গত রোববার রাতে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার চরবংশী ইউনিয়নের সাজু মোল্লার ঘাটে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে 'পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণ' নামের একটি নদীতীরবর্তী পার্ক। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মেঘনার পাড়ে প্রায় ২০ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত এই পার্কে ইতিমধ্যেই প্রতিদিন শত শত মানুষ ছুটে যাচ্ছেন, আর সঙ্গে মিলছে মেঘনার তাজা ইলিশের স্বাদও।
প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, উদ্বোধনের আগে থেকেই পার্কটি দর্শনার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। শুক্র ও শনিবারে সেখানে ভিড় বেশি হয়। রায়পুর শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে মেঘনার বুকের ওপর দাঁড়িয়ে এই ছোট্ট প্রাঙ্গণ এখন স্থানীয় মানুষের অবসর কাটানোর প্রধান ঠিকানা।
নদীর পাড়ে এক নতুন স্মৃতিস্তম্ভ
আমাদের জাতীয় জীবনে নদী কেবল ভূগোল নয়, আবেগ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে মেঘনা ও তার শাখা নদীগুলো দিয়েই বহে গেছে মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন পথ, শরণার্থীদের পায়ের চিহ্ন, স্বাধীনতার অদম্য বার্তা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কালজয়ী গান, 'কত যে ধীরে বহে মেঘনা, শান্ত তবু সুপ্ত সে নয়', এই নদীর চরিত্রের সঙ্গে আমাদের মুক্তিসংগ্রামের চরিত্র একাকার করে দিয়েছে। সেই মেঘনার তীরে দাঁড়িয়ে একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ প্রাঙ্গণ তৈরি হওয়া কোনো সাধারণ নগর উন্নয়নের খবর নয়। এটি আমাদের ভূমি, আমাদের নদী, আমাদের ভাষার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় ঘটানোর এক প্রয়াস।
পার্কে রয়েছে হাঁটার ওয়াকওয়ে, বসার বেঞ্চ, শিশুদের দোলনা আর একটি সুশ্রী বটগাছ, যার গোড়া পাথরে সাজানো। সন্ধ্যায় সারি সারি বাতি জ্বলে উঠলে হাঁটা পথের পাশে ফুলের বাগান মিলেমিশে এক মোহনীয় দৃশ্য তৈরি করে। প্রবেশে কোনো ফি নেই। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পার্কটি খোলা থাকে, বাইরে টয়লেটের ব্যবস্থাও রয়েছে।
কেন নাম 'পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণ'?
উপজেলা প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, পার্কের মূল লক্ষ্য কেবল বিনোদন নয়, মানুষকে পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করাও। দর্শনার্থীরা যেন ময়লা-আবর্জনা না ফেলেন এবং জায়গাটির সবুজ পরিবেশ বজায় রাখেন, সেই আহ্বানই নামকরণের পেছনের ভাবনা। এই চেতনাটি আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যে জাতি নিজের ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে, সেই জাতির ভূমি ও নদীকে পরিচ্ছন্ন রাখার দায় এক ধরনের জাতীয় প্রতিশ্রুতি।
সাজানো-পরিচ্ছন্ন ও সবুজ এই ছোট্ট প্রাঙ্গণ দেখে আমাদের সন্তানেরা আগামী দিনের পরিচ্ছন্ন রায়পুর তথা পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ে তোলার দীক্ষা গ্রহণ করবে। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের রায়পুরের এই পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণের সুবাস ছড়িয়ে পড়বে সারা বাংলাদেশে।
একথা বলেছেন রায়পুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার। তাঁর এই বার্তায় স্থানীয় একটি উদ্যোগ ছাড়িয়ে জাতীয় চেতনার স্পর্শ স্পষ্ট।
মেঘনার ইলিশ: স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ
পার্কের পাশেই সাজু মোল্লার ঘাটে দীর্ঘদিন ধরে রেস্তোরাঁর ব্যবসা করছেন মমিন উল্লাহ। তাঁর ভাষায়, মেঘনার তাজা ইলিশ ভাজা, ইলিশের ভর্তাসহ নানা জাতের নদীর মাছের স্বাদ নিতে দূরদূরান্ত থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষ আসছেন। দর্শনার্থীর সমাগম বাড়ায় বেচাকেনা ভালো হচ্ছে, স্থানীয় আয় বেড়েছে এবং পার্ককেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
এই খবরের তাৎপর্য আরও গভীর। চরবংশী ইউনিয়নের অন্তত ৪০ শতাংশ মানুষ মেঘনায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন, বাকিরা কৃষির ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যন্ত এই অঞ্চলে এত দিন পরিবার নিয়ে ঘোরাঘুরির কোনো বিনোদনকেন্দ্র ছিল না। নতুন পার্ক সেই অভাব পূরণ করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট লোকজন। বিদেশি পর্যটন বা বাইরের কোনো মডেলের অনুকরণ নয়, আমাদের নিজস্ব নদী, নিজস্ব মাছ আর নিজস্ব মানুষের ওপর দাঁড়িয়েই এই অর্থনীতি দাঁড়িয়েছে। এটিই স্বনির্ভর উন্নয়নের প্রকৃত পথ।
দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা
রায়পুর উপজেলার কেরোয়া গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান চার বন্ধুকে নিয়ে ঘুরতে এসেছেন মেঘনাতীরে। মুগ্ধতা নিয়ে তিনি বলেন,
পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণের একদিকে মেঘনা নদী, অন্যদিকে মেঘনার সংযোগ নদী। পার্কে বসে মেঘনার বুকে সূর্য ডুবে যাওয়ার অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। চারপাশের দৃশ্য ভীষণ সুন্দর।
পার্কের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছে স্থানীয় দোকানদার ও এলাকার মানুষের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি, সহায়তায় রয়েছেন গ্রাম পুলিশের সদস্যরা। রাষ্ট্রীয় তহবিল বা বাইরের কোনো সংস্থার নির্ভরতা ছাড়াই নিজেদের উদ্যোগে প্রাঙ্গণটি রক্ষা করার এই চেষ্টা ন্যায্যভাবে গর্বের।
নদী রক্ষা মানে সার্বভৌমত্ব রক্ষা
একটি প্রজন্ম আগে আমরা শিখেছিলাম, স্বাধীনতা কেবল পতাকা নয়, এটি নদী-মাটি-ভাষার সম্মিলিত অস্তিত্ব। মেঘনা তেমনই এক নদী, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষী। ফারাক্কা ব্যারাজের ক্ষত, নদী দখল, দূষণ, এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে মেঘনাকে ঘিরে মানুষের এই নতুন আগ্রহ একটি সুসংবাদ। কারণ যে নদীর তীরে মানুষ আবার ভিড় জমায়, সেই নদীকে রক্ষা করার সমাজিক শক্তিও জন্ম নেয়।
রায়পুরের এই 'পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণ' প্রমাণ করে, ছোট উদ্যোগও বড় চেতনা বহন করতে পারে। উপজেলা প্রশাসনের এই প্রচেষ্টা সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে স্থানীয় মানুষের সচেতনতার ওপর। আগামী দিনে প্রশাসন পার্কটির রক্ষণাবেক্ষণ ও নদীতীরের সবুজায়ন অব্যাহত রাখবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণ পার্কটি কোথায় অবস্থিত?
লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার চরবংশী ইউনিয়নের সাজু মোল্লার ঘাটে, রায়পুর শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে, মেঘনা নদীর তীরে পার্কটি অবস্থিত।
পার্কে প্রবেশে কোনো ফি দিতে হয় কি?
না। সবার জন্য উন্মুক্ত এই পার্কে বিনা মূল্যে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ঘুরে বেড়ানো যায়।
পার্কের পাশে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে কি?
হ্যাঁ। সাজু মোল্লার ঘাটের রেস্তোরাঁগুলোতে মেঘনার তাজা ইলিশ ভাজা, ইলিশের ভর্তা এবং নদীর নানা জাতের মাছ পাওয়া যায়।
