন উৎসব ঘিরে সহিংসতার আশঙ্কা বাড়ায় আজ শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেশটিতে ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। দুই সপ্তাহ আগে ১৭ অক্টোবরের সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্যারিসের পুলিশ সদর দপ্তর সহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানী প্যারিসে ৪০টির বেশি মেট্রোস্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং ট্রাম চলাচলেও বিঘ্ন ঘটতে পারে। বিভিন্ন শহরে দোকানপাটের সামনের অংশ কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। প্যারিসের একটি দোকানের সামনের পাটাতনে কালো রঙে লেখা, এই কাঠের আড়ালে কোনো ক্ষমতা বা শত্রু নেই, আছে শুধু একটি পরিবার ও তাদের পরিশ্রম।
কেন উত্তেজনা, কী দাবি
উন্নত শিক্ষার পরিবেশের দাবিতে শিক্ষার্থীদের কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভের পর এই অস্থিরতার সূচনা। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈষম্যের প্রতিবাদে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তাতে ধীরে ধীরে যোগ দিচ্ছেন ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের কর্মী, শ্রমিক সংগঠন এবং স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পুলিশের কঠোর অবস্থানে বিক্ষোভকারীদের কয়েকজন গুরুতর আহত হওয়ার পর দাবির বাইরে এখন নাগরিক স্বাধীনতা ও বিক্ষোভের অধিকার রক্ষার আহ্বানও উঠছে।
গত সপ্তাহে প্যারিসের বাইরে একটি গুলির ঘটনায় একজন নিহত ও সাতজন আহত হন। আহতদের মধ্যে ১১ বছরের একটি মেয়েও রয়েছে। নিহত ও আহতদের বেশির ভাগই অভিবাসী, যার পর বর্ণবাদী বিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। কালের কণ্ঠের খবরে বলা হয়েছে, হ্যালোইনের মধ্যে নতুন করে সহিংসতা ছড়ানোর আশঙ্কাই কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রেখেছে।
হ্যালোইনে কী করছে সরকার
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ সতর্ক করে বলেছেন, জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের ঝুঁকি খুব বেশি। বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হলেও শহরের কেন্দ্রস্থলে মিছিল করা হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পোস্টে হ্যালোইন উপলক্ষে জমায়েতের ডাক দিয়ে বিক্ষোভকারীদের বিপ্লব ঘটানোর আহ্বান জানানো হয়েছে, এমনকি কিছু পোস্টে অন্ধকারের রাত আয়োজনের কথাও বলা হয়েছে। নুনেজ জানিয়েছেন, মুখমণ্ডল ঢেকে রাখে এমন মুখোশ পরে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া যাবে না।
ফ্রান্সের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত কনসেই দেতা আজ নিম্ন আদালতের সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে, যেখানে মধ্য প্যারিসে বিক্ষোভের পথ অনুমোদন করা হয়েছিল। পুলিশ সদর দপ্তর রাজধানীর উপকণ্ঠে মিছিলের অনুমতি দিয়েছে। আজ শনিবার ও আগামীকাল রোববার প্রতিদিন রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত প্যারিসের রিপাবলিক ও শাতলে-লে-আল এলাকায় কারফিউ থাকবে।
১৭ অক্টোবরের ব্যাপক লুটপাট ও ভাঙচুরের পেছনে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার ব্যর্থতা স্বীকার করেছে ফ্রান্সের কর্তৃপক্ষ। তারপর থেকে কয়েকটি শহরে কারফিউ জারি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেছেন, কর্তৃপক্ষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উদ্বেগ রয়েছে। তাঁর ভাষায়, পরিস্থিতি নির্বিঘ্নে শেষ হবে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর ছয় মাস বাকি, আর জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছেন কট্টর ডানপন্থী নেতা মেরিন লো পেন। এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ চলতি সপ্তাহে বলেছেন, নির্বাচনের এত কাছাকাছি সময়ে দেশে এমন অস্থিরতা স্বাভাবিক নয়। চ্যানেল আই অনলাইনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জার্মানিতেও আজ বিক্ষোভের কর্মসূচি রয়েছে এবং দুই দেশেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে।
ফ্রান্সের চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আলাঁ দি ক্রেসেনজো বলেছেন, ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন, দোকানিরা শনিবারটা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। ফ্রান্স ইন্টারকে তিনি বলেন, যে তথ্য আমরা পাচ্ছি, তাতে হ্যালোইন পরিস্থিতি আরও জটিল করছে, কারণ মানুষ মুখোশ পরে বাইরে আসবে।
গতকাল শুক্রবার প্যারিসের একটি পোশাকের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় ছিল। দোকানের ব্যবস্থাপক দিদিয়ের জারসালে বলেন, প্রতিটি ক্রেতাকে কী উদ্দেশ্যে পোশাক কিনছেন তা জিজ্ঞাসা করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর কথায়, আমরা পুলিশ হিসেবে কাজ করতে আসিনি।
আমাদের চোখে: রাষ্ট্র আর জনতার এই সংঘাত থেকে শিক্ষা
১৯৭১ সালে আমরা দেখেছি, যখন কোনো জাতি নিজের ভাষা, অধিকার ও মর্যাদার জন্য রাস্তায় নামে, তখন কাঠের পাটাতন কিংবা কারফিউ তাদের থামাতে পারে না। ফ্রান্সের বিক্ষোভকারীরাও আজ জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষার অবনতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাস্তায়। পার্থক্য হলো, আমাদের মুক্তিযুদ্র ছিল স্বাধীনতার জন্য, আর ফ্রান্সের এই লড়াই একটি রাষ্ট্রের ভেতরে ন্যায্য অধিকারের দাবিতে।
প্রশ্ন থেকে যায়, কারফিউ আর ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী কি মানুষের ক্ষোভ মেটাতে পারে? ইতিহাস বলে, দমন নয়, ন্যায্যতাই শেষ পর্যন্ত শান্তি ফেরায়। বাংলাদেশ হিসেবে আমাদের অভিজ্ঞতাও তা-ই শিখিয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগের এই অস্থিরতা ফ্রান্সের রাজনীতিকে কোথায় নিয়ে যাবে, সেদিকেই এখন বিশ্বের নজর।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ফ্রান্সে কেন বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল?
উন্নত শিক্ষার পরিবেশ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈষম্যের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ থেকেই অস্থিরতার সূচনা, যাতে পরে শ্রমিক সংগঠন ও ইয়েলো ভেস্ট কর্মীরাও যোগ দেন।
হ্যালোইনে কী বাড়তি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন, প্যারিসের ৪০টির বেশি মেট্রোস্টেশন বন্ধ, দুই এলাকায় কারফিউ এবং মুখমণ্ডল ঢাকা মুখোশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
১৭ অক্টোবর কী ঘটেছিল?
ফ্রান্সজুড়ে সংঘর্ষ, লুটপাট ও সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, যার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার ব্যর্থতা স্বীকার করেছে।
