প্রায় একশো বছর আগে লেখা জীবনানন্দ দাশের 'ধূসর পাণ্ডুলিপি' কাব্যগ্রন্থের ১৭টি কবিতা আজও বাংলা ভাষার পাঠকের হৃদয়ে জীবিত। প্রথম আলো সম্প্রতি এক বিস্তারিত প্রবন্ধে দেখিয়েছে, ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য নক্ষত্র হয়ে আছে।
বাংলা ভাষা আমাদের আত্মার ভাষা; ১৯৫২-র রক্ত, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, সবকিছুর শিকড় এই ভাষার সাহিত্যে। আর সেই সাহিত্যের আকাশে জীবনানন্দ দাশ এমন এক নাম, যাঁকে উপেক্ষা করে বাঙালির আত্মপরিচয় লেখা সম্ভব নয়। 'ধূসর পাণ্ডুলিপি' সেই পরিচয়েরই এক গভীর স্তর।
কবির নিজস্ব Soul-এর সন্ধানে
১৯২৭ সালে, কবির ২৭ বছর বয়সে, প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'ঝরা পালক'। নজরুল ও মোহিতলালের প্রভাবে লেখা সেই কবিতাগুলো আড়ষ্ট ও অপরিপক্ব ছিল। রবীন্দ্রনাথের সেই গ্রন্থ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য কবিকে কি আরও জেদী করেছিল? প্রশ্নটা তুলেছেন প্রথম আলোর প্রবন্ধকার। উত্তর মেলে 'ধূসর পাণ্ডুলিপিতে।
গ্রন্থটি প্রকাশের পর রবীন্দ্রনাথকে এক কপি পাঠিয়ে জীবনানন্দ চিঠিতে লিখেছিলেন, '৮-১০ বছর আগের রচিত কবিতা কুড়িয়ে এবার আর একখানা বই বের করলাম। আমার মনে হয়, বইয়ের কবিতাগুলোর একটা নিজস্ব Soul রয়েছে।'
অর্থাৎ ১৯৩৬-এ প্রকাশিত হলেও কবিতাগুলো রচিত প্রায় ১০০ বছর আগে। সেই হিসাবে আজ থেকে শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও কবিতাগুলোর স্বাদ চিরন্তন। 'ঝরা পালক' থেকে 'ধূসর পাণ্ডুলিপি'তে আসতে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধান, অথচ এই অল্প সময়েই জীবনানন্দ বাংলা কবিতার বাঁক বদলে দিয়েছিলেন। আজকের বাংলা-ও তাই এই গ্রন্থকে আধুনিক সুর ও নিজস্ব ধারার সূচনা বলে চিহ্নিত করেছে।
বুদ্ধদেব বসুর ধাত্রী-শ্রম
গ্রন্থটি প্রকাশে অক্লান্ত শ্রম দিয়েছিলেন কবি বুদ্ধদেব বসু। তিনি বলেছিলেন, 'যখন বই ছাপা হলো ধাত্রীর কাজও আমি করেছিলাম, তাই ঐ গ্রন্থটিকে নিজের জীবনের একটি অংশ বলে মনে হয় আমার।' স্বভাবতই জীবনানন্দ বইটি উৎসর্গ করেন বুদ্ধদেবকেই।
বুদ্ধদেব পরে লিখেছিলেন, এই গ্রন্থে যে কবিকে পাওয়া গেল তিনি সুদূর, স্বপ্নাবিষ্ট; তাঁর মনোলোক যেন একটি ধূসর কোমল পরিমণ্ডল। যার ভিতরে একবার প্রবেশ করলে সহজেই নিশ্বাস নেওয়া যায়, সহজেই বিশ্বাস করা যায়।
গ্রন্থের ১৭টি কবিতায় কী আছে?
'ধূসর পাণ্ডুলিপি'র বড় অনুষঙ্গ প্রকৃতি, যা কবির হৃদয়ের সঙ্গে মিশে বিরল সৌন্দর্য ধারণ করেছে। প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা, অতীতমুখিনতা, অস্তিত্বের সংকট, ঘোর ও বিপন্নতা এসেছে গভীর প্রকাশে। উৎপ্রেক্ষা, রূপক, প্রতীক, পরাবাস্তববাদ, অস্তিত্ববাদ ও অভিব্যক্তিবাদ সুনিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন কবি।
- 'মাঠের গল্প': চার ভাগে বিভক্ত; মেঠো চাঁদ, পেঁচা, পঁচিশ বছর পরে ও কার্তিক মাঠের চাঁদ। জোছনার আলোয় একা মাঠ, একা মানুষের চিত্র।
- 'অবসরের গান': সম্পূর্ণ প্রকৃতিনির্ভর। 'চারিদিকে নুয়ে প'ড়ে ফলেছে ফসল' চরণ দুটি নিয়ে সেই সময়ে বোদ্ধামহলে উঠেছিল ঝড়।
- 'অনেক আকাশ': কবির একান্ত নিজের সঙ্গে কথা বলার কবিতা।
- 'জীবন': গ্রন্থের দীর্ঘতম কবিতা; ৩৪টি স্তবক, প্রতিটিতে ৯টি করে চরণ। মৃত্যু, ব্যর্থতা ও প্রকৃতির আশ্রয় মিলে এই কবিতা।
- 'শকুন': যুদ্ধের কদাকার দিকের প্রতীকী ইঙ্গিত।
- 'স্বপ্নের হাতে': গ্রন্থের শেষ কবিতা, জীবনদর্শন আর প্রকৃতির স্পর্শে সমাপ্তি।
ভূমেন্দ্র গুহর স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, গ্রন্থটি নিয়ে জীবনানন্দের ছিল স্মৃতিময় মমতাস্পর্শ। তিনি একদা বলেছিলেন, 'ওখানে একটু বেশি অগোছালো হয়ে পড়তে হয়েছিল।'
রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা ও নতুন আকাশ
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা: রবীন্দ্রনাথ নিজে 'ধূসর পাণ্ডুলিপি' পড়ে চিঠিতে জানান, 'তোমার কবিতাগুলো পড়ে খুশি হয়েছি। তোমার লেখার রস আছে, স্বকীয়তা আছে এবং তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে।' যে কবির প্রথম গ্রন্থ নিয়ে তিনি হতাশ ছিলেন, সেই একই মহাকবির কাছ থেকে এ প্রশংসা বাংলা সাহিত্যে বিরল।
১৯২২ সালে টি এস এলিয়টের 'ওয়েস্ট ল্যান্ড' ইংরেজি কবিতার গতিপথ বদলে দিয়েছিল। ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক জীবনানন্দ সম্ভবত সেই অনুপ্রেরণায় রবীন্দ্রবলয়হীন, উন্মুক্ত, জীবনদায়ী কবিতার নতুন আকাশ সৃষ্টি করেন 'ধূসর পাণ্ডুলিপি'র হাত ধরেই।
কেন আজও প্রাসঙ্গিক এই গ্রন্থ
আমরা যে ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি, সেই বাংলা ভাষার সর্বোচ্চ অভিব্যক্তিগুলোর একটি এই গ্রন্থ। শতবর্ষ পেরিয়ে যাওয়া কবিতাও যখন আজকের যাপনে গতিশীল মনে হয়, তখন বোঝা যায় সাহিত্যের বিষয়বস্তু চিরন্তন হলে কালের বন্ধন ভেঙে যায়। বিদেশি প্রভাব আর অনুকরণের প্লাবনে আজকের বাঙালি যখন নিজের সুর হারানোর শঙ্কায়, তখন জীবনানন্দ মনে করিয়ে দেন: আমাদের নিজস্ব মাঠ, নিজস্ব চাঁদ, নিজস্ব নদীই আমাদের কবিতার সম্পদ।
রূপসী বাংলার এই কবি বাংলা কবিতাকে বিষয়ে, প্রকাশে ও অনুভবে সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন বিপন্ন বিস্ময়ের প্রকৃতির কবি। 'ধূসর পাণ্ডুলিপি' বাংলা কবিতার আকাশে অপূর্ব, অনন্য নক্ষত্র; আর সেই নক্ষত্রের আলো আজও আমাদের ভাষা ও সত্তার সন্ধান দেয়।
প্রশ্নোত্তর
'ধূসর পাণ্ডুলিপি' কবে প্রকাশিত হয়?
১৯৩৬ সালের ডিসেম্বরে, জীবনানন্দ দাশের ৩৬ বছর বয়সে। তবে কবিতাগুলো রচিত হয়েছিল তারও ৮-১০ বছর আগে, অর্থাৎ প্রায় ১০০ বছর আগে।
গ্রন্থটিতে কতটি কবিতা আছে?
১৭টি কবিতা। এর মধ্যে 'শকুন' বাদে বাকি ১৬টিই দীর্ঘ কবিতা। দীর্ঘতম কবিতা 'জীবন', যাতে ৩৪টি স্তবক রয়েছে।
রবীন্দ্রনাঠ ঠাকুর গ্রন্থটি সম্পর্কে কী বলেছিলেন?
চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, কবিতাগুলো পড়ে খুশি হয়েছেন; লেখায় রস, স্বকীয়তা ও তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে।
গ্রন্থটি কার উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়?
বুদ্ধদেব বসুর উদ্দেশে; কারণ বইটি ছাপার সময় ধাত্রীর কাজও তিনি করেছিলেন।
