বার্লিনের স্বর্ণপদক জিতে ১২ বছর পর ঘরে ফিরলেন মূক-বধির মায়া: এক অসাধারণ প্রত্যাবর্তনের গল্প
মায়া বর্মণ। যে আঙুলগুলো ভলিবলকে নেটের ওপারে পাঠিয়ে দেয়, সেই আঙুলগুলোই তাঁর জীবনে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়ে দিয়েছে। ১২ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এই মেয়ে বাবা-মায়ের টিনের ঘরে ফিরে এসেছেন, আর তার মাঝখানে তিনি বার্লিন ঘুরে এসেছেন সোনার পদক জিতে। কিন্তু নিজের পরিবারে ফেরার আশা তাঁর আর ছিল না। ফিরিয়ে দিল তাঁর আঙুলের ছাপ। হঠাৎ করেই।
মায়া বর্মণ জন্ম থেকেই মূক এবং বধির। ২০১৪ সালে, যখন তিনি ১৭ বছরের কিশোরী, তখন খিদে মেটানোর তাড়নায় ট্রেনে চেপে বসেন। সেই ট্রেন তাঁকে উত্তর দিনাজপুরে নিয়ে যায়। স্টেশনে বিভ্রান্ত অবস্থায় পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে। কিন্তু যে মেয়ে কথা বলতে পারে না, কানে শুনতে পায় না, নিজের নাম ছাড়া কিছু লিখতে জানে না, তার বাড়ি খুঁজে পাওয়া অসম্ভব ছিল। তাই তাঁকে হাওড়ার বাগনানের একটি সরকারি হোমে পাঠানো হয়। ১২ বছর সেটাই ছিল মায়ার ঠিকানা।
অন্যদিকে, মেয়েকে খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে আর্থিক অনটন বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় বাবা মনো বর্মণের কাছে। স্ত্রী কাজুলি এবং পাঁচ ছেলেমেয়েকে নিয়ে নুন আনতে পান্তা ফুরোনো সংসার। সবার বড় মায়া। নানা দিকে খোঁজ করেও কিছু মেলেনি। আশা ফিকে হতে হতে হারিয়ে গিয়েছিল। এমন সময় হঠাৎ এল সেই টেলিফোনটা। দিন পনেরো আগে।
বক্সিরহাট থানার ওসি কপিলদেব রায় ফোন করে মনোকে জানান, তাঁর মেয়েকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। বাগনানের হোম থেকে থানায় ইমেল এসেছে। হোম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, গত ১২ বছর ধরে মায়া তাঁদের কাছেই আছেন। মনো ছুটে গিয়েছিলেন স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মুকুল বর্মার বাড়ি। তাঁকে সঙ্গে করেই গিয়েছিলেন থানায়। তার পর সোজা বাগনানের হোমে। মেয়েকে পেয়ে আত্মহারা অবস্থা! কিন্তু আরও চমক বাকি ছিল।
হোম কর্তৃপক্ষ মনোদের দেখাতে থাকেন একটার পর একটা পদক। সবগুলোই মায়ার। ভলিবল খেলে জেতা। গত কয়েক বছর ধরে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ভলিবল প্রতিযোগিতায় খেলেছেন। ২০২৩ সালে জার্মানির বার্লিনে একটি স্পেশ্যাল অলিম্পিক্স ইভেন্টেও দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন মায়া। জিতেছেন স্বর্ণপদক। মুকুল বলেন, ''হোমের ম্যাডাম যখন মায়ার পদকগুলো আমার হাতে দিলেন, বাক্রুদ্ধ হয়ে যাই। যে মেয়ে কথা বলতে পারে না, কানে শুনতে পায় না, সে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে এতগুলো পদক এনেছে!''
মায়ার পরিবারের ঠিকানা কীভাবে খুঁজে পেলেন হোম কর্তৃপক্ষ? অদ্ভুত ভাবেই। সম্প্রতি মায়ার আধার কার্ড তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাঁরা। সেই মতো নির্দিষ্ট কেন্দ্রে গিয়ে হাতের ছাপ দিয়ে আসেন মায়া। সেই আঙুলের ছাপের সূত্রেই আধার কর্তৃপক্ষ জানতে পারেন, বহু বছর আগেই তাঁর আধার কার্ড করানো হয়ে গিয়েছিল। আধারের ঠিকানা দেখে থানায় যোগাযোগ করা হয়। মায়াকে বাড়িতে ফেরানোর আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে স্থানীয় থানা ও পরিবার। আদালতের অনুমতি নিয়ে গত বুধবার মায়াকে বাগনান থেকে ফেরানো হয় কোচবিহারের বাড়িতে।
মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ আর সেই সঙ্গে মেয়ের সাফল্যের কথা জানার পর থেকে বিস্ময়ের ঘোর, এ দুইয়ের সঙ্গেই এ বার যুক্ত হয়েছে চিন্তাও। সোনার মেয়ের খেলাধুলা চালাবেন কী করে? অসুস্থতার কারণে এখন আর নিয়মিত খেতমজুরির কাজও করতে পারেন না মনো। অন্যের জমিতে মজুরের কাজ করেন স্ত্রী। মায়া ছাড়া আরও তিন কন্যা এবং এক পুত্র রয়েছে। সকলেই দিনমজুরের কাজ করেন। কোনও মতে টেনেটুনে চলে সংসার। সোনার মেয়েকে খাওয়াবেন কী? দুশ্চিন্তাও গ্রাস করেছে মনো-কাজুলিকে।
পরিস্থিতি বুঝে মায়ার দায়িত্ব আপাতত নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন মুকুল। কিন্তু শুধু খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করাই তো উদ্দেশ্য নয়! মুকুলের কথায়, ''আমি চাই ওর প্রতিভার বিকাশ হোক। খেলাটা চালিয়ে নিয়ে যাক মেয়েটা। তার জন্যও তো একটা ব্যবস্থা দরকার।'' সে জন্য ইতিমধ্যে পুলিশ, প্রশাসনের সঙ্গে দেখা করেছেন তিনি। কথা বলে সাহায্য চেয়েছেন। রাজ্য ক্রীড়া দফতরের কাছেও আর্জি জানাতে চান দক্ষিণ বালাকুঠি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। তুফানগঞ্জ-২ ব্লক প্রশাসনের এক আধিকারিক জানান, মায়ার জন্য ভাতার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মায়ার পরিবার এখন তাকিয়ে সরকারের দিকে। মায়ার বাবা মনোর কথায়, ''এখন আমাদের ভরসা শুধুই সরকার।''
মায়ার বাড়ি যে এলাকায়, তা মন্ত্রী মালতী রাভার বিধানসভা কেন্দ্র মেখলিগঞ্জের অন্তর্গত। রাজ্যের নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণ দফতরের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মালতী আশ্বাস দিয়েছেন, মায়ার প্রশিক্ষণ আটকাবে না। প্রয়োজনে আরও ভাল কোচের অধীনে তাঁর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। তাঁর কথায়, ''মেয়েটার জন্য সরকার এবং আমি যা করার করব।''
আপাতত মুকুলের বাড়িতে তাঁর আশ্রয়েই রয়েছেন মায়া। ১৭ বছর বয়সে হারিয়ে যাওয়া মেয়ের ২৯ বছরে এসে পরিবারকে ফিরে পাওয়ার পিছনেও কিন্তু এই মুকুলেরই নিঃশব্দ অবদান রয়ে গিয়েছে। ছোটবেলায় 'মায়া বর্মণ' নামটা সই করতে শিখিয়েছিলেন তিনিই। এবং মায়ার আধার কার্ড করানো হয়েছিল তাঁর উদ্যোগেই। ওই আধার কার্ড না-থাকলে মায়াকে হয়তো অন্য হোমেই কাটাতে হত চিরকাল। এবং 'মায়া বর্মণ' নয়, অন্য কোনও নাম লেখা থাকত বার্লিনে সুবর্ণপদকজয়ীর।
মায়ার এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার লড়াই শুধু রাজনৈতিক নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও। ১৯৭১ সালের চেতনা আমাদের শেখায়, প্রতিটি বাঙালির মধ্যে লুকিয়ে আছে অসীম শক্তি। মায়ার মতো মেয়েরা সেই শক্তির প্রতীক। তাদের প্রতিভার বিকাশ ঘটানো আমাদের সবার দায়িত্ব।
প্রশ্নোত্তর
মায়া বর্মণ কে?
মায়া বর্মণ একজন মূক ও বধির ভলিবল খেলোয়াড়, যিনি ১২ বছর আগে হারিয়ে যাওয়ার পর সম্প্রতি পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন। তিনি ২০২৩ সালে জার্মানির বার্লিনে স্পেশ্যাল অলিম্পিক্সে স্বর্ণপদক জিতেছেন।
কীভাবে মায়ার পরিবার তাঁকে খুঁজে পেল?
হোম কর্তৃপক্ষ মায়ার আধার কার্ড তৈরির উদ্যোগ নেয়। আঙুলের ছাপের মাধ্যমে আধার কর্তৃপক্ষ জানতে পারে তাঁর আগের ঠিকানা। সেই ঠিকানা ব্যবহার করে থানার মাধ্যমে পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হয়।
মায়ার ভবিষ্যৎ কী?
মায়ার খেলাধুলা চালিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারি সাহায্যের আশা করছেন তাঁর পরিবার। রাজ্যের মন্ত্রী মালতী রাভা আশ্বাস দিয়েছেন, মায়ার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।