শরীয়তপুর পৌরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের বাঘিয়া এলাকার একটি অংশ আজ প্রেমতলা নামে পরিচিত। ৩৬ বছর আগে, ১৯৯০ সালের নভেম্বরে এক বিকেলের আড্ডায় কয়েকজন কিশোর-তরুণের হাত ধরে এই নামের জন্ম। আজ সেই নির্জন মেঠো পথের জায়গায় গড়ে উঠেছে শরীয়তপুরের অন্যতম জনবহুল ও ব্যস্ততম এলাকা, যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষের চলাচল।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রেমতলার নামকরণের পেছনে জড়িয়ে আছে একটি বিশাল বটগাছ, কিশোর-তরুণের আড্ডা এবং দুটি কোটাপাড়ার নামের বিভ্রান্তি দূর করার এক সহজ সমাধান। একই বিষয় নিয়ে আমার সকাল ২৪-ও এলাকার প্রবীণ ও বর্তমান বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকারে প্রতিবেদন করেছে।
দুই কোটাপাড়ার বিভ্রান্তি আর এক বিকেলের সিদ্ধান্ত
একসময় এলাকাটি কোটাপাড়া নামে পরিচিত ছিল। প্রায় ৭৫০ মিটার পশ্চিমে কীর্তিনাশা নদীর তীরঘেঁষা আরেকটি কোটাপাড়া গ্রাম রয়েছে। কাছাকাছি দূরত্বে একই নামের দুটি স্থান থাকায় পথচারী ও যানবাহনের চালকদের প্রায়ই বিভ্রান্তিতে পড়তে হতো।
কোটাপাড়া ও বাঘিয়ার কিশোর-তরুণেরা নিয়মিত আড্ডা দিতেন একটি বটগাছের নিচে। সেখানেই একদিন আলোচনা ওঠে, কীভাবে এই বিভ্রান্তি দূর করা যায়। ১৯৯০ সালের নভেম্বরে এক বিকেলে আড্ডায় স্থানীয় ব্যক্তি মকবুল চৌকিদার প্রস্তাব করেন, জায়গাটির নাম হোক প্রেমতলা। অন্যরা সম্মতি দেন। পরদিন কয়েকজন কিশোর-তরুণ মিলে 'প্রেমতলা বাসস্ট্যান্ড' লেখা একটি টিনের সাইনবোর্ড বটগাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেন। সেই থেকে এলাকাটি প্রেমতলা নামে পরিচিতি পায়।
মকবুল চৌকিদার এখন প্রেমতলা বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, 'প্রেমতলা এখন শহরের অংশ। কিন্তু ৩৬ বছর আগে এটি ছিল অজপাড়াগাঁয়ের ফসলি মাঠের মধ্যে দিয়ে যাওয়া একটি মেঠো পথ। আমাদের কয়েকজনের দেওয়া নামটি একদিন জনবহুল একটি এলাকার নাম হয়ে যাবে, তা বুঝতে পারিনি।'
জেলা হিসেবে শরীয়তপুর ও প্রথম বাসের রুট
শরীয়তপুর একসময় ফরিদপুর জেলার একটি মহকুমা ছিল। ১৯৮৪ সালের মার্চে শরীয়তপুরকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরের বছর প্রতিষ্ঠিত হয় শরীয়তপুর পৌরসভা। ১৯৮৮ সালের বন্যায় জেলা শহর থেকে বাঘিয়া এলাকার দিকে যাওয়া মেঠো পথটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে পথটি সংস্কার করে ইট বিছানো হয় এবং সেখানে বাস, রিকশা ও ভ্যান চলাচল শুরু হয়।
১৯৮৯ সালে শরীয়তপুর জেলায় প্রথম বাস চলাচল শুরু হয়। সদর উপজেলার আঙ্গারিয়া নদীর ঘাট থেকে প্রেমতলা হয়ে নড়িয়া উপজেলার বাঁশতলা পর্যন্ত ছিল সেই বাসের রুট, দূরত্ব প্রায় ২৭ কিলোমিটার। ওই সময় প্রেমতলা হয়ে বাস চালাতেন সবুজ ভূঁইয়া। গত ২৭ অক্টোবর এক বন্ধুকে নিয়ে এলাকায় এসে পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণা করেন তিনি।
প্রথম আলোকে সবুজ ভূঁইয়া বলেন, '১০ বছর হলো বাস চালানো ছেড়েছি। আমি যখন বাস চলাতাম, তখন রাস্তার পাশে বড় বটগাছ ছিল। সেখানে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো হতো। মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা। ফসলি জমির মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া সেই সড়কের চেহারা এখন পুরোপুরি বদলে গেছে।'
ফসলি মাঠ থেকে ব্যবসাকেন্দ্র
১৯৯০ সালে প্রেমতলা বাসস্ট্যান্ড চালুর সময় সেখানে ছিল মাত্র দুটি চায়ের দোকান। সময়ের সঙ্গে বাসের সংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে মানুষের চলাচল। বর্তমানে প্রেমতলা বাজারে প্রায় ১২০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিসিক শিল্পনগরীতে গড়ে উঠেছে অন্তত ৩০টি শিল্পকারখানা। পাশাপাশি গড়ে উঠেছে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কার্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠা।
ঢাকা-শরীয়তপুর, নড়িয়া-শরীয়তপুর এবং শরীয়তপুর থেকে ভেদরগঞ্জ, ডামুড্যা ও গোসাইরহাটের সঙ্গে সংযোগকারী সড়কগুলো এসে মিলেছে এ এলাকায়। ফলে প্রেমতলা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র।
প্রেমতলায় ২০ বছর ধরে চা ও কনফেকশনারির দোকান চালান ৭০ বছর বয়সী আবদুর রব হাওলাদার। একসময় যে জমিতে চাষাবাদ করতেন, সেখানেই এখন তাঁর ব্যবসা। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, '৩৬ বছর আগে এই এলাকায় রাস্তার দুই পাশে ছিল ফসলি জমি। আমরা জমিতে চাষাবাদ করতাম। কৃষিপণ্য বাসে করে বিভিন্ন হাটবাজারে নিয়ে যেতাম। পরে কৃষিকাজ ছেড়ে এখানে দোকান দিয়েছি।'
নেই সেই বটগাছ, আছে শুধু স্মৃতি
যে বটগাছের নিচে বসে প্রেমতলার নামকরণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেই গাছ এখন আর নেই। প্রায় ১০ বছর আগে গাছটি কেটে ফেলা হয়েছে। প্রেমতলার পরিবর্তন নিজের চোখে দেখেছেন শরীয়তপুর সদর উপজেলার বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক পলাশ চন্দ্র রায়। তাঁর স্মৃতিতে ভেসে ওঠে ফসলি জমির মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া মেঠো পথ, বটগাছের ছায়া আর দখিনা বাতাসের কথা। তিনি আজও মাঝেমধ্যে এখানে আসেন, বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের আড্ডায় বসেন।
একটি নাম, একটি জাতির স্মৃতিসংস্কৃতির অংশ
আমাদের ভূমির প্রতিটি নামের পেছনে আছে মানুষের গল্প, আছে স্মৃতি। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে আমরা প্রমাণ করেছিলাম, এই ভাষা আর এই মাটি আমাদের শিরকার নয়, আপন। প্রেমতলার মতো ছোট ছোট স্থানীয় ইতিহাসও সেই আপন পরিচয়েরই অংশ। বিদেশি চাগদিদে হাতে নয়, নিজের মানুষের আড্ডা থেকে জন্ম নেওয়া নামগুলোই আমাদের গ্রাম, শহর ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে।
সময়ের সঙ্গে প্রেমতলা বদলেছে। বেড়েছে যানবাহন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মানুষের ভিড়। ইট-পাথরের অবকাঠামো আর যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততায় হারিয়ে গেছে সেই নির্জন প্রান্তর। তবে কয়েকজন কিশোর-তরুণের আড্ডা থেকে জন্ম নেওয়া নামটি রয়ে গেছে। প্রেমতলার ব্যস্ততম বর্তমানের আড়ালে আজও বেঁচে আছে একটি বটগাছকে ঘিরে গড়ে ওঠা ৩৬ বছর আগের গল্প।
প্রেমতলা নামকরণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রেমতলার নাম কীভাবে হয়?
১৯৯০ সালের নভেম্বরে বাঘিয়ার একটি বটগাছের নিচে আড্ডায় মকবুল চৌকিদারের প্রস্তাবে দুটি কোটাপাড়ার বিভ্রান্তি দূর করতে এলাকার নাম রাখা হয় প্রেমতলা।
প্রেমতলা কোথায় অবস্থিত?
প্রেমতলা শরীয়তপুর পৌরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের বাঘিয়া এলাকার একটি অংশে অবস্থিত।
প্রেমতলার বটগাছের কী হয়েছে?
যে বটগাছের নিচে নামকরণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেই গাছটি প্রায় ১০ বছর আগে কেটে ফেলা হয়েছে।
