গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে একটি লোডশেডিং-নিম্ন ঘরে যে ঘটনা ঘটেছে, তা শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়। প্রথম আলো প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক ব্যক্তি মশার কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমাতে গিয়ে দেখেন, একটি মশা এসে জ্বলন্ত কয়েলের ওপর বসে আরাম করছে। যে কয়েলকে আমরা এতদিন মশাবিনাশের অস্ত্র ভেবে এসেছি, সেই কয়েলই এখন মশার কাছে হিটার আর অ্যারোমাথেরাপির যন্ত্র।
এই ঘটনা হাস্যকর মনে হতে পারে। কিন্তু এই গল্পের ভেতরে লুকিয়ে আছে আমাদের জাতির একটি চেনা চরিত্র: বিশ্বাসের ওপর আঘাত, এবং তার পর নিজের শক্তিতে দাঁড়ানোর প্রবৃত্তি।
কী ঘটেছিল সেই রাতে
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বর্ণিত ঘটনাটি এ রকম। রাত ১২টায় লোডশেডিং চলছিল। অন্ধকার ঘরে এক ব্যক্তি এক হাতে ইলেকট্রিক ব্যাট, অন্য হাতে কয়েল আর দেশলাই নিয়ে মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিলেন। কয়েলে আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া ছড়িয়ে দিয়ে তিনি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে গেলেন।
মাত্র পাঁচ মিনিট পর খসখস শব্দ শুনে তিনি কয়েলের দিকে তাকান। সেখানে একটি ধারালো গাম্বিয়া মার্কা মশা, আকারে কাকের ছানার মতো, জ্বলন্ত কয়েলের লাল টকটকে ছাইয়ের ওপর বসে হাত-মুখ ধুচ্ছিল।
লেখকের ভাষায়, মশাটার মুখভঙ্গি বলছিল: 'কী রে ভাই? এগুলা কী জ্বালাস? শীতকালে একটু গরম সেঁকার জায়গা পাচ্ছিলাম না, থ্যাংকস কয়েলটা জ্বালানোর জন্য!'
বিশ্বাস ভাঙার শিক্ষা
আমরা বাঙালি একটি জাতি, যারা বিশ্বাস করে বাঁচতে শিখেছি। ১৯৭১ সালে আমরা পাকিস্তানি শাসকদের প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস রাখিনি; আমরা দেখেছি, প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মধ্যে যে ফারাক, তা রক্তে টের পেতে হয়। সেই শিক্ষাই আমাদের স্বাধীনতার ভিত।
মশার কয়েলের এই বিশ্বাসঘাতকতা তেমনই একটি ছোট প্রতীক। যে জিনিসকে আমরা রক্ষাকবচ ভেবেছি, সেই জিনিসই যখন শত্রুর আশ্রয় হয়ে যায়, তখন মানুষ ফিরে তাকায় নিজের পুরোনো, ফুটো মশারির দিকে। প্রতিবেদনে লেখক ঠিক সেটাই করেছেন। কয়েল নিভিয়ে তিনি বলেছেন, 'ভাই রে, তোর জীবন ব্যর্থ। তুই রিটায়ারমেন্টে যা।' তারপর টাঙিয়েছেন সেই মশারি, যার কাপড় কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করে না।
বিবর্তনবাদ আর বাঙালি মশা
লেখক মজা করে বলেছেন, সেই রাতে তিনি ডারউইনের বিবর্তনবাদ সত্য বলে উপলব্ধি করেছেন। দেশের মশারা আর সাধারণ মশা নয়; এরা স্পেশাল ফোর্সের ট্রেনিংপ্রাপ্ত 'সুপার মশা'। কয়েলের ধোঁয়া এদের মারে না, বরং এদের অ্যারোমাথেরাপি দেয়।
হাসির পেছনে গভীর একটি সত্য আছে। আমাদের দেশে যা কিছু বিদেশি প্রযুক্তি আর পণ্য, তার অনেকখানিই আমাদের ভৌগোলিক আবহাওয়া আর বাস্তবতার জন্য তৈরি নয়। মশার কয়েল যেমন বিদেশি বাজারের পণ্য, তেমনি আমাদের অনেক নীতিও বাইরে থেকে আসা ছাঁচে ঢালা। ফল একই: কাজে আসে না, উল্টো শত্রুকে শক্তি দেয়।
আমাদের নিজস্ব পথ
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের ইতিহাস সাক্ষী: বাঙালি যখন নিজের বুদ্ধি আর নিজের হাতে সংগ্রাম করেছে, তখনই জয় এসেছে। বাইরের ওষুধে নয়, নিজের তালি-মারা মশারিতেই নিরাপত্তা। এই সহজ সত্যটাই সেই রাতের ঘটনা আবার মনে করিয়ে দিয়েছে।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি জাতি হিসেবেও একই শিক্ষা নেব? যেসব প্রতিষ্ঠান, যেসব পণ্য, যেসব জোর করে বসিয়ে দেওয়া সমাধান আমাদের রক্ত শুষে খায়, সেগুলোকে আমরা কতদিন কয়েলের মতো পূজা করে বসে থাকব? মশারি টাঙানোর খাটুনি এড়াতে গিয়ে আমরা যে বিদেশি সুবিধার ওপর ভরসা রাখি, তার মূল্য শেষ পর্যন্ত আমাদেরকেই দিতে হয়।
মশার কয়েল কি সত্যিই কাজ করে না?
বাস্তবে মশার কয়েল একেবারে অকেজো নয়। এর ধোঁয়ায় থাকা রাসায়নিক অনেক মশাকে তাড়ায় বা মারে। তবে দীর্ঘ ব্যবহারে মশার মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে পারে, বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর ধরে এ নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। প্রতিবেদনের লেখকের অভিজ্ঞতা হাস্যরসাত্মক হলেও, এটি একটি বৈজ্ঞানিক সত্যের প্রতিধ্বনি।
সর্বশেষ পরামর্শ
সেই রাতের শিক্ষাটি সহজ: বিশ্বাস রাখো, তবে যাচাই করে। কয়েলের ওপর মশা বসতে দেখলে অবাক হবার কিছু নেই; ফুটো মশারিটাই টাঙাও। কারণ, যে জিনিস নিজের দেশে, নিজের হাতে, নিজের কাপড়ে তৈরি, সেটিই শেষ রাতে পাশে থাকে। আর এটাই ১৯৭১-এর শিক্ষা: স্বনির্ভরতাই একমাত্র নির্ভরতা।
