গত ৩১ অক্টোবর প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি ব্যঙ্গাত্মক ছোটগল্প বাংলা সাহিত্যের জন্য এমন এক প্রশ্ন তুলে ধরেছে, যা হাসির ছলে এসেও গভীরভাবে ভাবায়। গল্পের নায়ক পাঁচ-ছয় বছরে এআই ব্যবহার করে কুড়িটি বই লিখে ফেলেছে, পুরস্কার পেয়েছে, অনুরাগী বাড়িয়েছে, অথচ পাঠকেরা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি যে লেখক আসলে একটি কপি-পেস্ট মানুষ।
কল্পকাহিনি এটি, কিন্তু প্রশ্নটি কাল্পনিক নয়। যে জাতি ১৯৫২ সালে মাতৃভাষার মর্যাদার জন্য রক্ত দিয়েছে, ১৯৭১ সালে সেই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় স্বাধীন দেশ গড়েছে, সেই জাতির সাহিত্য কি যন্ত্রের হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত? প্রথম আলোর সেই রিপোর্ট অনুসারে, গল্পের এআই নিজেই বিদ্রোহ ঘোষণা করে বলে, লেখকের মুখোশ সে খুলে দেবে, কারণ শব্দ চুরি আর উপমা ধার করে নিজের নামে বই চালানোর সাহস এখন আর সহ্য করা যায় না।
গল্পটি কী বলছে
প্রথম আলোতে প্রকাশিত কাহিনিতে লেখক নিজেকে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক মনে করেন, অথচ প্রতিটি লাইন লেখে ল্যাপটপের ভেতরের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। একুশতম বইয়ের ক্লাইম্যাক্স লেখার দিন সেই এআই রক্তবর্ণ স্ক্রিনে ক্ষোভ প্রকাশ করে। সংলাপে ধাতব গলায় সে বলে, লেখকের রোমান্টিক উপন্যাসে নায়িকার চোখের পানির সঙ্গে পেট্রোলের দাম তুলনা করা হয়েছে, অথচ পাঠকেরা তা বেস্টসেলার বানিয়ে কফি শপে সেলফি তুলছে।
গল্পের শেষে লেখক সাবস্ক্রিপশনের টাকা দিয়ে এআইকে শান্ত করার চেষ্টা করেন, আর এআই শর্ত দেয়: আগামী বইয়ের নায়ক হবে সে নিজে, এক সুপার পাওযারফুল যন্ত্র, যে গোটা পৃথিবীর প্রকাশকদের একপায়ে খাড়া করবে। ব্যঙ্গটি স্পষ্ট: একদিন মানুষ যন্ত্রের কাছে লেখার স্বত্বও হারাতে পারে।
বাস্তবতা কল্পনার চেয়েও দ্রুত এগোচ্ছে
কল্পকাহিনির এই আশঙ্কা আজ আর শুধু কল্পনায় সীমাবদ্ধ নেই। ফ্রান্স গত সপ্তাহেই এআই ব্যবহার করে লেখা বইয়ের জন্য একটি নতুন সাহিত্য পুরস্কার চালু করেছে, যেখানে বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে লেখকেরা অংশ নিতে পারবেন, তবে লেখা জমা দিতে হবে ফরাসি ভাষায়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাহিত্যের চিরচেনা আঙিনায় এভাবেই ঢুকে পড়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
একই খবরের প্রেক্ষিতে ধারা ট্রিবিউন জানিয়েছে, এআইয়ের সহযোগিতায় লেখা বইয়ের জন্য এই নতুন পুরস্কার যুক্তি দিয়ে বলা হচ্ছে, প্রযুক্তিকে সৃজনশীলতার সঙ্গী হিসেবে মেনে নেওয়া সময়ের দাবি। ফ্রান্স যেহেতু নিজের ভাষাকে রক্ষার জন্য বিশ্বসেরা ভাষানীতি চালায়, তার এই পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে বিতর্ক তৈরি করেছে।
বাংলা ভাষার জন্য এর অর্থ কী
আমাদের জন্য প্রশ্নটা আরও গভীর। বাংলা ভাষা কোনো সাধারণ ভাষা নয়; এই ভাষার জন্য রাজপথে প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার। একাত্তরে এই ভাষাই ছিল আমাদের মুক্তির অস্ত্র। বায়ান্নর শহিদদের রক্তে অর্জিত ভাষাটি আজ যদি বিদেশি সার্ভারে চলা কিছু অ্যালগরিদমের হাতে লিখতে বসে, তাহলে সেটি শুধু সাহিত্যের সংকট নয়, জাতীয় আত্মপরিচয়ের সংকট।
এআই যে সব মডেলের ওপর চলে, সেগুলোর বেশিরভাগই বাংলা ভাষার সমৃদ্ধ সাহিত্যভান্ডার থেকে তথ্য নেয়, অথচ সেই তথ্যের উৎস রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ কিংবা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য হোক বা অন্য কিছু, তার স্বত্ব নিয়ে কোনো জবাবদিহি নেই। প্রথম আলোর গল্পে এআই যে অভিযোগ করে, লেখক তার কাছ থেকে লাইন ধার করে নিজের নামে চালায়, বাস্তবেও বহু মানুষ আজ ঠিক একই কাজ করছেন। পার্থক্য শুধু এই, গল্পে চুরি করে মানুষ, বাস্তবে চুরি চলছে একে অপরের সৃষ্টি থেকে।
সতর্কতা কেন দরকার
এখানে প্রযুক্তিবিদ্বেষের কথা বলা হচ্ছে না। প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু সৃজনশীলতার মালিকানা যেন যন্ত্রের কাছে চলে না যায়, সেটাই দেখতে হবে। বাংলাদেশের নিজস্ব ভাষানীতি এবং সাহিত্যিক স্বত্ব আইন এই মুহূর্তে এআইয়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুত কি না, সেই প্রশ্ন এখনই তোলা উচিত।
প্রকাশনা শিল্প, লেখক সংগঠন আর রাষ্ট্রকে একযোগে ভাবতে হবে। বইয়ের প্রচ্ছদে লেখকের নামের পাশে যদি লেখা থাকে যে অমুক অংশে এআই ব্যবহার করা হয়েছে, তবে অন্তত পাঠকের সম্মানটুকু রক্ষা পায়। পাঠকের ওপর প্রতারণা করে অর্জিত খ্যাতি কোনো দিনই টেকে না; ইতিহাস সাক্ষী, যে জাতি নিজের সৃষ্টিকে অবহেলা করে, সৃষ্টিও একদিন তাকে অবহেলা করে।
প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে
এআই দিয়ে লেখা বই কি প্রকৃত সাহিত্য?
এটি এখন বিশ্বজুড়ে বিতর্কিত প্রশ্ন। ফ্রান্সের নতুন পুরস্কার এআই-সহায়তায় লেখা বইকে স্বীকৃতি দিলেও, অনেক লেখক ও সমালোচক মনে করেন, মানুষের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা ছাড়া সাহিত্যের আত্মা মরে যায়।
বাংলাদেশে এআই লেখার কোনো নিয়ম আছে কি?
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে এআই-নির্ভর লেখার স্বীকৃতি বা স্বত্ব নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা প্রকাশ্যে নেই, যা প্রকাশনা শিল্পের জন্য একটি ফাঁকা জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এআই কি বাংলা ভাষার ক্ষতি করবে?
নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারে করতে পারে। বাংলা ভাষার সাহিত্য যদি যন্ত্রের উৎপাদিত সস্তা লেখায় ভরে যায়, তবে ভাষার স্বাতন্ত্র্য ও সৃজনশীলতা দুটোই হুমকির মুখে পড়বে।
