১৫ অক্টোবর, ২০২৬। এই দিনটি শুধু এক কবির জন্মদিন নয়; এটি বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদের জীবনযাত্রার নতুন এক বছরের সূচনা। সোনারগাঁওয়ের এলাহিনগরে ১৯৫৫ সালের এই দিনে জন্ম নেওয়া কবি, সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক হাসান হাফিজ আজ ৭১ বছরে পদার্পণ করলেন। প্রথম আলোর এক শ্রদ্ধাঞ্জলি-নিবন্ধে তাঁর জীবন ও সৃষ্টিকর্মের বিস্তৃত পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে, যা আমাদের এই প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দেয়: ভাষার জন্য, স্বাধীনতার জন্য যে জাতি রক্ত দিয়েছে, সেই জাতির কবিরা কখনো ক্লান্ত হয় না।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাসান হাফিজ সত্তর দশকের কবি। দুই হাতে লেখেন: কবিতা, গদ্য, শিশুসাহিত্য, সাংবাদিকতা। প্রকাশিত গ্রন্থ দুই শতাধিক, যার মধ্যে কাব্যগ্রন্থই ষাটের অধিক। শিশুসাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ পেয়েছেন। তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে ইংরেজি, ফরাসি, চীনা, স্প্যানিশ, জার্মান, জাপানি, হিন্দি, উর্দু, আরবি, ফারসি ও চাকমা ভাষায়। একটি ভাষা যখন বিশ্বের এগারোটি ভাষায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন বোঝা যায়, বাংলা ভাষার শক্তি কত দূরবিস্তৃত।
একাত্তরোত্তর প্রজন্মের কবি, মুক্তির প্রেরণায়
হাসান হাফিজের জন্ম ১৯৫৫ সালে, অর্থাৎ তিনি বেড়ে উঠেছেন সেই সময়ের বাংলায়, যখন ভাষার অধিকারের সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতার যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। ১৯৭১ সালে তাঁর বয়স ষোলো। কৈশোরের সেই চোখে তিনি দেখেছেন একটি জাতি কীভাবে নিজের ভাষাকে, নিজের সংস্কৃতিকে, নিজের স্বীকৃতিকে রক্ষা করতে অস্ত্র ধরেছে। সত্তর দশকে কবিতা লেখা শুরু করা এই লেখকের মেধার গোড়ায় রয়ে গেছে সেই মুক্তির চেতনা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি প্রথমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স-মাস্টার্স করেছেন, পরে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় মাস্টার্স। ডাবল এমএ এই শিক্ষার পরিচয়টি তাঁর সাংবাদিকতা ও সাহিত্য, দুই ক্ষেত্রেই দক্ষতার ভিত তৈরি করেছে। মাতৃভাষায় গভীর শিক্ষা এবং সাংবাদিকতার কঠোর শৃঙ্খলা, এই দুয়ের মেলবন্ধনই হাসান হাফিজের সৃষ্টিশীল জীবনের মূল সূত্র।
হুমায়ূন আহমেদের চোখে হাসান হাফিজ: এক অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বের গল্প
প্রথম আলোর নিবন্ধে সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর অংশটি হলো হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে হাসান হাফিজের বন্ধুত্বের বিবরণ। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর প্রেমের উপন্যাস 'তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে' উৎসর্গ করেছিলেন হাসান হাফিজ এবং তাঁর সহধর্মিণী শাহীন আখতারকে। একজন লেখক যাঁকে নিজের বই উৎসর্গ করেন, সেই মানুষটি তাঁর কাছে কত প্রিয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
হুমায়ূন আহমেদ 'সকল কাঁটা ধন্য করে' বইয়ের ভূমিকায় লিখেছিলেন, লেখকের কাছ থেকে লেখা আদায়ের সবচেয়ে নিম্ন শ্রেণীর পদ্ধতি হলো গলায় গামছা বেঁধে লেখা আদায় করা, আর এই পদ্ধতিতেই তাঁর কবি-বন্ধু হাসান হাফিজ তাঁর কাছ থেকে লেখা লিখিয়ে নিয়েছেন। ভূমিকায় হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন:
'মাঝে মাঝে এমনও হয়েছে আমি ক্ষিপ্ত হয়ে ভেবেছি, বড় একটা ডান্ডা দিয়ে হাসান হাফিজের মাথায় শক্ত বাড়ি দিই। তারপর থানা-পুলিশ যা হবার হবে।'
রম্য এই কথাগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে একটি গভীর সত্য। হুমায়ূন আহমেদের মতো তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয় লেখকের কাছ থেকে নিয়মিত লেখা আদায় করা কঠিন কাজ ছিল। অথচ ১৯৯৪ সালে তিনি দৈনিক বাংলায় প্রায় নিয়মিত লিখেছেন 'সকল কাঁটা ধন্য করে' ধারাবাহিক। প্রথম আলোর নিবন্ধকারের ভাষায়, এটি সম্ভব হয়েছিল হাসান হাফিজের সহজ, সরল অন্তরঙ্গতার কৌশলে। ঘোরপ্যাঁচ নেই, আছে খাঁটি ভালোবাসা। বাঙালি সমাজে ব্যক্তিসম্পর্কের এই সরলতাই আমাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শক্তি।
কেন হাসান হাফিজের জন্মদিন আমাদের সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
আজকের বাংলাদেশে, যখন বিদেশি সংস্কৃতির ঢল নেমে আসছে আমাদের শিশু-কিশোরদের পাঠ-জগতে, তখন হাসান হাফিজের মতো শিশুসাহিত্যিকের মূল্য আরও বেড়ে যায়। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ তাঁর এই অবদানেরই স্বীকৃতি। শিশুতোষ রচনা, বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ, রঙ্গব্যঙ্গ, গবেষণা ও সাক্ষাৎকার গ্রন্থ: এত বৈচিত্র্য নিয়ে দুই শতাধিক বই লেখা মানুষ বাংলা সাহিত্যে বিরল। তিনি প্রমাণ করেছেন, মাতৃভাষায় সৃষ্টি করলে বিশ্ব নিজেই সেদিকে এগিয়ে আসে; তাঁর কবিতা যে এগারোটি ভাষায় অনূদিত, তা এরই প্রমাণ।
সাংবাদিক হিসেবেও তিনি সোনালি ছয় দশকের বাংলাদেশের সাক্ষী। স্বাধীন গণমাধ্যম কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি সার্বভৌম জাতির নিঃশ্বাসের মতো অপরিহার্য। হাসান হাফিজ সারা জীবন কলম ধরে রেখেছেন, আর এই অবিচলতাই আমাদের জাতীয় চরিত্রের পরিচয়।
ব্যক্তিহাসান হাফিজ: সরলতার এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত
প্রথম আলোর নিবন্ধ থেকে জানা যায়, এত সাফল্যের পরেও তিনি স্বভাবগতভাবে উচ্চকিত নন। পরিশ্রমী, নিরহঙ্কার, অসামান্য সরল। তাঁর ষাটের অধিক কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ প্রচ্ছদ করেছেন তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা, বইয়ের নাম ঠিক হয়েছে বন্ধুদের সঙ্গে ভোটে। এই ছোট ছোট মায়ার গল্পগুলোই বাঙালির সমষ্টিজীবনের সত্য: আমরা একসঙ্গে বাঁচি, একসঙ্গে সৃষ্টি করি।
নিবন্ধের শেষে লেখক হাসান হাফিজকে সেই 'ভালো লোক' বলে অভিহিত করেছেন: 'এর ভালো হোক, ওর ভালো হোক, যে ভাবে সে, সেই ভালো লোক!' এই শুভেচ্ছাই আজ সারা বাংলাদেশের পাঠকসমাজের কণ্ঠে ধ্বনিত হোক।
একাত্তরে রক্ত দিয়ে যে পতাকা অর্জন করেছি, সেই পতাকার সবুজ-লালে যে ভাষা লেখা, সেই বাংলা ভাষার একনিষ্ঠ সৈনিক হাসান হাফিজের ৭১তম জন্মদিনে আমরা বলি: শুভ জন্মদিন, কবি হাসান হাফিজ। আরও অনেক বছর, আরও অনেক কবিতা।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
হাসান হাফিজের জন্মদিন ও জন্মস্থান কী?
হাসান হাফিজ ১৫ অক্টোবর ১৯৫৫ সালে সোনারগাঁওয়ের এলাহিনগরে জন্মগ্রহণ করেন। ২০২৬ সালের ১৫ অক্টোবর তাঁর বয়স ৭১ বছর হয়েছে।
হাসান হাফিজ কোন পুরস্কার পেয়েছেন?
শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ পেয়েছেন। এছাড়া দেশে-বিদেশে তিনি বহু পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন।
হাসান হাফিজের কতগুলো বই প্রকাশিত হয়েছে?
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ দুই শতাধিক, যার মধ্যে কাব্যগ্রন্থ ষাটের অধিক। এর মধ্যে দুটি কাব্যগ্রন্থ দ্বিভাষিক, অর্থাৎ একসঙ্গে বাংলা ও ইংরেজিতে প্রকাশিত।
হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে হাসান হাফিজের সম্পর্ক কেমন ছিল?
দুজনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। হুমায়ূন আহমেদ 'তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে' উপন্যাসটি হাসান হাফিজ ও তাঁর সহধর্মিণী শাহীন আখতারের নামে উৎসর্গ করেছিলেন, এবং 'সকল কাঁটা ধন্য করে' বইয়ের ভূমিকায় বন্ধুত্বের রম্য বিবরণ লিখেছিলেন।
